২০২৬ সালের ২৮শে ফেব্রুয়ারি, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানের ওপর বিমান হামলা চালায়—যা পরিচিত হয় “২০২৬ ইরান যুদ্ধ” হিসেবে। এই হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনেই সহ একাধিক শীর্ষ কর্মকর্তা নিহত হন। ইরান পাল্টা হামলা চালায় ইসরায়েল, যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটি এবং পার্শ্ববর্তী আরব দেশগুলোর ওপর, একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেয়। এই ঘটনায় বিশ্বব্যাপী প্রতিক্রিয়ার ঝড় ওঠে—কেউ সমর্থন জানায়, কেউ নিন্দা করে, আবার কেউ নিরপেক্ষ থাকার চেষ্টা করে।
অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজ যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলাকে সমর্থন জানিয়ে বলেন, তারা “ইরানের মানুষের সাহসী সংগ্রামের সঙ্গে দাঁড়াচ্ছেন।” অস্ট্রেলিয়া পরে ইরানের নারী ফুটবল দলের সদস্যদের মানবিক ভিসা প্রদান করে, যারা ইরানে ফিরে যাওয়ার ভয়ে ছিলেন। নিউজিল্যান্ডও একই পথ অনুসরণ করে, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও অঞ্চলিক অস্থিরতার নিন্দা জানায়।
কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি ইরানকে “মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতার প্রধান উৎস” হিসেবে অভিহিত করে হামলাকে সমর্থন জানান, যদিও তিনি একে “আন্তর্জাতিক আইনের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ” বলেও মন্তব্য করেন। ত্রিনিদাদ-টোবাগোর প্রধানমন্ত্রী কামলা পার্সাদ-বিসেসার ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে “বৈশ্বিক হুমকি” আখ্যা দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের পাশে দাঁড়ান।
আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট জাভিয়ের মিলেই নিজেকে “বিশ্বের সবচেয়ে জায়নিস্ট প্রেসিডেন্ট” হিসেবে অভিহিত করে বলেন, “ইরান আমাদের দুইবার বোমা মেরেছে… ইরান আমাদের শত্রু।” প্যারাগুয়ের প্রেসিডেন্ট সান্তিয়াগো পেইনাও যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের পক্ষে অবস্থান নেন।
জার্মানি, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স এক যৌথ বিবৃতিতে ইরানের পাল্টা হামলার নিন্দা জানায়। যুক্তরাজ্য প্রথমে তাদের ঘাঁটি ব্যবহারে অনুমতি দেয়নি, কিন্তু পরে প্রতিরক্ষামূলক উদ্দেশ্যে অনুমতি দেয়। পর্তুগাল তাদের লাজেস ঘাঁটি যুক্তরাষ্ট্রকে ব্যবহারের অনুমতি দেয়। আলবেনিয়া প্রধানমন্ত্রী এদি রামা যুক্তরাষ্ট্রের পাশে দাঁড়িয়ে ইরানের বিপ্লবী গার্ডকে (IRGC) সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে ঘোষণা করেন।
তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রেচেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ান যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলা ও ইরানের পাল্টা হামলা—উভয়কেই নিন্দা করেন। তিনি খামেনেইর মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করে একে “আন্তর্জাতিক আইনের স্পষ্ট লঙ্ঘন” বলে অভিহিত করেন। ওমান, যারা মধ্যস্থতার চেষ্টা করছিল, তাদের “সক্রিয় ও গুরুতর আলোচনা” বাতিল হওয়ায় হতাশা প্রকাশ করে।
স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের একতরফা সামরিক পদক্ষেপকে “প্রত্যাখ্যান” করেন এবং এটিকে “আরও অনিশ্চয়তাপূর্ণ ও শত্রুতাপূর্ণ আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার” দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে বলে মন্তব্য করেন। স্পেন যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের সামরিক ঘাঁটি ব্যবহারে অস্বীকৃতি জানায়, যার জবাবে ট্রাম্প স্পেনের সঙ্গে বাণিজ্য বন্ধের হুমকি দেন। নরওয়ের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এসপেন বার্থ এইডে বলেন, “প্রতিরোধমূলক হামলা একটি অবিলম্বে আসন্ন হুমকির জন্য প্রয়োজন ” যা ইরানের ক্ষেত্রে ছিল না।
ব্রাজিল ইরানের ওপর হামলার নিন্দা জানিয়ে আন্তর্জাতিক আইন ও নাগরিকদের নিরাপত্তার প্রতি শ্রদ্ধা রাখার আহ্বান জানায়। কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেট্রো যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার তীব্র নিন্দা জানান এবং একটি “বৈশ্বিক শান্তি মোর্চা” গঠনের আহ্বান জানান। কিউবার প্রেসিডেন্ট মিগেল দিয়াজ-কানেলও হামলার নিন্দা জানান।
আলজেরিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় হামলাকে “সার্বভৌমত্বের স্পষ্ট লঙ্ঘন” ও “আমেরিকান-জায়নিস্ট আক্রমণ” হিসেবে অভিহিত করে। চাদের প্রেসিডেন্ট মাহামাত দেবি খামেনেইর মৃত্যুতে সমবেদনা জানান এবং ইরানি জনগণের বেদনায় শামিল হন।
ভারত ইরানের পাল্টা হামলার নিন্দা জানায়। চীন শান্তির আহ্বান জানায় এবং অঞ্চলীয় স্থিতিশীলতার প্রতি উদ্বেগ প্রকাশ করে।
সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত ও কাতার প্রথমে যুদ্ধের বিরোধিতা করে। কিন্তু ইরান তাদের ওপর ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালালে ১৬ই মার্চ তারা যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানকে “নিরপেক্ষ করতে” আহ্বান জানায়। সংযুক্ত আরব আমিরাত সবচেয়ে আক্রমণাত্মক অবস্থান নেয়, তাদের রাষ্ট্রদূত ইউসেফ আল-ওতাইবা যুক্তরাষ্ট্রকে “চূড়ান্ত ফলাফল” অর্জনের আহ্বান জানান।
ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডের লেয়েন ও কাউন্সিল প্রেসিডেন্ট আন্তোনিও কোস্তা উভয় পক্ষকে সংযত হওয়ার আহ্বান জানান। কিন্তু ইউরোপের ভেতরেই মতপার্থক্য ছিল—আফডি (জার্মানি), ভ্লামস বেলাং (বেলজিয়াম) ও ন্যাশনাল র্যালি (ফ্রান্স) যুদ্ধকে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন বলে নিন্দা করে, অপরদিকে ভক্স (স্পেন), রিফর্ম ইউকে ও ফিডেজ (হাঙ্গেরি) এটিকে “মুক্ত বিশ্বের পক্ষে” পদক্ষেপ হিসেবে সমর্থন করে।
রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলাকে “অবিবেচনাপূর্ণ পদক্ষেপ” ও “পূর্বপরিকল্পিত সশস্ত্র আক্রমণ” হিসেবে নিন্দা করেন। তবে পুতিন ইরানের পাশে দাঁড়ালেও উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ রেখে নিরপেক্ষতার ভঙ্গি করেন।
সিএনএন-এর জরিপে দেখা যায়, ৫৯% মার্কিনী যুদ্ধের বিরোধিতা করে, ৪১% সমর্থন করে। রিপাবলিকানদের মধ্যে সমর্থন বেশি, ডেমোক্র্যাট ও স্বতন্ত্র ভোটারদের মধ্যে বিরোধিতা বেশি। ৬৫% মার্কিনী মনে করেন ট্রাম্প একটি বড় স্থলযুদ্ধের আদেশ দেবেন, কিন্তু মাত্র ৭% তা সমর্থন করে।
জার্মানিতে ৫৮%, ইতালিতে ৫৬% ও স্পেনে ৬৮% জনগণ যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলাকে অনুমোদনযোগ্য মনে করে নি। যুক্তরাজ্যে ৪৯% বিরোধিতা করে ২৮% সমর্থনের বিপরীতে।
জাপানে মাত্র ৭% হামলা সমর্থন করে, ৭৫%-৮৬% বিরোধিতা করে। এমনকি ক্ষমতাসীন লিবারেল ডেমোক্র্যাটিক পার্টির সমর্থকদের মধ্যেও ৬৯.৯% হামলার বিরোধিতা করে।
ইসরায়েল ডেমোক্রেসি ইনস্টিটিউটের জরিপে ৮২% ইসরায়েলি সামরিক অভিযানের সমর্থন জানায়—ইহুদি ইসরায়েলিদের মধ্যে ৯৩% ও আরব ইসরায়েলিদের মধ্যে ২৬%।
জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস সব পক্ষকে সংযত হওয়ার আহ্বান জানান। ১১ মার্চ জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ বাহরাইনের আহবানে প্রস্তাব ২৮১৭ পাস করে, যা ইরানের উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোর ওপর হামলার নিন্দা জানায়, যদিও যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের প্রাথমিক হামলার উল্লেখ তাতে ছিল না।
আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার “গভীর উদ্বেগ” প্রকাশ করে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রধান হামলার নিন্দা জানান। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মহাসচিব এসব পদক্ষেপকে “সম্ভাব্য যুদ্ধাপরাধ” হিসেবে অভিহিত করেন।
২০২৬ ইরান যুদ্ধ বিশ্বকে তিনটি ভাগে বিভক্ত করে দিয়েছে—যারা সমর্থন করে, যারা নিন্দা করে, এবং যারা নিরপেক্ষ থাকার চেষ্টা করে। এই বিভাজন ভূগোল, রাজনীতি ও ইতিহাসের ওপর নির্ভরশীল। উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলো প্রথমে শান্তির পক্ষে থাকলেও ইরানের হামলার পর তাদের অবস্থান পরিবর্তন হয়। ইউরোপ বিভক্ত—পূর্ব ইউরোপ যুক্তরাষ্ট্রের পাশে, পশ্চিম ইউরোপের কিছু দেশ শান্তির পক্ষে।
সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, যুদ্ধের সমর্থন বা বিরোধিতা অনেক ক্ষেত্রে অভ্যন্তরীণ রাজনীতির ওপর নির্ভরশীল। ট্রাম্পের সমর্থকরা যুদ্ধ সমর্থন করে, বিরোধীরা বিরোধিতা করে। ইউরোপের ডানপন্থী দলগুলো বিভক্ত—কেউ “মুক্ত বিশ্বের” নামে সমর্থন করে, কেউ আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন বলে নিন্দা করে।
এই যুদ্ধ শুধু মধ্যপ্রাচ্যের ভূগোলকেই বদলে দেয়নি, বিশ্বের কূটনৈতিক মানচিত্রকেও পুনর্বিন্যাস করেছে। এটি প্রমাণ করে যে আজকের আন্তঃসংযুক্ত বিশ্বে কোনো যুদ্ধ আর কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় থাকে না—প্রতিটি পদক্ষেপের তরঙ্গ বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে।
তথ্যসূত্র: বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম