বেনাপোল সীমান্তে দাঁড়িয়ে যখন ভারতের নতুন হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী বললেন, “দেখুন তো হেঁটে চলে এলাম। মনে হচ্ছে না যে আমি বাংলাদেশে আছি। সবসময় আমি বলি একই আকাশ, একই বাতাস, একই যন্ত্র”—তখন কূটনীতির চিরাচরিত শীতল ভাষার আড়ালে এক উষ্ণ মানবিক আকাঙ্ক্ষার সুর শোনা গেল। এই মন্তব্য কেবল সৌজন্যমূলক নয়; বরং এটি দীর্ঘদিনের স্থবিরতা কাটিয়ে দুই দেশের সম্পর্কের নতুন কোনো অধ্যায় শুরুর ইঙ্গিত কি না, তা নিয়ে ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে চুলচেরা বিশ্লেষণ।
হাইকমিশনার ত্রিবেদীর ১৪০ কোটি এবং ২০ কোটির যোগফলের হিসাবটি নিছক কোনো গাণিতিক কৌতুক নয়। এটি আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতির একটি বাস্তবসম্মত স্বীকারোক্তি। দক্ষিণ এশিয়ায় ভারত ও বাংলাদেশের মতো দুটি দেশ যখন ‘যৌথ ভবিষ্যৎ’ নিয়ে কথা বলে, তখন তার প্রভাব শুধু দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। তিনি যখন বলেন, “দুই গণতন্ত্র মিলে গেলে একটা বিশ্বশক্তি হয়ে যায়,” তখন তিনি মূলত প্রথাগত ‘প্রভু-ভৃত্যের’ সম্পর্কের বাইরে গিয়ে একটি ‘সমতার অংশীদারিত্বের’ মডেলের দিকে আঙুল তুলছেন। তবে প্রশ্ন থেকেই যায়, এই উচ্চাভিলাষী রূপকল্প কি কেবলই কূটনৈতিক বাচনভঙ্গি, নাকি এর পেছনে রয়েছে কোনো সুনির্দিষ্ট নীতিগত রূপরেখা?
ত্রিবেরীর প্রথম দিনের বক্তব্যে সবচেয়ে বড় আশাবাদের জায়গাটি ছিল মানুষের যাতায়াত—বিশেষ করে পর্যটন ভিসা। বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের জন্য ভারত শুধু একটি প্রতিবেশী রাষ্ট্র নয়, বরং চিকিৎসা, শিক্ষা ও আত্মীয়তার এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। হাসিনা পরবর্তী সময়ে যে ‘ভিসা দেয়াল’ তৈরি হয়েছে, তা দুই দেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে তৈরি করেছে প্রবল এক আস্থার সংকট। নতুন হাইকমিশনারের ইঙ্গিত যদি বাস্তবে রূপ নেয়, তবে তা কেবল দুই দেশের অর্থনীতিকে চাঙ্গা করবে না, বরং দীর্ঘদিনের জমে থাকা তিক্ততা নিরসনেও বড় ভূমিকা রাখবে। কারণ, কূটনীতির সাফল্য যখন সাধারণ মানুষের পাসপোর্ট-ভিসার দীর্ঘ লাইনে থমকে যায়, তখন হাই-প্রোফাইল বৈঠকের চেয়েও সাধারণের ভোগান্তিই হয়ে ওঠে সম্পর্কের প্রধান মাপকাঠি।
সাংস্কৃতিক মিল ও ভৌগোলিক নৈকট্য আমাদের সম্পর্কের এক শক্তিশালী ভিত। কিন্তু আন্তর্জাতিক সম্পর্কের কঠোর বাস্তবতায় আবেগ সবসময় কার্যকর সমাধান দেয় না। সীমান্তে প্রাণহানি, তিস্তার পানির অনিশ্চয়তা কিংবা বাণিজ্য বৈষম্যের মতো ইস্যুগুলো আজও দুই দেশের সম্পর্কের কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ভারতের নতুন হাইকমিশনারের সামনে চ্যালেঞ্জ দুটি—একদিকে তার দেশ ও বাংলাদেশের মধ্যকার বিশাল বিশাল অবকাঠামোগত ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার প্রকল্পগুলোকে এগিয়ে নেওয়া, অন্যদিকে মাঠপর্যায়ে মানুষের জীবনকে প্রভাবিত করে এমন সংবেদনশীল সমস্যাগুলোর সমাধান করা।
ত্রিবেদী তাঁর বক্তব্যে গণমাধ্যমের ভূমিকা নিয়ে যে সতর্ক বার্তা দিয়েছেন, তা অত্যন্ত সময়োপযোগী। দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে গুজব এবং অপপ্রচার প্রায়ই সত্যকে আড়াল করে ফেলে। দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা এখানে কেবল তথ্য দেওয়ার মাধ্যম নয়, বরং সেতুবন্ধন তৈরির হাতিয়ার। সাংবাদিক হিসেবে আমাদের দায়িত্ব হলো, সম্পর্কের গভীরতাগুলোকে যেমন তুলে ধরা, তেমনি যে অমীমাংসিত বিষয়গুলো মানুষকে কষ্ট দিচ্ছে, সেগুলোকে বস্তুনিষ্ঠভাবে নজরে আনা।
দীনেশ ত্রিবেদীর ‘হেঁটে আসার’ অনুভূতিটি কাব্যিক হলেও, তাঁর সামনে থাকা পথটি বন্ধুর। তিনি যে আশাবাদের কথা শুনিয়েছেন, তা বাস্তবায়িত হবে কি না তা নির্ভর করবে দিল্লির নীতি-নির্ধারকদের সদিচ্ছা এবং ঢাকার সাথে তাদের সমতার ভিত্তিতে কাজ করার আগ্রহের ওপর।
শুরুটা যদি হয় ‘এক আকাশ ও এক বাতাস’ দিয়ে, তবে তার পরিণতি হওয়া উচিত এমন এক সম্পর্ক, যেখানে সীমান্ত কেবল মানচিত্রের রেখায় সীমাবদ্ধ থাকবে। নতুন হাইকমিশনারের প্রথম দিনের বার্তা যদি কেবল শব্দে আটকে না থেকে প্রশাসনিক পদক্ষেপে রূপ নেয়, তবেই তা দক্ষিণ এশিয়ার জন্য নতুন আলোর দিশা হতে পারে। আপাতত বল এখন ভারতের কোর্টে, এবং সাধারণ মানুষের দৃষ্টি এখন সেই ভিসা জানালার দিকে—যেখানে এক নতুন যাত্রার শুরু হওয়ার কথা।