শেখ ফাহিম ফয়সাল
তাপজনিত ঝুঁকির দিক থেকে বাংলাদেশ বিশ্বের দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে। গত বছরের মে থেকে এ বছরের মে পর্যন্ত দেশে মোট ৯৪ দিন বিপজ্জনক গরম ছিল। এর মধ্যে ৪৪ দিন সরাসরি মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ঘটেছে। আর এই তীব্র গরমে নারীরা সাধারণত পুরুষদের তুলনায় বেশি শারীরিক কষ্টের মুখোমুখি হন।
এই বাস্তবতায় কালো জর্জেটের বোরকা পরে রাস্তায় বের হওয়ার বিষয়টি নিয়ে কিছু কথা বলা প্রয়োজন।
কালো রঙ সূর্যের আলো ও তাপের প্রায় ৯০ শতাংশ পর্যন্ত শোষণ করতে পারে। অন্যদিকে সাদা রঙ শোষণ করে মাত্র ১০ থেকে ২০ শতাংশ। ‘জার্নাল অব থার্মাল বায়োলজি’-তে প্রকাশিত গবেষণায় দেখা গেছে, সরাসরি রোদের মধ্যে কালো পোশাকের বাইরের তাপমাত্রা সাদা পোশাকের তুলনায় ৫ থেকে ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি হতে পারে। এই গরমে শুধু পাঞ্জাবি পরেই যখন হাঁসফাঁস লাগে, তখন কালো জর্জেটের বোরকা কতটা অস্বস্তি তৈরি করতে পারে, তা অনুমান করা কঠিন নয়।
ইন্দোনেশিয়া ইউনিভার্সিটি অব এডুকেশনের একটি গবেষণায় আরও একটি আকর্ষণীয় তথ্য পাওয়া গেছে। পরীক্ষাগারে দেখা গেছে, কালো পোশাক বেশি তাপ ধরে রাখে। তারপরও জরিপে অংশ নেওয়া মানুষের একটি বড় অংশ সৌন্দর্যগত কারণে কালো পোশাকই বেছে নিয়েছেন। বাংলাদেশে অনেক ক্ষেত্রেই এই পছন্দ ধর্মীয় পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত।
তবে পরিচয়ের প্রশ্নে যাওয়ার আগে ইতিহাসের ভেতর দিয়ে একটু হেঁটে আসা দরকার।
কালো বোরকা ইসলামের শুরুর দিকের কোনো নির্দিষ্ট পোশাক নয়। আজ আমরা যেভাবে কালো বোরকাকে দেখি, সেই ধারণা বহু শতাব্দীর রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গড়ে উঠেছে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) সাদা পোশাক পছন্দ করতেন। শুধু পুরুষদের জন্য নয়, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে। তিনি বলেছেন, ‘তোমরা সাদা পোশাক পরো, কারণ তা শ্রেষ্ঠ পোশাক।’ অন্য এক হাদিসে তিনি বলেন, ‘সাদা অধিক পবিত্র ও অধিক পরিচ্ছন্ন।’
ইসলামের পরবর্তী যুগে, অর্থাৎ প্রথম পাঁচ খলিফার সময়ে, পোশাকের কোনো নির্দিষ্ট রঙের বাধ্যবাধকতা ছিল না। নারীদের জন্য মূল নির্দেশ ছিল শালীন আবরণ ও ঢিলেঢালা পোশাক। কিন্তু কোনো নির্দিষ্ট রঙের কথা বলা হয়নি। পুরুষদের ক্ষেত্রে সাদা রঙকে সবচেয়ে পছন্দনীয় বলা হলেও নারীদের জন্য রঙসংক্রান্ত কোনো নির্দিষ্ট বিধান ছিল না; শালীনতাই ছিল মূল বিষয়।
উমাইয়া যুগে (৬৬১–৭৪৯ খ্রিষ্টাব্দ) পোশাকের রঙ রাজনৈতিক পরিচয়ের অংশ হয়ে ওঠে। ‘ক্লোদিং অ্যান্ড কালার্স ইন আর্লি ইসলাম’ শিরোনামে এনথ্রপোলজি অফ দ্য মিডল ইস্ট জার্নালে প্রকাশিত গবেষণায় বলা হয়েছে, সেই সময়ে ইহুদিদের হলুদ এবং খ্রিষ্টানদের নীল পোশাক পরতে হতো।
৭৫০ খ্রিষ্টাব্দে উমাইয়াদের বিরুদ্ধে আব্বাসীয় বিপ্লব শুরু হয় খোরাসান থেকে কালো পতাকা নিয়ে। সাদা উমাইয়াদের বিপরীতে কালো বেছে নেওয়া হয়েছিল সচেতন রাজনৈতিক সংকেত হিসেবে। ক্ষমতায় এসে খলিফা আল-মানসুর (৭৫৪–৭৭৫) কালোকে রাষ্ট্রীয় রঙ ঘোষণা করেন।
আব্বাসীয় স্টাডিজের গবেষণায় দেখা যায়, সেই দরবারে কর্মকর্তা থেকে সৈন্য—সবার পোশাক ছিল কালো। পতাকা ছিল কালো, এমনকি ফরমান রাখার বাক্সও কালো রেশমে মোড়ানো থাকত। চীন ও বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যে আব্বাসীয়দের পরিচয় ছিল ‘কালো পোশাকের মানুষ’ হিসেবে।
৭৫০ থেকে ১২৫৮ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত প্রায় পাঁচ শতাব্দী ধরে আব্বাসীয় শাসন টিকে ছিল। দীর্ঘ এই সময় কালো রঙকে ক্ষমতা, মর্যাদা ও আভিজাত্যের প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।
এর বিপরীতে শিয়া ফাতেমীয় খিলাফতের প্রতীকী রঙ ছিল সবুজ ও সাদা। সাদা তখন বিকল্প রাজনৈতিক অবস্থানের প্রতীক হয়ে ওঠে। আব্বাসীয় খলিফা আল-মামুন একসময় রাজনৈতিক মিত্রতার কারণে কালোর বদলে সবুজ গ্রহণ করেছিলেন। তখন বাগদাদের মানুষ রাস্তায় নেমে বিদ্রোহ করেছিল। কারণ তাদের কাছে কালোই ছিল বৈধ শাসনের রঙ।
মুসলিম স্পেন বা আন্দালুসে চিত্রটি ছিল ভিন্ন। সেখানে নারীদের পোশাক ছিল নানা রঙের ও নানা ধরনের কাপড়ে তৈরি। কর্দোবা ও গ্রানাডার দরবারি নারীদের পোশাকের বর্ণনা সমসাময়িক আরবি সাহিত্যেও পাওয়া যায়। সেখানে কালো কোনো বাধ্যতামূলক রঙ ছিল না।
ভারতবর্ষে ইসলাম আসার পর পর্দার ধারণা এসে মিশেছিল ভিন্ন এক সাংস্কৃতিক পরিবেশে। দিল্লি সালতানাতের সময়ে আমির খসরু তাঁর লেখায় বারবার বোরকা ও পর্দার কথা উল্লেখ করেছেন, কিন্তু রঙ নিয়ে খুব স্পষ্ট কিছু বলেননি। সেই সময়ের বোরকা ছিল মূলত বাইরে বের হওয়ার আবরণ এবং সম্ভ্রমের চিহ্ন।
পরে ফিরোজ শাহ তুঘলুক মুসলিম নারীদের মাজারে যাওয়া নিষিদ্ধ করেন। সুলতান সিকান্দার লোদিও একই ধরনের বিধিনিষেধ আরোপ করেছিলেন। অর্থাৎ পর্দা তখন ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণের একটি উপায় হিসেবেও ব্যবহৃত হতে শুরু করে।
মোঘল যুগে উপমহাদেশের পোশাক সংস্কৃতি আরও সমৃদ্ধ হয়। ঐতিহাসিক নথি ও বিভিন্ন গবেষণা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, হেরেমের নারীরা পেশওয়াজ পরতেন, যা ঢাকার মসলিন দিয়ে তৈরি হতো। মাথা ঢাকা থাকত ওড়না বা চাদরে। রঙিন ও মূল্যবান কাপড়ের পোশাক ছিল সামাজিক মর্যাদার প্রতীক।
গুলবদন বেগমের ‘হুমায়ুননামা’য় নবরত্নখচিত জ্যাকেটের উল্লেখ রয়েছে। লক্ষণীয় বিষয় হলো, মোঘল আমলে বোরকার ব্যবহার থাকলেও সেটি কালো ছিল—এমন কোনো প্রামাণ্য তথ্য পাওয়া যায় না। বরং দরিদ্র নারীরা সাধারণত অতিরিক্ত আবরণ ব্যবহার করতেন না। গ্রামীণ নারীরা শাড়ির আঁচল দিয়েই মাথা ঢাকতেন।
বাংলায় সুবেদারি ও নবাবি আমলে মুসলিম নারীদের মধ্যে পর্দা পালনের ধারণা ছিল। তবে বাংলার আর্দ্র ও উষ্ণ জলবায়ুতে পুরো শরীর ঢেকে রাখা পোশাক ছিল মূলত উচ্চবিত্তের বিষয়। নবাব পরিবারের নারীরা পালকিতে চলাফেরা করতেন, ফলে পোশাকের গরম তুলনামূলক কম সহ্য করতে হতো। অন্যদিকে নিম্নবর্গের নারীরা মাঠে-ঘাটে কাজ করতেন; তাদের জীবনে কালো বোরকার কোনো বাস্তব স্থান ছিল না।
ব্রিটিশ আমলে পর্দা হয়ে ওঠে সামাজিক মর্যাদা ও শ্রেণির প্রতীক। মুসলিম মধ্যবিত্ত সমাজের একাংশ বোরকাকে ইসলামি পরিচয় রক্ষার মাধ্যম হিসেবে দেখতে শুরু করে।
পাকিস্তান আমলে (১৯৪৭–১৯৭১) দ্বিজাতিতত্ত্বের প্রভাবে পোশাক আরও স্পষ্টভাবে ধর্মীয় পরিচয়ের বাহক হয়ে ওঠে। মুসলিম পরিচয়কে হিন্দু পরিচয় থেকে আলাদা করে দেখানোর সাংস্কৃতিক চাপ ছিল প্রবল। তবু সে সময়ও বাংলার গ্রামাঞ্চলে মুসলিম নারীরা মূলত শাড়ির আঁচল বা ওড়না ব্যবহার করতেন। কালো বোরকা তখনও ব্যাপক ছিল না।
তাহলে বাংলাদেশে কালো বোরকার ব্যাপক বিস্তার কখন ঘটল? এর উত্তর অনেকাংশে লুকিয়ে আছে ১৯৭৯ সালের ইরানে।
১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লব শুধু একটি দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থাই বদলায়নি; মুসলিম বিশ্বের পোশাক-রাজনীতিতেও গভীর প্রভাব ফেলেছিল। আয়াতুল্লাহ খোমেনি ক্ষমতায় এসে নারীদের জন্য কালো চাদর বা ‘রুপোশ’ বাধ্যতামূলক করেন।
ইরান প্রাইমারের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭৯ সালের মার্চে এক লাখেরও বেশি ইরানি নারী এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমেছিলেন। কিন্তু সেই প্রতিবাদ সফল হয়নি। টেলিভিশন, সংবাদপত্র ও আলোকচিত্রে কালো চাদর পরা ইরানি নারী ধীরে ধীরে ‘ইসলামি নারীর’ আন্তর্জাতিক প্রতীকে পরিণত হয়। পশ্চিমা গণমাধ্যমও এই চিত্রকেই অনেক ক্ষেত্রে ইসলামের সামগ্রিক প্রতিচ্ছবি হিসেবে উপস্থাপন করে।
এদিকে ইরানের শিয়া বিপ্লব সৌদি আরবকে উদ্বিগ্ন করে তোলে। এর প্রতিক্রিয়ায় সৌদি আরব ওয়াহাবি ও সালাফি মতাদর্শ প্রচারে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করে—মসজিদ নির্মাণ, মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা ও আন্তর্জাতিক বৃত্তি কর্মসূচির মাধ্যমে।
বিশ্ব ইতিহাসের এই ‘ক্রোমাটিক পলিটিক্স’-এ ইরানের কালো এবং উপসাগরীয় অঞ্চলের কালো মিলেমিশে একটি বার্তা তৈরি করে—কালো বোরকাই যেন ‘ইসলামি’ পোশাক।
সৌদি আরবের বৈশ্বিক মসজিদ ও মাদ্রাসা অর্থায়নের ফলে নিকাব ও কালো আবরণ বিশ্বের বহু অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে, যেখানে এগুলো আগে স্থানীয় সংস্কৃতির অংশ ছিল না।
বাংলাদেশে আগে থেকেই সাদা, আকাশি ও কালো বোরকার ব্যবহার ছিল। তবে কালো বোরকার এই নতুন ঢেউ আসে মূলত দুই পথে।
প্রথমত, মধ্যপ্রাচ্যে শ্রম অভিবাসন। ১৯৮০-এর দশক থেকে লক্ষ লক্ষ বাংলাদেশি সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে কাজ করতে যান। ২০২২ সালের শুমারি অনুযায়ী, শুধু সৌদি আরবেই ২১ লাখের বেশি বাংলাদেশি কর্মরত ছিলেন। তাঁরা দেশে অর্থ পাঠানোর পাশাপাশি উপসাগরীয় পোশাক সংস্কৃতির প্রভাবও নিয়ে আসেন।
রিজিয়া রোজারিওর গবেষণায় দেখা যায়, অনেক মধ্যবিত্ত পরিবারে বোরকা সম্ভ্রমের প্রতীক এবং সামাজিক অবস্থান প্রকাশের সাংস্কৃতিক উপাদান হিসেবেও ব্যবহৃত হয়েছে।
দ্বিতীয়ত, মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী রাজনৈতিক পরিবর্তন। সাইফুর রহমান রোজারিওর ২০০৬ সালের গবেষণা অনুযায়ী, স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে ইসলামপন্থী আন্দোলনের বিস্তার ঘটে। এটি ছিল আধুনিকতার মুখোমুখি হয়ে পরিচয়-সংকটে পড়া সমাজের একটি প্রতিক্রিয়া।
মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী সেক্যুলার জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্রধারণা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। জিয়া ও এরশাদের আমলে রাজনীতিতে ইসলামের আনুষ্ঠানিক উপস্থিতি বাড়ে; সংবিধানে যুক্ত হয় ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’। এর ফলে মুসলিম পরিচয় দৃশ্যমানভাবে প্রকাশের একটি সাংস্কৃতিক চাপ তৈরি হয়।
একটি প্রতিবেদনে এক বাংলাদেশি নারীর মায়ের বক্তব্য উদ্ধৃত হয়েছে—ঢাকায় বড় হওয়ার সময় ‘হিজাব’ শব্দটি তেমন পরিচিত ছিল না; মানুষ বলত ‘পর্দা’। গ্রামাঞ্চলে দু-একজন কালো বোরকা পরলেও তা ব্যাপক ছিল না।
১৯৯০-এর দশকে এই চিত্র বদলাতে শুরু করে। গার্মেন্টসকর্মী, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী, মধ্যবিত্ত পরিবারের নারী—অনেকেই বোরকা ব্যবহার শুরু করেন। এটি ছিল নতুন পরিচয়-রাজনীতি এবং আধুনিক ইসলামপন্থী আন্দোলনের একটি অংশ, যা এর আগে বাংলাদেশে এত ব্যাপক ছিল না।
এই দীর্ঘ ইতিহাসের সবচেয়ে লক্ষণীয় বিষয় হলো, হাদিসের বর্ণনা এবং পরবর্তী ইতিহাস অনেক ক্ষেত্রে ভিন্ন পথে এগিয়েছে।
ইবনে আব্বাস (রা.) বর্ণনা করেছেন, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘সাদা পোশাক পরো, কারণ এটাই সর্বোত্তম পোশাক, এবং তোমাদের মৃতদের সাদাতেই কাফন দাও।’ নাসাঈ ও হাকিমের বর্ণনায়ও সাদা পোশাককে অধিক পবিত্র ও বিনয়ের কাছাকাছি বলা হয়েছে।
উম্মে সালামা (রা.)-এর একটি বর্ণনায় কালো আবরণের উল্লেখ পাওয়া যায়। তবে সেটি তাঁর ব্যক্তিগত পোশাক নয়; আনসার নারী সাহাবিদের পোশাকের প্রসঙ্গে এসেছে।
তবে আরবের বাস্তবতাও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। সে সময় সাদা কাপড় পরিষ্কার রাখা ছিল অত্যন্ত কঠিন। কাপড়ের সরবরাহ সীমিত ছিল, পানিরও অভাব ছিল। সাদা কাপড় দ্রুত ময়লা হয়ে যায় এবং ঘন ঘন ধোয়ার প্রয়োজন হয়। কালো কাপড়ের ক্ষেত্রে সেই সমস্যা তুলনামূলক কম ছিল।
বাস্তবতা হলো, নারীদের জন্য কালো পোশাক বাধ্যতামূলক—এমন কোনো বিশুদ্ধ হাদিস বা সর্বসম্মত ফিকহি মত নেই।
চৌদ্দ শতকে ইবনে আল-উখুওয়া লিখেছিলেন, মসজিদের ইমামের জন্য কালোর পরিবর্তে সাদা পোশাক পরাই অধিক বাঞ্ছনীয়। অর্থাৎ সে সময়েও কালো কোনো আবশ্যিক ইসলামি রঙ হিসেবে বিবেচিত হয়নি।
উত্তর আফ্রিকার মরক্কো ও তিউনিসিয়ায় ঐতিহ্যবাহী বাইরের পোশাক সাধারণত সাদা বা হালকা রঙের। ভূমধ্যসাগরীয় জলবায়ুর সঙ্গে এর সম্পর্ক রয়েছে।
এমনকি সংযুক্ত আরব আমিরাতেও বর্তমানে ক্রেপ, শিফন ও হালকা কাপড়ের সাদা কিংবা বেজ রঙের আবায়া জনপ্রিয় হচ্ছে। কারণ উপসাগরীয় তাপপ্রবাহেও শরীরকে স্বস্তিতে রাখা প্রয়োজন। অর্থাৎ যে অঞ্চল থেকে কালো আবায়ার সংস্কৃতি এসেছে, সেখানেও ধীরে ধীরে হালকা রঙের দিকে ঝোঁক বাড়ছে।
অনেক মানুষের কাছে কালো বোরকা শুধু পোশাক নয়; এটি ধর্মীয় বিশ্বাস, পারিবারিক ঐতিহ্য, সামাজিক পরিচয় এবং আত্মপরিচয়ের একটি অংশ। ফলে রঙ পরিবর্তনের প্রশ্ন উঠলে অস্বস্তি হওয়া স্বাভাবিক।
রঙের মনোবিজ্ঞান নিয়ে কাজ করা গবেষকেরাও বলেন, কালো পোশাক অনেকের কাছে মানসিক সুরক্ষার অনুভূতি তৈরি করে। এতে দৃষ্টি এড়িয়ে থাকার বা আড়ালে থাকার অনুভব পাওয়া যায়। বিশেষ করে বয়স্ক নারীদের কাছে কালো বোরকা দীর্ঘদিনের ধর্মীয় ও সামাজিক অভ্যাসের অংশ।
তাই পোশাক পরিবর্তনের প্রশ্নটি কেবল কাপড় বা রঙের প্রশ্ন নয়; এটি পরিচয় ও অভ্যাসের সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িত।
তবে পোশাকের মানদণ্ড সাধারণত সমাজের ওপরের স্তর থেকে নিচের স্তরে ছড়িয়ে পড়ে। একটি শ্রেণি নতুন মানদণ্ড তৈরি করে, পরে অন্যরা তা অনুসরণ করে। ইতিহাসে প্রায় সব বড় পোশাক-পরিবর্তন এভাবেই এসেছে।
যদি সমাজের প্রভাবশালী ও সচেতন অংশ সাদা বা হালকা রঙের বোরকাকে স্বাভাবিক করে তোলে, তাহলে সেই পরিবর্তন ছড়িয়ে পড়তে খুব বেশি সময় লাগবে না।
এখানে জর্জেট কাপড়ের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। গরমে আরামদায়ক কাপড় হলো এমন কাপড়, যা বাতাস চলাচল করতে দেয় এবং ঘাম সহজে বের হতে সাহায্য করে। তুলা বা লিনেনজাতীয় কাপড়ে তৈরি সাদা বা হালকা রঙের বোরকা শরীরকে তুলনামূলক বেশি স্বস্তি দিতে পারে।
কালো রঙ বেশি তাপ শোষণ করে, সাদা কম শোষণ করে—এটি পদার্থবিজ্ঞানের একটি মৌলিক সত্য। আর ইতিহাস বলছে, কালো বোরকার এই নির্দিষ্ট রঙ ইসলামের শুরু থেকেই নির্ধারিত ছিল না।
১৯৭৯ সালের তেহরানের রাস্তায় দেখা কালো চাদরকে পশ্চিমা বিশ্ব ইসলামের প্রতীক হিসেবে দেখতে শুরু করেছিল। একই সময়ে সৌদি আরবও নিজস্ব ধর্মীয়-রাজনৈতিক বার্তা ছড়িয়ে দিতে কালো রঙকে ব্যবহার করেছিল। দুই পক্ষের উদ্দেশ্য আলাদা হলেও রঙ ছিল এক।
বাংলাদেশসহ অনেক দেশ পরে এই দুই প্রভাবের মধ্যবর্তী অবস্থানে এসে পড়ে। মধ্যপ্রাচ্যফেরত শ্রমিকেরা দেশে উপসাগরীয় পোশাক সংস্কৃতির প্রভাব নিয়ে আসেন। সমাজবিজ্ঞানীরা এই প্রক্রিয়াকে ‘গ্লোবাল পলিটিক্স অব ইসলাম’ বলে বর্ণনা করেছেন। তাঁদের মতে, এর ফলে অনেক স্থানে স্থানীয় পর্দা-সংস্কৃতির জায়গা নিতে শুরু করে বাইরে থেকে আসা নতুন পরিচয়ভিত্তিক পোশাকধারা।
এই ইতিহাস জানার পর কেউ যদি মনে করেন, এই গরমে সাদা বা হালকা রঙের বোরকা বেছে নেওয়ার মধ্যে তাপ থেকে বাঁচার যুক্তি আছে, হাদিসে উৎসাহিত রঙের দিকে যাওয়ার যুক্তি আছে এবং দীর্ঘদিনের একটি ঐতিহাসিক ধারণাকে নতুনভাবে দেখার সুযোগও আছে—তাহলে সেই ভাবনাকে একেবারে অযৌক্তিক বলা যায় না।
বাংলাদেশে এখন বছরে ৯৪ দিন বিপজ্জনক গরম পড়ে। এই দেশের জলবায়ু এবং যে অঞ্চল থেকে কালো পোশাকের এই রেওয়াজ এসেছে, সেই মরুভূমির জলবায়ু এক নয়।
অবশ্য কর্মজীবী ও নিম্নআয়ের মানুষের জন্য সাদা বা হালকা রঙের পোশাক পরিষ্কার রাখা কঠিন হতে পারে। তবুও আরাম, স্বাস্থ্য ও বাস্তবতার কথা বিবেচনা করে হালকা রঙের পোশাকের প্রচলন বাড়ানোর আলোচনা হতে পারে।
বোরকা পর্দার অংশ কি না—সেই ফিকহি বিতর্ক এখানে আলোচনার বিষয় নয়।
আর ২০২৪ সালে শুধু গরমের কারণে প্রায় ২৫ কোটি কর্মদিবস নষ্ট হয়েছে। অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৭৮ কোটি ডলার। তবে সবকিছুর হিসাব অর্থে মাপা যায় না।
এতসব আলোচনা হয়তো অনেক মা, খালা বা বয়স্ক নারীকে তাঁদের অভ্যাস পরিবর্তনে রাজি করাবে না। তবুও তরুণ প্রজন্মের মানুষ বিষয়টি নতুন করে ভেবে দেখতে পারেন। এমনকি কালো পোশাকই যদি বেছে নেওয়া হয়, অন্তত কাপড়টি যেন জর্জেটের বদলে আরামদায়ক ও বায়ু চলাচল-উপযোগী হয়—সেই ভাবনাটুকুও গুরুত্বপূর্ণ।