বাংলাদেশের অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও করব্যবস্থায় ব্যাপক সংস্কারের লক্ষ্য নিয়ে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৭১ দফা প্রস্তাবসম্বলিত ছায়া বাজেট প্রকাশ করেছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। ‘বাংলাদেশ ২.০: সংস্কার, কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগের মাধ্যমে টেকসই প্রবৃদ্ধি’ প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে প্রণীত এই বাজেটে ১২টি প্রধান খাতে নানা নীতি ও কর্মসূচির প্রস্তাব তুলে ধরা হয়েছে।
শুক্রবার (৫ই জুন) রাজধানীর রূপায়ন টাওয়ারে আয়োজিত অনুষ্ঠানে এনসিপির ছায়া বাজেট কমিটি এসব প্রস্তাব উপস্থাপন করে। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন দলের মুখ্য সংগঠক (দক্ষিণাঞ্চল) ও সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহ, ছায়া বাজেট কমিটির প্রধান ড. আতিক মুজাহিদ, উপ-প্রধান আব্দুল্লাহ আল ফয়সাল, যুগ্ম সদস্য সচিব আলাউদ্দিন মোহাম্মদ এবং জাতীয় শ্রমিক শক্তির যুগ্ম আহ্বায়ক সজিব ওয়াহিদ।
এনসিপির প্রস্তাবিত বাজেটের আকার ৮ লাখ ৫২ হাজার ১৫৭ কোটি টাকা। দলটি বলছে, বর্তমান অর্থবছরের তুলনায় মোট ব্যয় প্রায় ৭.৮৭ শতাংশ বৃদ্ধি করা হলেও বাজেট ঘাটতি জিডিপির ৩.০৯ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা সম্ভব।
ছায়া বাজেটে ১৩ শতাংশ নামমাত্র প্রবৃদ্ধি ধরে জিডিপির আকার ৬৮ লাখ ৭০ হাজার ২৬০ কোটি টাকা ধরা হয়েছে। একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি ৯.২ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৮ শতাংশে এবং পরবর্তী অর্থবছরে ৬ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
এছাড়া বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩২ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করা, কর-জিডিপি অনুপাত ৯.৩২ শতাংশে উন্নীত করা এবং ব্যাংকিং খাতে সরকারি ঋণ কমানোর পরিকল্পনাও রয়েছে।
রাজস্ব আয়ের ক্ষেত্রে এনসিপি বেশ কিছু নতুন প্রস্তাব দিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে টিআইএন, জাতীয় পরিচয়পত্র ও মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসের তথ্য সংযুক্তকরণ, জাতীয় ডিজিটাল সম্পদ নিবন্ধন (এনডিএআর) চালু, বন্দর ব্যবস্থার ডিজিটাইজেশন এবং রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত করা।
রাজস্ব বাড়ানোর লক্ষ্যে মাসে ৭৫ ইউনিটের বেশি বিদ্যুৎ ব্যবহারকারী গ্রাহকদের আয়কর রিটার্ন দাখিল বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাবও দিয়েছে দলটি।
কর ব্যবস্থায় সাধারণ করমুক্ত আয়ের সীমা সাড়ে ৪ লাখ টাকা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। নারীদের জন্য ৪ লাখ ৭৫ হাজার এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা নির্ধারণের সুপারিশ করা হয়েছে।
এছাড়া যাকাতকে আয়কর রিবেট হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া, উত্তরাধিকার কর চালু, করপোরেট কর ২৫ শতাংশে নামিয়ে আনা এবং মোবাইল ইন্টারনেটের ওপর কর কমানোর প্রস্তাব রয়েছে।
ছায়া বাজেটে শিক্ষাখাতে ১ লাখ ২৪ হাজার ৪২৫ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। শতভাগ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে স্কুল ফিডিং কার্যক্রম চালু, ৫ হাজার কোটি টাকার শিক্ষক গুণমান তহবিল গঠন এবং কারিগরি শিক্ষায় অংশগ্রহণ ৩০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
এছাড়া ৫০০ কোটি টাকার স্টার্টআপ গ্যারান্টি তহবিল গঠন এবং পাঁচ বছরে এক কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টির অঙ্গীকার করেছে দলটি।
স্বাস্থ্য খাতে ২৫ শতাংশ বাজেট বৃদ্ধি এবং জাতীয় স্বাস্থ্য বিমা চালুর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। নিম্নআয়ের মানুষের জন্য ক্যানসার চিকিৎসা, ডায়ালাইসিস, অ্যাঞ্জিওপ্লাস্টি ও বাইপাস সার্জারিতে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত ভর্তুকি দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
দুটি আন্তর্জাতিক মানের সুপার-স্পেশালিটি হাসপাতাল নির্মাণ, ৫০০ নতুন জিপিএস-ট্র্যাকড অ্যাম্বুলেন্স চালু এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিগুলোকে একীভূত করার প্রস্তাবও রয়েছে।
কৃষি খাতে আধুনিক শস্য বিক্রয় কেন্দ্র স্থাপন, মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব কমানো এবং কৃষকদের অ্যাকাউন্টে সরাসরি সার ভর্তুকি দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
জ্বালানি খাতে পাঁচ বছরের জন্য সৌর পণ্যের ওপর শূন্য কর আরোপ, ৬ হাজার কোটি টাকার নবায়নযোগ্য জ্বালানি কর্মসূচি এবং ২০ লাখ ই-রিকশাকে লিথিয়াম ব্যাটারিতে রূপান্তরের পরিকল্পনা রয়েছে।
নারী উদ্যোক্তাদের জন্য ৫ হাজার কোটি টাকার তহবিল গঠন, ২৫ লাখ টাকা পর্যন্ত জামানতবিহীন ঋণ, স্যানিটারি ন্যাপকিনের ওপর সব ধরনের ভ্যাট প্রত্যাহার এবং বৈতনিক মাতৃত্ব ও পিতৃত্বকালীন ছুটি চালুর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
পাশাপাশি ইমাম, মুয়াজ্জিন, খাদেম ও পুরোহিতদের জাতীয় বেতন স্কেলের ১৬তম গ্রেডে অন্তর্ভুক্ত করার সুপারিশ করা হয়েছে।
ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে কঠোর আইন প্রণয়নের প্রস্তাব দিয়েছে এনসিপি। ৫০ লাখ টাকার বেশি ঋণখেলাপিদের জন্য কেন্দ্রীয় ডেটাবেইস তৈরি এবং তাদের বিভিন্ন সরকারি সুবিধা থেকে বঞ্চিত করার কথা বলা হয়েছে।
এছাড়া ৫ হাজার কোটি টাকার মূলধন নিয়ে রাষ্ট্রীয় ‘ব্যাড ব্যাংক’ গঠন, ব্যাংকের প্রকৃত আর্থিক অবস্থা প্রকাশ এবং গ্রিন বন্ড ও ওয়াকফ সুকুক চালুর প্রস্তাবও রয়েছে।
অনুষ্ঠানে হাসনাত আব্দুল্লাহ বলেন, বর্তমান সরকার আওয়ামী লীগের রেখে যাওয়া সংকটাপন্ন অর্থনীতি উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছে। তার দাবি, দীর্ঘদিন ধরে অর্থনীতির প্রকৃত অবস্থা জনগণের কাছ থেকে আড়াল করা হয়েছে এবং খেলাপি ঋণ, জ্বালানি আমদানি নির্ভরতা ও আর্থিক খাতের দুর্বলতা দেশের অর্থনীতিকে চাপে ফেলেছে।
তিনি বলেন, কর-জিডিপি অনুপাত এখনও এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের মধ্যে অন্যতম নিম্ন পর্যায়ে রয়েছে এবং সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন কাঠামো ২০১৫ সালের পর আর পর্যালোচনা করা হয়নি।
হাসনাত আব্দুল্লাহ দাবি করেন, এনসিপির লক্ষ্য হলো একটি বৈষম্যহীন ও জবাবদিহিমূলক অর্থনীতি গড়ে তোলা, যেখানে করদাতারা উৎসাহিত হবেন এবং রাষ্ট্রীয় সেবাগুলো জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে যাবে।
তিনি বলেন, “আমরা শুধু পরিসংখ্যাননির্ভর নামসর্বস্ব কোনো বাজেট দেখতে চাই না। আমরা এমন একটি অর্থনৈতিক কাঠামো চাই, যেখানে জনগণের জীবনমান উন্নয়নই হবে মূল লক্ষ্য।”