মাথায় ক্যামেরা বেঁধে কাজ করছেন শ্রমিকরা; তাদের নড়াচড়া ও কাজের ধরন রেকর্ড হয়ে যাচ্ছে মানবাকৃতির রোবট প্রশিক্ষণে ব্যবহারের জন্য—এমনই দাবি একাধিক সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে।
ভারতের কিছু কারখানায় শ্রমিকদের কাজের ভিডিও ধারণ করে তা দিয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও মানবাকৃতির রোবট প্রশিক্ষণের অভিযোগ ও বিশ্লেষণ সামনে এসেছে। বিভিন্ন প্রযুক্তি ও গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, এসব ভিডিও থেকে “এগোসেনট্রিক ডেটাসেট” তৈরি করা হচ্ছে, যাতে রোবট বাস্তব পরিবেশে মানুষের মতো কাজ শিখতে পারে।
এই প্রক্রিয়ায় শ্রমিকরা মাথায় বা শরীরে ক্যামেরা পরে দৈনন্দিন কাজ করছেন। যেমন যন্ত্রাংশ ধরা, স্ক্রু লাগানো, মেশিন পরিচালনা বা মান নিয়ন্ত্রণের কাজ। এসব দৃশ্য এআই মডেলের প্রশিক্ষণে ব্যবহার করা হচ্ছে বলে দাবি করা হয়।
প্রতিবেদনগুলোতে আরও বলা হয়, শ্রমিকরা সাধারণত ঘণ্টাভিত্তিক মজুরিতে কাজ করছেন। আয়ের পরিমাণ অনেক ক্ষেত্রে কম। উন্নয়নশীল দেশে এআই ডেটা কাজের গড় মজুরি নিয়ে জাতিসংঘের বিভিন্ন বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, অনেক শ্রমিক প্রতি ঘণ্টায় কয়েক ডলার বা তারও কম আয় করেন। জাতিসংঘের সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে এ ধরনের বৈষম্যের বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে।
এছাড়া, এআই ডেটা লেবেলিং ও অ্যানোটেশন কাজ নিয়ে গবেষণা ও মন্তব্যে বলা হয়, এই শিল্পে বড় একটি অংশ “অদৃশ্য শ্রমিক” হিসেবে কাজ করেন। এই শ্রমিকদের ভূমিকা সরাসরি প্রযুক্তি উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত হলেও অনেক সময় তাদের নাম বা স্বীকৃতি থাকে না। এ ধরনের বিশ্লেষণ উঠে এসেছে দি করভারসেশন-এর একাধিক লেখায়।
ভারতে বিপিও ও আউটসোর্সিং খাতে অনেক তরুণকে ডেটা অ্যানোটেশন বা এআই ট্রেনিং কাজের দিকে টানা হয় বলে বিভিন্ন শ্রমবাজার বিশ্লেষণে উল্লেখ রয়েছে। কাজগুলোতে গাড়ির ছবি চিহ্নিত করা, মেডিকেল ইমেজে অংশ নির্ধারণ বা ভিডিও ট্যাগিংয়ের মতো পুনরাবৃত্তিমূলক কাজ অন্তর্ভুক্ত থাকে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব কাজের মাধ্যমে একদিকে যেমন ডেটা তৈরি হচ্ছে, অন্যদিকে শ্রমিকদের দক্ষতার পূর্ণ ব্যবহার হচ্ছে না। অনেক ক্ষেত্রে উচ্চশিক্ষিত কর্মীরাও তুলনামূলক কম দক্ষতার পুনরাবৃত্তিমূলক কাজে নিয়োজিত থাকেন।
সবচেয়ে আলোচিত দিক হলো কারখানার ভিডিও ডেটা ব্যবহার করে রোবট প্রশিক্ষণের সম্ভাবনা। বিশ্লেষকদের মতে, ভবিষ্যতে এসব ডেটা দিয়ে এমন রোবট তৈরি হতে পারে, যা মানুষের শারীরিক কাজ আরও দ্রুত ও ধারাবাহিকভাবে করতে সক্ষম হবে।
তবে এই প্রক্রিয়ায় সম্মতি ও গোপনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। শ্রমিকরা জানেন কি না তাদের ডেটা কোথায় যাচ্ছে, কতদিন সংরক্ষিত হচ্ছে বা কোন কোম্পানি ব্যবহার করছে—এ বিষয়গুলো পরিষ্কার নয় বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক শ্রম নীতিবিষয়ক আলোচনায়ও বলা হয়েছে, এআই-সম্পর্কিত অনেক কাজ অস্থায়ী চুক্তির আওতায় হয়। ফলে সামাজিক নিরাপত্তা, বীমা বা দীর্ঘমেয়াদি সুরক্ষার অভাব থাকে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা এই ধরনের কাজের শর্ত ও বৈষম্য নিয়ে নিয়মিত সতর্কতা দিয়ে আসছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এআই শিল্প দ্রুত বাড়লেও এর পেছনে থাকা শ্রম কাঠামো এখনো অনেকটা অদৃশ্য। কারখানার শ্রমিকদের ডেটা হয়তো ভবিষ্যতের রোবট তৈরি করবে, কিন্তু সেই পরিবর্তন শেষ পর্যন্ত তাদের চাকরি ও জীবিকার ওপর কী প্রভাব ফেলবে—তা এখনো অনিশ্চিত।
প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি কেবল প্রযুক্তিগত অগ্রগতির প্রশ্ন নয়। এটি শ্রম, অধিকার ও অর্থনৈতিক ন্যায্যতারও প্রশ্ন।
এই পরিবর্তনের মধ্যেই দাঁড়িয়ে আছে এক বড় দ্বন্দ্ব। মানুষই কি নিজের বিকল্প তৈরি করছে, নাকি নতুন এক শ্রম-অসাম্যের যুগে প্রবেশ করছে—এ প্রশ্নের উত্তর এখনো খোলা।