জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি পদে বাংলাদেশের প্রার্থী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান নির্বাচিত হয়েছেন। মঙ্গলবার (২রা জুন) নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে তিনি ৯৯ ভোট পেয়ে বিজয়ী হন। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী সাইপ্রাসের প্রার্থী পান ৯১ ভোট।
জাতিসংঘের ১৯৩টি সদস্য রাষ্ট্রের ভোটে এই বিজয়কে বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে দেখা হচ্ছে। কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের গ্রহণযোগ্যতা, আস্থা এবং ক্রমবর্ধমান কূটনৈতিক প্রভাবের প্রতিফলন।
এই নির্বাচন শুধু একটি মর্যাদাপূর্ণ আন্তর্জাতিক পদে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করেনি; একই সঙ্গে বহুপাক্ষিক কূটনীতি, শান্তি, উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতায় বাংলাদেশের ভূমিকারও স্বীকৃতি দিয়েছে।
বাংলাদেশের এই সাফল্যের পেছনে তিনটি বিষয়কে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। এগুলো হলো রাজনৈতিক নেতৃত্বের সমর্থন, স্বল্প সময়ে পরিচালিত সমন্বিত কূটনৈতিক প্রচারণা এবং ড. খলিলুর রহমানের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও গ্রহণযোগ্যতা।
সরকারি সূত্রগুলোর মতে, বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের সময় এই নির্বাচনের জন্য হাতে ছিল মাত্র তিন মাস। এ সময়ের মধ্যেই বাংলাদেশ পূর্ণমাত্রার কূটনৈতিক প্রচারণা শুরু করে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাংলাদেশের প্রার্থিতা নিয়ে দৃঢ় অবস্থান নেন এবং ড. খলিলুর রহমানকে প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দেন।
বাংলাদেশ ২০২০ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে ইউএনজিএ সভাপতির পদে প্রার্থিতা ঘোষণা করেছিল। তবে ২০২৬ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি ড. খলিলুর রহমানকে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রার্থী করা হয়। এরপর বিভিন্ন দেশের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক, দ্বিপাক্ষিক যোগাযোগ এবং বহুপাক্ষিক ফোরামে সমর্থন আদায়ের কার্যক্রম জোরদার করা হয়।
কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, সাধারণত এ ধরনের নির্বাচনের জন্য কয়েক বছর ধরে প্রস্তুতি ও প্রচারণা চালানো হয়। সেই তুলনায় মাত্র তিন মাসে বাংলাদেশকে ব্যাপক কূটনৈতিক তৎপরতা পরিচালনা করতে হয়েছে।
অন্যদিকে সাইপ্রাস ২০১৬ সালেই তাদের প্রার্থিতা ঘোষণা করেছিল। দেশটি প্রায় এক দশক ধরে ধারাবাহিক প্রচারণা চালিয়েছে। ফলে নির্বাচনের লড়াইটি সহজ ছিল না।
বাংলাদেশের প্রচারণায় নেতৃত্ব দেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম এবং প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির। নিউইয়র্কে বাংলাদেশের স্থায়ী মিশন এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অবস্থিত বাংলাদেশি কূটনৈতিক মিশনগুলোও সক্রিয় ভূমিকা পালন করে।
প্রচারণার একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ছিল ১৩ই মে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত ইন্টারঅ্যাকটিভ ডায়ালগ। সেখানে ড. খলিলুর রহমান তাঁর ভিশন স্টেটমেন্ট তুলে ধরেন। তিনি নির্বাচিত হলে সাধারণ পরিষদের অগ্রাধিকার ও কর্মপরিকল্পনার বিষয়েও বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেন। কূটনৈতিক মহলে তাঁর উপস্থাপনা ইতিবাচক সাড়া ফেলে।
বাংলাদেশের প্রচারণার মূল বিষয়গুলোর মধ্যে ছিল কার্যকর বহুপাক্ষিকতা, জাতিসংঘ সংস্কার, উন্নয়নশীল দেশের স্বার্থ সংরক্ষণ, জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ রাষ্ট্রগুলোর জন্য সহযোগিতা বৃদ্ধি, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন, শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে অবদান এবং বৈশ্বিক দক্ষিণের কণ্ঠস্বরকে আরও শক্তিশালী করা।
বর্তমান বিশ্বে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার নানা চ্যালেঞ্জের মধ্যে বাংলাদেশ সংলাপ, ঐকমত্য এবং সহযোগিতাভিত্তিক কূটনীতির ওপর গুরুত্বারোপ করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই অবস্থানও আন্তর্জাতিক সমর্থন অর্জনে সহায়ক ভূমিকা রেখেছে।
নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর বাংলাদেশ সরকার জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্রগুলোর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে। একই সঙ্গে জাতিসংঘ সনদের মূলনীতি ও উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে বাংলাদেশের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে।
ড. খলিলুর রহমানের এই বিজয়কে বাংলাদেশের কূটনৈতিক ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায় হিসেবে দেখা হচ্ছে। এটি আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলাদেশের অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করবে বলে আশা করা হচ্ছে।