১৪০ কোটির দেশে কেন মিলছে না ১১ জন ভালো ফুটবলার?

বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় আসর কাতার বিশ্বকাপে চীনের উপস্থিতি ছিল না মাঠে, ছিল বিজ্ঞাপনের পর্দায়। কাতার বিশ্বকাপে চীনা কোম্পানিগুলো প্রায় ১.৪ বিলিয়ন ডলার বিজ্ঞাপন খরচ করেছিল, যা ছিল অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ। কিন্তু সেই বিশ্বকাপে চীনের জাতীয় ফুটবল দল খেলতেই পারেনি।

১৪০ কোটিরও বেশি মানুষের দেশ, বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি, বিশাল অবকাঠামো এবং বিপুল বিনিয়োগ—সবকিছু থাকার পরও চীনা ফুটবল কেন সফল হচ্ছে না, সেই প্রশ্ন আবারও আলোচনায় এসেছে।

২০১৫ সালে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সমর্থনে দেশটির ফুটবলে বড় ধরনের সংস্কার পরিকল্পনা নেওয়া হয়। লক্ষ্য ছিল চীনকে বিশ্ব ফুটবলের শক্তিশালী দেশ হিসেবে গড়ে তোলা।

কিন্তু সমালোচকদের মতে, ফুটবলকে একটি রাজনৈতিক প্রকল্পে পরিণত করা হয়েছিল। পরিকল্পনাটি ছিল ওপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া। মাঠ পর্যায়ে ফুটবল সংস্কৃতি গড়ে তোলা, প্রতিভা খোঁজা এবং দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছিল রাজনৈতিক লক্ষ্য পূরণ।

দ্য ইকোনমিস্টে প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে সাংবাদিক মার্ক ড্রেয়ার লিখেছেন, শি জিনপিংয়ের ফুটবল পরিকল্পনা শেষ পর্যন্ত দুর্নীতি এবং ওপর থেকে নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

বর্তমানে চীনা ফুটবল ব্যাপক দুর্নীতি তদন্তের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সাবেক জাতীয় দলের কোচ ও খেলোয়াড় লি তিয়ে এবং চীনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক চেয়ারম্যান চেন শুয়ানসহ বেশ কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তা তদন্তের মুখোমুখি হয়েছেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, চীনা ফুটবলের অন্যতম বড় সমস্যা হলো প্রতিষ্ঠানগুলোর অস্থিতিশীলতা। দুর্নীতির অভিযোগ উঠলেই শীর্ষ পর্যায়ে ব্যাপক পরিবর্তন আনা হয়। ফলে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা কঠিন হয়ে পড়ে।

চীনা ফুটবল বিশেষজ্ঞ রোয়ান সাইমনস বলেন, “প্রতিবার ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন, ক্লাব ও একাডেমিগুলোকে পরিষ্কার করা হয়, তখন ফুটবল পিরামিডের পুরো শীর্ষ অংশ কেটে ফেলা হয়। শেষ পর্যন্ত শুধু ভিত্তিটাই থেকে যায়, যেখানে মানুষ এখনো ভালোবেসে ফুটবল খেলে।”

এক সময় চীনা সুপার লিগকে এশিয়ার সবচেয়ে ধনী লিগগুলোর একটি হিসেবে দেখা হতো। ২০১৯ সালে লিগের খেলোয়াড়দের গড় বার্ষিক বেতন ছিল প্রায় ১.২ মিলিয়ন ডলার, যা ফ্রান্সের লিগ ওয়ানের অনেক ক্লাবের সমপর্যায়ে ছিল।

ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে তারকা খেলোয়াড় এবং কোচদের আনা হয়েছিল। কিন্তু এই বিপুল ব্যয়ের পরও জাতীয় দলের পারফরম্যান্সে উল্লেখযোগ্য কোনো উন্নতি দেখা যায়নি।

কারণ, অধিকাংশ ক্লাব নিজেদের আয়ে টিকে থাকতে পারত না। টিকিট বিক্রি, টেলিভিশন স্বত্ব, স্পনসরশিপ কিংবা পণ্য বিক্রির আয় খরচ মেটানোর জন্য যথেষ্ট ছিল না। ফলে ক্লাবগুলো স্থানীয় সরকার, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান কিংবা রিয়েল এস্টেট কোম্পানির আর্থিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।

চীনের পুরুষ ফুটবল দলের একমাত্র বিশ্বকাপ অংশগ্রহণ ছিল ২০০২ সালে। দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানে অনুষ্ঠিত সেই আসরে তারা তিনটি ম্যাচেই হেরে বিদায় নেয়। পুরো টুর্নামেন্টে তারা কোনো গোল করতে পারেনি এবং ৯ গোল হজম করেছিল।

এরপর দুই দশকের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও চীন আর বিশ্বকাপের মূল পর্বে ফিরতে পারেনি।

নারী ফুটবলেও এক সময় চীন ছিল শক্তিশালী দল। ১৯৯৯ সালের নারী বিশ্বকাপের ফাইনালে উঠেছিল তারা। কিন্তু এরপর আর সেই সাফল্যের ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারেনি।

২০২৬ সালের বিশ্বকাপ থেকে দলের সংখ্যা ৩২ থেকে বাড়িয়ে ৪৮ করা হয়েছে। ফলে এশিয়ার জন্য বরাদ্দ আসনও বেড়েছে। এতে চীনের বিশ্বকাপে খেলার সম্ভাবনা আগের তুলনায় কিছুটা বাড়লেও বিশেষজ্ঞরা খুব বেশি আশাবাদী নন। মার্ক ড্রেয়ারের মতে, বর্তমান অবস্থায় চীনের বিশ্বকাপে যোগ্যতা অর্জনের সম্ভাবনা ৫০-৫০ এর বেশি নয়।

বিশ্লেষকদের মতে, চীনা ফুটবলের সংকট শুধু মাঠের নয়; এটি ব্যবস্থাপনা, পরিকল্পনা এবং সংস্কৃতির সংকটও।

বিশ্বের সফল ফুটবল দেশগুলোতে ফুটবল বেড়ে ওঠে স্থানীয় ক্লাব, স্কুল, একাডেমি এবং পাড়ার মাঠ থেকে। সেখানে শিশুদের স্বপ্ন, প্রতিযোগিতা এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

চীনে দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে অবকাঠামো, অর্থ এবং প্রশাসনিক নির্দেশনাকে। কিন্তু ফুটবলের প্রাণশক্তি—খেলাটির প্রতি স্বতঃস্ফূর্ত ভালোবাসা ও শক্তিশালী তৃণমূল সংস্কৃতি—সেভাবে গড়ে ওঠেনি।

মার্ক ড্রেয়ার লিখেছেন, বিশ্বকাপে চীনের উপস্থিতি অবশ্যই টুর্নামেন্টকে আরও সমৃদ্ধ করত। কিন্তু সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন চীনের সেই লাখো ফুটবলপ্রেমী, যারা এখনো দলটির সাফল্যের অপেক্ষায় আছেন।

চীনা ফুটবলের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো একটি বাস্তব সত্য মেনে নেওয়া—শুধু অর্থ খরচ করে চ্যাম্পিয়ন তৈরি করা যায় না। রাজনৈতিক ইচ্ছাশক্তি দিয়ে ফুটবল সংস্কৃতি গড়ে তোলা যায় না। সেই সংস্কৃতি জন্ম নেয় পাড়ার মাঠে, ছোট একাডেমিতে এবং শিশুদের স্বপ্নের ভেতর থেকে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *