ডিগ্রি নাকি দক্ষতা? নতুন বিতর্কে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় ব্যবস্থা

বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষার ক্রমবর্ধমান ব্যয়, স্নাতকদের নিম্ন বেতন এবং চাকরিবাজারের সঙ্গে শিক্ষার অসামঞ্জস্য নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। সম্প্রতি একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের বক্তব্যকে কেন্দ্র করে সামাজিক মাধ্যমে এ বিষয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে।

আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে একটি মৌলিক প্রশ্ন—যদি কোনো শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে লাখ লাখ টাকা ব্যয় করে, তাহলে স্নাতক হওয়ার পর তার কর্মজীবনের শুরুতে মাসে ৫ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা বেতন পাওয়া কতটা যৌক্তিক?

সমালোচকদের মতে, সমস্যাটি কেবল কম বেতনের নয়। এর সঙ্গে জড়িত রয়েছে দেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতা, দক্ষতার ঘাটতি এবং শিক্ষার অর্থায়নের বর্তমান মডেল।

বাংলাদেশে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে চার বছর মেয়াদি স্নাতক ডিগ্রি সম্পন্ন করতে অনেক ক্ষেত্রে ১৫ থেকে ৩০ লাখ টাকা পর্যন্ত ব্যয় হয়। এর সঙ্গে যোগ হয় আবাসন, যাতায়াত, বইপত্র এবং অন্যান্য খরচ।

ফলে মধ্যবিত্ত পরিবারের অনেকেই সন্তানের উচ্চশিক্ষার জন্য জমি বিক্রি, সঞ্চয় ভাঙা কিংবা ঋণ নেওয়ার মতো সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হন। অনেক পরিবারের জীবনের সবচেয়ে বড় আর্থিক বিনিয়োগ হয়ে দাঁড়ায় সন্তানের বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা।

বিশ্লেষকদের একটি অংশ বলছেন, শিক্ষার পেছনে ব্যয় করা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। তবে সেই ব্যয়ের সঙ্গে ভবিষ্যৎ আয় ও কর্মসংস্থানের একটি যৌক্তিক সম্পর্ক থাকা প্রয়োজন।

নিয়োগদাতাদের দীর্ঘদিনের অভিযোগ, অনেক বিশ্ববিদ্যালয় স্নাতক বাস্তব কর্মক্ষেত্রের প্রয়োজনীয় দক্ষতা নিয়ে বের হতে পারছেন না। ইংরেজি যোগাযোগ, তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার, রিপোর্ট লেখা, তথ্য বিশ্লেষণ কিংবা অফিস সফটওয়্যারে দক্ষতার ঘাটতি প্রায়ই দেখা যায়।

শ্রমবাজার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে ডিগ্রিধারীর সংখ্যা বাড়লেও দক্ষ জনশক্তির ঘাটতি এখনো রয়ে গেছে। ফলে অনেক শিক্ষার্থী ডিগ্রি অর্জন করেও কাঙ্ক্ষিত চাকরি বা বেতন পাচ্ছেন না।

বিশ্বের অনেক উন্নত দেশে উচ্চশিক্ষার পাশাপাশি কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষাকে সমান গুরুত্ব দেওয়া হয়। স্কুল পর্যায়ের পর বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী প্রযুক্তি, স্বাস্থ্যসেবা, উৎপাদন, নির্মাণ, অটোমেশন এবং বিভিন্ন পেশাভিত্তিক প্রশিক্ষণে যুক্ত হয়।

বাংলাদেশেও অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন, সকল শিক্ষার্থীকে বিশ্ববিদ্যালয়মুখী করার পরিবর্তে দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা সম্প্রসারণ প্রয়োজন। এতে একদিকে যেমন কর্মসংস্থান বাড়বে, অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও গবেষণা ও উচ্চতর জ্ঞানচর্চায় বেশি মনোযোগ দিতে পারবে।

আলোচনায় উঠে এসেছে শিক্ষার অর্থায়নের প্রশ্নও। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার বড় অংশের ব্যয় বহন করে পরিবার।

সমালোচকদের মতে, এই মডেল পরিবারগুলোর ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে। তাদের প্রস্তাব, শিক্ষার ব্যয়ে রাষ্ট্র, শিক্ষার্থী এবং ভবিষ্যতে সেই দক্ষতা থেকে লাভবান হওয়া শিল্প ও ব্যবসা খাতের অংশগ্রহণ বাড়ানো উচিত।

কিছু দেশে শিক্ষার্থী ঋণ, আয়ভিত্তিক পরিশোধ ব্যবস্থা এবং কর্মসংস্থান-সংযুক্ত শিক্ষাব্যবস্থা চালু রয়েছে। এসব মডেল নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

বাংলাদেশে গত দুই দশকে সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা দ্রুত বেড়েছে। তবে সমালোচকদের একটি অংশের দাবি, সংখ্যার চেয়ে শিক্ষার মান, গবেষণা, উদ্ভাবন এবং কর্মসংস্থানের সক্ষমতার ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

তাদের মতে, কেবল ডিগ্রি প্রদান নয়, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রধান দায়িত্ব হওয়া উচিত এমন মানবসম্পদ তৈরি করা, যারা বাস্তব অর্থনীতিতে মূল্য সংযোজন করতে সক্ষম।

এই বিতর্ক শেষ পর্যন্ত একটি মৌলিক প্রশ্নের সামনে দেশকে দাঁড় করিয়েছে—উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্য কি শুধু চাকরি ও বেতন, নাকি জ্ঞান, দক্ষতা এবং সামাজিক উন্নয়ন?

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উচ্চশিক্ষার মূল্য কেবল বেতনের অঙ্ক দিয়ে নির্ধারণ করা যায় না। তবে একই সঙ্গে এমন শিক্ষাব্যবস্থাও টেকসই নয়, যেখানে শিক্ষার্থী ও পরিবার বিপুল অর্থ ব্যয় করেও কর্মসংস্থান ও দক্ষতার নিশ্চয়তা পায় না।

তাদের মতে, বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থাকে আরও বাস্তবমুখী, দক্ষতাভিত্তিক এবং অর্থনৈতিকভাবে টেকসই করার বিষয়ে এখনই জাতীয় পর্যায়ে আলোচনা প্রয়োজন।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *