দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে বিতর্কিত অঞ্চলগুলোর একটি—পাকিস্তান-পরিচালিত আজাদ জম্মু ও কাশ্মীর —২০২৫ সালের শেষ ভাগে তার ইতিহাসের অন্যতম বড় জনআন্দোলনের সাক্ষী হয়েছে। আল জাজিরা ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে সংঘটিত এই বিক্ষোভে কমপক্ষে ৯ থেকে ১০ জন নিহত এবং ২০০-র বেশি মানুষ আহত হয়েছেন। কিন্তু এটি কেবল একটি দাঙ্গা বা সহিংসতার ঘটনা নয়—এটি দশকের পর দশক ধরে চলা অর্থনৈতিক বৈষম্য, রাজনৈতিক অস্বচ্ছতা এবং কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণের বিরুদ্ধে একটি অঞ্চলের প্রতিবাদের প্রতিফলন।
আন্দোলনের সূত্রপাত হয় জম্মু ও কাশ্মীর জয়েন্ট আওয়ামী অ্যাকশন কমিটির ডাকে। এই সংগঠনটি—যা বণিক, ছাত্র, আইনজীবী ও নাগরিক সমাজের একটি জোট—৩৮ দফা দাবি নিয়ে মাঠে নামে। তাদের প্রধান দাবিগুলো ছিল: বিদ্যুতের মূল্য হ্রাস, গমের ভর্তুকি পুনর্বহাল, সরকারি কর্মকর্তাদের বিশেষ সুবিধা বাতিল, এবং আইনসভায় ভারত-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীর থেকে আসা শরণার্থীদের জন্য সংরক্ষিত ১২টি আসন বাতিল করা।
২৯ সেপ্টেম্বর থেকে অঞ্চলজুড়ে “শাটডাউন” ও “হুইল-জ্যাম” ধর্মঘট শুরু হয়। মুজাফফরাবাদ, কোটলি, মিরপুর, রাওয়ালাকোট—প্রতিটি শহরে বাজার বন্ধ, যানবাহন চলাচল বন্ধ, হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নামে। কর্তৃপক্ষ প্রতিক্রিয়া হিসেবে ইন্টারনেট ও মোবাইল সেবা বন্ধ করে দেয়, যা বিক্ষোভকারীদের মধ্যে সমন্বয় বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা ছিল।
অক্টোবরের প্রথম দিনগুলোতে মুজাফফরাবাদে তীব্র সংঘর্ষ হয়। পুলিশ টিয়ার গ্যাস, রাবার বুলেট এবং কিছু প্রত্যক্ষদর্শীর দাবি অনুযায়ী গুলি ব্যবহার করে। সংঘর্ষে তিন পুলিশ সদস্য ও একজন বেসামরিক নাগরিক নিহত হন, আরও শতাধিক আহত হন। বিক্ষোভকারীদের দাবি, তাদের ১২ জন সমর্থক নিহত হয়েছেন। সরকার জানায়, ১৭২ জন পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে ১২ জন গুরুতর।
চরম চাপের মুখে পাকিস্তানের ফেডারেল সরকার ও আজাদ কাশ্মীর সরকার -এর সাথে আলোচনায় বসে। ৪ অক্টোবর একটি শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যেখানে সরকার বেশিরভাগ দাবি মেনে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়—বিদ্যুতের মূল্য কমানো, গম ভর্তুকি বজায় রাখা, মন্ত্রিসভা সংকুচিত করা এবং বিক্ষোভে নিহতদের তদন্তে একটি বিচারিক কমিশন গঠন।
আজাদ কাশ্মীর পাকিস্তানের জন্য প্রায় ৩,০০০-৩,৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করে—যা পাকিস্তানের মোট উৎপাদন ক্ষমতার প্রায় ১০ শতাংশ। অথচ অঞ্চলের বাসিন্দারা নিজেদের উৎপাদিত বিদ্যুতের জন্য প্রতি ইউনিট ৩০ রুপির বেশি দাম দেন, যখন উৎপাদন খরচ মাত্র ২ রুপি! এটি পাকিস্তানের সংবিধানেরও পরিপন্থী, যা আজাদ কাশ্মীরের বাসিন্দাদের কাছ থেকে লাভ করা নিষেধ করে।
আইএমএফ-এর ঋণ কর্মসূচির আওতায় পাকিস্তান যখন ভর্তুকি কমাচ্ছিল, তখন আজাদ কাশ্মীরের মানুষের ওপর তার প্রভাব ছিল ভয়াবহ। গমের দাম বৃদ্ধি, মুদ্রাস্ফীতি এবং ক্রমবর্ধমান দারিদ্র্য মানুষকে রাস্তায় নামতে বাধ্য করে। দি ডিপ্লোম্যাট-এর মতে, “এই বিক্ষোভ কেবল ভর্তুকি বা বিদ্যুতের ট্যারিফ নিয়ে নয়—এটি মর্যাদা, প্রতিনিধিত্ব ও জবাবদিহিতার দাবি।”
আজাদ কাশ্মীরের নিজস্ব প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী ও আইনসভা থাকলেও, বাস্তবে ইসলামাবাদ ও পাকিস্তান সেনাবাহিনী অঞ্চলের প্রধান সিদ্ধান্ত নিয়ন্ত্রণ করে। ১৯৪৯ সালের করাচি চুক্তি ও ১৯৭৪ সালের সংবিধানের মাধ্যমে এই কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ বৈধ রূপ পেয়েছে। বিক্ষোভকারীদের দাবি, ১২টি সংরক্ষিত আসন ভারত-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীর থেকে আসা শরণার্থীদের জন্য—যা ইসলামাবাদের প্রভাব বাড়ানোর একটি রাজনৈতিক হাতিয়ার।
JKJAAC-এর দাবি, সরকারি কর্মকর্তা ও রাজনৈতিক এলিটদের বিশেষ ভাতা ও সুবিধা সাধারণ মানুষের দুঃখ-দুর্দশার বিপরীতে একটি কলঙ্কজনক বৈষম্য তৈরি করেছে। আজাদ কাশ্মীরের সম্পদ—বিশেষ করে জল ও জলবিদ্যুৎ—লুট করে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় এলিটরা।
বিক্ষোভ চরমে ওঠার সময়, আজাদ কাশ্মীরের সাবেক প্রধানমন্ত্রী রাজা ফারুক হায়দার খান একটি “সাইফার নথি” প্রকাশ করেন, যেখানে দাবি করা হয় ভারত বিক্ষোভকে উসকে দিচ্ছে। কিন্তু এই চেষ্টা ব্যর্থ হয়। দি ডিপ্লোম্যাট-এর বিশ্লেষণে বলা হয়, “দেশীয় বিক্ষোভকে বিদেশী ষড়যন্ত্র হিসেবে চিত্রিত করে নেতারা দেখালেন, তারা জনগণের দুঃখ-কষ্টের সাথে মৌলিকভাবে জড়াতে অসমর্থ বা অনিচ্ছুক।”
পাকিস্তান জিন্দাবাদ ব্যানারে সমর্থন সমাবেশের আয়োজনও জনগণের রোষকে বাইরে মোড় দিতে ব্যর্থ হয়। বরং এটি সরকারের দুর্বলতাই প্রমাণ করে।
এই আন্দোলনের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি উন্নয়ন ঘটে। আজাদ কাশ্মীর হাইকোর্ট রায় দেয় যে নাগরিকদের শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ করার সংবিধানসম্মত অধিকার রয়েছে। এটি সরকারের ধারা ১৪৪ ব্যবহার করে সমাবেশ নিষিদ্ধ করার প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে একটি ঐতিহাসিক রায়।
তবে অন্য দিকে, সরকার সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে “ভুয়া খবর” ছড়ানোর অভিযোগে মামলা দায়ের করে—যেখানে সাত বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। আন্তর্জাতিক সাংবাদিক ফেডারেশন (আইএফজে) এই আইনকে গণতন্ত্রের জন্য হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
এই বিক্ষোভ পাকিস্তানের জন্য একটি কূটনৈতিক বিড়ম্বনা তৈরি করেছে। দশকের পর দশক ধরে পাকিস্তান আন্তর্জাতিক মঞ্চে কাশ্মীরিদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের পক্ষে সাফাই গেয়েছে। কিন্তু যখন নিজেদের নিয়ন্ত্রণাধীন অঞ্চলের মানুষ অর্থনৈতিক বৈষম্য ও রাজনৈতিক বঞ্চনার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে, তখন তাদের দাবি “বিদেশী ষড়যন্ত্র” হিসেবে প্রত্যাখ্যান করা হয় এবং নির্মমভাবে দমন করা হয়। দি ডিপ্লোম্যাট-এর মতে, “এই বৈপরীত্য ইসলামাবাদের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষয়িষ্ণু করে, নয়াদিল্লিকে কূটনৈতিক সুবিধা দেয়।”
অক্টোবরের শান্তি চুক্তি হলেও, অনেক কর্মী সন্দিহান যে সরকারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবে রূপায়িত হবে কিনা। ২০২৪ সালের মে মাসেও অনুরূপ একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল, কিন্তু বেশিরভাগ দাবি বাস্তবায়ন হয়নি। JKJAAC নেতা শওকত নওয়াজ মীর জানিয়েছেন, “আরেকটি সরকারি কমিটি গঠন করা হচ্ছে, আমরা আগামী কয়েক সপ্তাহে বৈঠকে বসব।”
রাজনৈতিক বিশ্লেষক হারিস কাদিরের মতে, “শাসকরা এই দাবিগুলো মানতে চান না, বিশেষ করে একটি অ্যাকশন কমিটি ও গণবিক্ষোভের চাপে। কারণ একবার কোনো দাবি মেনে নিলে, দাবিগুলো বাড়তে থাকে।” তিনি আরও যোগ করেন, “সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দাবি, যা চার্টারে স্পষ্টভাবে উল্লেখ নেই, তা হলো স্বায়ত্তশাসনের অধিকার। সেই অধিকার না পাওয়া পর্যন্ত প্রতিবাদ চলবে।”
পাকিস্তান-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের এই বিক্ষোভ কেবল একটি সহিংস ঘটনা নয়—এটি একটি অঞ্চলের রাজনৈতিক পুনর্জাগরণের প্রতীক। দশকের পর দশক ধরে চলা অর্থনৈতিক বঞ্চনা, রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষ—বণিক, ছাত্র, শ্রমিক, এমনকি পুলিশ সদস্যরাও—একজোট হয়েছেন। কাশ্মীর টাইমস-এর মতে, “এটি আজাদ কাশ্মীরের জাগরণ কি না, তা নিরপেক্ষ বিশ্লেষণের বিষয়। তবে এটি নিশ্চিত যে, একটি ক্লান্ত ও অবসাদগ্রস্ত ব্যবস্থার পতনের মুহূর্ত আমরা দেখছি।”
এটি কেবল ভর্তুকি বা বিদ্যুতের দাম নিয়ে একটি বিক্ষোভ নয়। এটি একটি অঞ্চলের মানুষের মর্যাদা, প্রতিনিধিত্ব ও জবাবদিহিতার চিরন্তন দাবি। এবং যতদিন আজাদ কাশ্মীরের সম্পদ তার মানুষের কল্যাণে ব্যবহৃত না হবে, ততদিন এই আগুন নিভবে না।
—
তথ্যসূত্র: আল জাজিরা, দ্য ডিপ্লোম্যাট, জুরিস্ট, কাশ্মীর টাইমস