ঢাকার ব্যস্ত নগরজীবন থেকে কিছুটা স্বস্তি খুঁজতে অনেকেই ছুটে যান দূরের কোনো পর্যটনকেন্দ্রে। তবে রাজধানী থেকে মাত্র ৩০ থেকে ৪০ মিনিটের পথ পাড়ি দিলেই মিলতে পারে নদীর পাড়, বিস্তীর্ণ ধানক্ষেত, খোলা আকাশ আর গ্রামীণ প্রকৃতির শান্ত পরিবেশ। এমনই এক সম্ভাবনাময় গন্তব্য কেরানীগঞ্জের কলাতিয়া, হযরতপুর ও ঢালিকান্দি এলাকা।
স্থানীয়দের পাশাপাশি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে ভ্রমণপ্রেমীরা ছুটে আসছেন এই অঞ্চলে। সহজ যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং প্রকৃতির কাছাকাছি সময় কাটানোর সুযোগই তাদের আকর্ষণের প্রধান কারণ।
কলাতিয়া বাজার থেকে মাত্র ২০ টাকা অটোভাড়ায় পৌঁছানো যায় ঢালিকান্দিতে। এখানেই কালীগঙ্গা নদী এসে মিলেছে ধলেশ্বরীর সঙ্গে। দুই নদীর মিলনস্থলের পাশ দিয়ে প্রায় ৬০০ থেকে ৭০০ মিটার দীর্ঘ একটি রাস্তা চলে গেছে নদীর পাড় ঘেঁষে। স্থানীয়দের মতে, ঢাকার এত কাছাকাছি এমন মনোরম নদীতীর খুব কমই দেখা যায়।
কয়েক বছর আগেও এলাকাটি বাইরের মানুষের কাছে প্রায় অজানা ছিল। নদীর পাড়ে যাদের দেখা যেত, তাদের বেশিরভাগই ছিলেন স্থানীয় বাসিন্দা। কিন্তু বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন ভিডিও ও ছবির মাধ্যমে জায়গাটির পরিচিতি বাড়ছে। ফলে দর্শনার্থীর সংখ্যাও বেড়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে।
নদীর ধারে বাঁশের তৈরি কয়েকটি মাচা রয়েছে, যেখানে বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়ে দেন অনেকেই। দর্শনার্থীদের সুবিধার জন্য গড়ে উঠেছে ছোট ছোট খাবারের দোকানও। সেখানে চায়ের সঙ্গে পোড়া রুটি, স্ট্রিট ফুড ধাঁচের বার্গার ও স্যান্ডউইচ পাওয়া যায়। শুক্রবার বিকেলে স্থানীয় এক বিক্রেতার পেঁয়াজুর দোকানেও ভিড় দেখা যায়। এছাড়া ছোট ডিঙ্গি নৌকায় ধলেশ্বরী নদীতে ঘুরে দেখার ব্যবস্থাও রয়েছে।
প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য আরও একটি আকর্ষণ হলো মিঠা পানির ডলফিন বা শুশুক। স্থানীয়দের দাবি, বর্ষাকালে ধলেশ্বরী নদীতে প্রায়ই শুশুকের দেখা মেলে।
পূর্ণিমার রাত উপভোগের জন্য হযরতপুর এলাকার সুনাম রয়েছে। বিশেষ করে মারকাযুদ দাওয়াহর আশপাশের বিস্তীর্ণ মাঠ ও ধানক্ষেত চাঁদের আলোয় ভিন্ন এক সৌন্দর্য ধারণ করে। ধানক্ষেতের পাশে তালগাছের নিচে নির্মিত বড় মাচায় বসে উপভোগ করা যায় গ্রামীণ রাতের নীরবতা। মাটির রাস্তা ধরে দীর্ঘক্ষণ হাঁটার সুযোগও রয়েছে।
শীতকালে এই অঞ্চলের পরিবেশ আরও আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। বাতাসে ভেসে আসে ধনেপাতার গন্ধ, আর ছোট ছোট খাল ও কালভার্টের পাশে বসে কাটানো যায় নিরিবিলি সময়।
এলাকার দর্শনীয় স্থানের তালিকা শুধু ঢালিকান্দি বা হযরতপুরেই সীমাবদ্ধ নয়। ঢালিকান্দি থেকে নদী পেরিয়ে যাওয়া যায় পাড়াগ্রাম বাজারে। এই বাজারের একাংশ ঢাকার নবাবগঞ্জ উপজেলায়, অন্য অংশ মানিকগঞ্জ জেলার সিংগাইর উপজেলায় অবস্থিত। কাছেই রয়েছে সুলতানপুর, যেখানে বিস্তীর্ণ ধানক্ষেতের মনোমুগ্ধকর দৃশ্য প্রকৃতিপ্রেমীদের আকৃষ্ট করে।
কলাতিয়ার আশপাশে সিরাজনগর ও খাড়াকান্দিও দর্শনার্থীদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। খাড়াকান্দি থেকে ধলেশ্বরী নদীর অপূর্ব দৃশ্য দেখা যায়। নদীর পাড়ে বসার ব্যবস্থাও রয়েছে। সেখান থেকে নদী পার হয়ে মধুরচর ঘুরে আবার ঢালিকান্দিতে ফিরে আসা যায়। পুরো পথজুড়েই রয়েছে চরের স্বতন্ত্র আবহ ও গ্রামীণ সৌন্দর্য।
রাজধানীর কোলাহল থেকে সাময়িক মুক্তি খুঁজছেন যারা, তাদের জন্য কেরানীগঞ্জের এই অঞ্চল হতে পারে সহজ ও স্বল্প ব্যয়ের একটি ভ্রমণ গন্তব্য। দূরে না গিয়েও এখানে পাওয়া যায় নদীর শান্ত জলরাশি, সবুজ মাঠ, খোলা আকাশ এবং কিছুটা নির্মল নিঃশ্বাসের সুযোগ।