বাংলাদেশ ও রাশিয়ার মধ্যে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করার লক্ষ্যে মস্কোতে রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভের সঙ্গে বৈঠক করেছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। বৈঠকে দুই দেশের বাণিজ্য, বিনিয়োগ, জ্বালানি, প্রতিরক্ষা, শিক্ষা, প্রযুক্তি ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে।
বৈঠকে দুই নেতা বাংলাদেশ-রাশিয়া সম্পর্কের সামগ্রিক অগ্রগতি পর্যালোচনা করেন। একই সঙ্গে জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক ফোরামে দুই দেশের সহযোগিতা আরও জোরদারের বিষয়ে মতবিনিময় করেন। আলোচনায় তারা স্মরণ করেন, চার দশকেরও বেশি আগে নিজ নিজ দেশের কূটনৈতিক প্রতিনিধি হিসেবে তাদের পরিচয় ও বন্ধুত্বের সূচনা হয়েছিল।
ড. খলিলুর রহমান বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের গুরুত্বপূর্ণ অবদানের কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, স্বাধীনতার পর বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেওয়া প্রথম দেশগুলোর অন্যতম ছিল সাবেক ইউএসএসআর। দুই পররাষ্ট্রমন্ত্রী ২০২৭ সালে বাংলাদেশ ও রাশিয়ার কূটনৈতিক সম্পর্কের ৫৫ বছর পূর্তি উদযাপনের প্রত্যাশাও ব্যক্ত করেন।
বৈঠকে সের্গেই লাভরভ বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর করার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন। একই সঙ্গে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হওয়ায় ড. খলিলুর রহমানকে অভিনন্দন জানান। এ সময় বাংলাদেশি প্রতিনিধিদল রাশিয়ার সমর্থনের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
দুই দেশের মধ্যে শিল্প, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি, কৃষি, গবেষণা ও প্রযুক্তি, সংস্কৃতি, শিক্ষা, পর্যটন, পরিবহন এবং প্রতিরক্ষা খাতে সহযোগিতা সম্প্রসারণের বিষয়ে আলোচনা হয়। উভয় পক্ষ এসব ক্ষেত্রে বিদ্যমান সহযোগিতা আরও গভীর করার বিষয়ে একমত হয়।
বাংলাদেশের পক্ষ থেকে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। ড. খলিলুর রহমান রাশিয়ার বাজারে বাংলাদেশের পণ্যের জন্য শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্ত (ডিএফকিউএফ) সুবিধা দেওয়ার আহ্বান জানান। পাশাপাশি বাংলাদেশি পণ্যের দ্রুত নিবন্ধন প্রক্রিয়া নিশ্চিত করার অনুরোধ করেন।
তিনি বাংলাদেশের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল ও হাই-টেক পার্কগুলোতে রাশিয়ার বিনিয়োগের আহ্বান জানান। সম্ভাব্য বিনিয়োগ খাতের মধ্যে রয়েছে হালকা ও ভারী প্রকৌশল, খাদ্য ও কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ, পেট্রোকেমিক্যাল, ইস্পাত শিল্প এবং তথ্যপ্রযুক্তি।
বৈঠকে বাংলাদেশ ও ইউরেশিয়ান ইকোনমিক কমিশনের (ইইসি) মধ্যে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) সম্পন্ন করার ক্ষেত্রেও রাশিয়ার সহযোগিতা চাওয়া হয়। বর্তমানে ইইসির সদস্য দেশ পাঁচটি—রাশিয়া, বেলারুশ, আর্মেনিয়া, কাজাখস্তান ও কিরগিজস্তান।
ড. খলিলুর রহমান ব্রিকস ও সাংহাই সহযোগিতা সংস্থা (এসসিও)-এর পূর্ণ সদস্যপদ অর্জনের ক্ষেত্রেও রাশিয়ার সমর্থন কামনা করেন। এ বিষয়ে লাভরভ ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করেন।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে জ্বালানি সরবরাহের জন্য রাশিয়াকে ধন্যবাদ জানিয়ে বাংলাদেশ দ্বিতীয় ইউনিটের কাজ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সম্পন্ন করতে রাশিয়ার পূর্ণ সহযোগিতা কামনা করে।
দুই দেশের মধ্যে জনশক্তি রপ্তানির বিষয়েও আলোচনা হয়। নিরাপদ ও নিয়মতান্ত্রিক কর্মসংস্থানের জন্য বাংলাদেশ থেকে আরও দক্ষ কর্মী নিয়োগের বিষয়ে উভয় পক্ষ আগ্রহ প্রকাশ করে। এ সময় রিডমিশন চুক্তি ও মানবসম্পদ সহযোগিতা চুক্তি দ্রুত চূড়ান্ত করার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
রাশিয়ায় আটকে থাকা কয়েকজন বাংলাদেশি নাগরিকের নিরাপদ প্রত্যাবাসনের বিষয়টিও আলোচনায় আসে। এ বিষয়ে রুশ সরকার প্রয়োজনীয় বিবেচনা করবে বলে আশ্বাস দেন সের্গেই লাভরভ।
বৈঠকে রোহিঙ্গা সংকট নিয়েও আলোচনা হয়। বাংলাদেশ থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরে বাংলাদেশ। এ বিষয়ে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান খুঁজে পেতে রাশিয়া সহযোগিতা করতে আগ্রহী বলে জানান লাভরভ।
বৈঠক শেষে ড. খলিলুর রহমান উষ্ণ আতিথেয়তার জন্য রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানান এবং সুবিধাজনক সময়ে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানান।