তৃণমূলের ভাঙনে বদলে যেতে পারে ভারতের রাজনৈতিক সমীকরণ

টিএমসি-র চিফ হুইপ কাকলী ঘোষ দস্তিদার

ভারতের জাতীয় রাজনীতিতে নতুন এক সমীকরণের ইঙ্গিত মিলছে। পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতাচ্যুত তৃণমূল কংগ্রেসের ভেতরে দেখা দিয়েছে বড় ধরনের ভাঙন। দলটির লোকসভার ২৮ জন সদস্যের মধ্যে প্রায় ২০ জন বিজেপি নেতৃত্বাধীন জাতীয় গণতান্ত্রিক জোট (এনডিএ)-কে সমর্থনের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে দাবি করেছেন বিদ্রোহী শিবিরের নেতারা। এ বিষয়ে তারা লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লাকে চিঠিও দিয়েছেন বলে জানা গেছে।

এই পদক্ষেপ বাস্তবায়িত হলে তা শুধু তৃণমূলের জন্য নয়, ভারতের জাতীয় রাজনীতির জন্যও বড় পরিবর্তনের সূচনা হতে পারে।

ভারতের সংবিধান অনুযায়ী দলত্যাগবিরোধী আইনে কোনো নির্বাচিত প্রতিনিধি দল পরিবর্তন করলে তার সদস্যপদ বাতিল হতে পারে। তবে একটি দলের দুই-তৃতীয়াংশ সদস্য একসঙ্গে দল ছাড়লে বা আলাদা গোষ্ঠী গঠন করলে সেই বিধান প্রযোজ্য হয় না।

লোকসভায় তৃণমূলের বর্তমান শক্তি বিবেচনায় দুই-তৃতীয়াংশ সীমা অতিক্রম করতে প্রয়োজন ছিল অন্তত ১৯ জন সদস্যের সমর্থন। বিদ্রোহী শিবিরের দাবি অনুযায়ী, সেই সংখ্যা ইতোমধ্যে ২০-এ পৌঁছেছে। ফলে তারা সাংবিধানিক সুরক্ষা পাওয়ার চেষ্টা করছে।

এর আগে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভাতেও তৃণমূলের বড় অংশ বিদ্রোহী অবস্থান নিয়েছে। দলটির ৮০ জন বিধায়কের মধ্যে ৫৮ জন আলাদা অবস্থান গ্রহণ করে বিরোধীদলীয় নেতা নির্বাচনে ভিন্ন সিদ্ধান্ত দেন। এ নিয়ে আইনি ও রাজনৈতিক লড়াই এখনও চলছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থার তদন্ত এবং সম্ভাব্য আইনি জটিলতা অনেক নেতার সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলছে। তৃণমূলের বেশ কয়েকজন নেতা ও জনপ্রতিনিধির বিরুদ্ধে অতীতে দুর্নীতি ও আর্থিক অনিয়ম সংক্রান্ত তদন্ত হয়েছে। ক্ষমতা হারানোর পর তাদের রাজনৈতিক নিরাপত্তা কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

বিদ্রোহী নেতারা অবশ্য প্রকাশ্যে বলছেন, পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে জনগণের রায় মেনে নিয়েই তারা নতুন রাজনৈতিক অবস্থান নিতে চাইছেন।

২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের পর বিজেপি এককভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারেনি। সরকার গঠনের জন্য তাদের জোটসঙ্গীদের ওপর নির্ভর করতে হয়েছে।

এ অবস্থায় তৃণমূলের বড় অংশ এনডিএর সঙ্গে যুক্ত হলে কেন্দ্রীয় সরকার আরও স্থিতিশীল হবে। জোটসঙ্গী দলগুলোর ওপর নির্ভরতা কমবে। একই সঙ্গে বিরোধী শিবিরের শক্তিও দুর্বল হবে।

রাজনৈতিক মহলে আলোচনা রয়েছে, ভবিষ্যতে আরও কিছু আঞ্চলিক দলের সংসদ সদস্যদের অবস্থানেও পরিবর্তন আসতে পারে। যদিও এসব বিষয়ে এখনও কোনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত হয়নি।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, বিজেপির দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্যগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘ওয়ান নেশন, ওয়ান ইলেকশন’ বাস্তবায়ন এবং জনসংখ্যাভিত্তিক নতুন আসন পুনর্বিন্যাস।

আসন পুনর্বিন্যাস কার্যকর হলে উত্তর ও মধ্য ভারতের জনবহুল রাজ্যগুলোতে লোকসভা আসন বাড়তে পারে। তুলনামূলকভাবে দক্ষিণ ভারতের কয়েকটি রাজ্যের প্রতিনিধিত্ব কমার আশঙ্কা রয়েছে। এ কারণে বিষয়টি ইতোমধ্যে জাতীয় বিতর্কে পরিণত হয়েছে।

তৃণমূলের ভাঙন যদি স্থায়ী রূপ নেয় এবং আরও আঞ্চলিক দলের ভেতরে একই ধরনের পরিবর্তন ঘটে, তাহলে ভারতের রাজনৈতিক মানচিত্রে বড় ধরনের পুনর্বিন্যাস দেখা যেতে পারে।

তবে বিরোধীরা সতর্ক করে বলছে, অতিরিক্ত ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ গণতান্ত্রিক ভারসাম্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। অন্যদিকে বিজেপি সমর্থকদের দাবি, শক্তিশালী কেন্দ্রীয় সরকার দীর্ঘমেয়াদি নীতি বাস্তবায়নে সহায়ক হবে।

ফলে তৃণমূলের বর্তমান সংকট কেবল একটি দলের অভ্যন্তরীণ সংকট নয়। এটি ভারতের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কাঠামো ও ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়েও নতুন প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *