মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ী বসবাসের অনুমতি বা গ্রিন কার্ড পাওয়ার প্রক্রিয়ায় বড় পরিবর্তন এনেছে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন। নতুন নির্দেশনায় অনেক অস্থায়ী ভিসাধারীকে যুক্তরাষ্ট্র ছেড়ে নিজ দেশে ফিরে গ্রিন কার্ডের আবেদন করতে হবে। ফলে বিদেশি শিক্ষার্থী, দক্ষ কর্মী এবং বিভিন্ন অস্থায়ী ভিসাধারীদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সিদ্ধান্ত আইনি অভিবাসনের পথকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। এতে চাকরি, শিক্ষা এবং পারিবারিক জীবনে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি হবে।
২৩শে মে মার্কিন নাগরিকত্ব ও অভিবাসন সেবা সংস্থা একটি নতুন মেমো প্রকাশ করে। সেখানে বলা হয়, অস্থায়ী ভিসায় যুক্তরাষ্ট্রে থাকা ব্যক্তিরা সাধারণভাবে দেশটির ভেতর থেকে গ্রিন কার্ডের জন্য আবেদন করতে পারবেন না। তাদের নিজ দেশে ফিরে মার্কিন দূতাবাস বা কনস্যুলেটের মাধ্যমে আবেদন করতে হবে।
শুধু “বিশেষ পরিস্থিতি” থাকলে ব্যতিক্রম বিবেচনা করা হবে। তবে সেই ধরনের পরিস্থিতির স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি।
মার্কিন নাগরিকত্ব ও অভিবাসন সেবা সংস্থার দাবি, এই পদক্ষেপ অভিবাসন ব্যবস্থাকে আরও নিয়মতান্ত্রিক করবে। একই সঙ্গে ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রে থেকে যাওয়ার প্রবণতাও কমাবে।
নতুন নীতির প্রভাব পড়বে লাখো অস্থায়ী ভিসাধারীর ওপর।
এর মধ্যে রয়েছেন—
- H-1B ভিসায় কর্মরত দক্ষ পেশাজীবী
- F-1 ভিসাধারী আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী
- B-1 ও B-2 ভিসাধারী ব্যবসায়িক ও পর্যটক ভ্রমণকারী
- L-1 ভিসায় কর্মরত বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা ও কর্মী
এ ছাড়া যাদের ভিসার মেয়াদ শেষ হয়েছে বা যারা মানবিক কারণে অস্থায়ী অনুমতি পেয়েছেন, তারাও এই নীতির আওতায় পড়তে পারেন। তবে পরিবারভিত্তিক গ্রিন কার্ড আবেদনকারীদের বেশিরভাগই এই পরিবর্তনের বাইরে থাকবেন বলে জানা গেছে।
অভিবাসন আইনজীবীরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে আবেদন করার সুযোগ সীমিত হলে আবেদনকারীদের জন্য নতুন ঝুঁকি তৈরি হবে।
সাবেক হোমল্যান্ড সিকিউরিটি কর্মকর্তা অ্যাডাম ক্লেইনের মতে, বিদেশে গিয়ে আবেদন করতে বাধ্য করা হলে প্রক্রিয়ার সময় আরও বাড়বে। অনেকের চাকরি ঝুঁকিতে পড়বে। পরিবারের সদস্যদের দীর্ঘ সময় আলাদা থাকতে হতে পারে।
অভিবাসন আইন সংস্থা সিসকিন্ড সাসারের অংশীদার এলিসা তৌব বলেন, বহু বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন আইন নির্দিষ্ট শর্ত পূরণকারী আবেদনকারীদের দেশটির ভেতর থেকেই গ্রিন কার্ডের আবেদন করার সুযোগ দিয়েছে। নতুন অবস্থান সেই দীর্ঘদিনের প্রক্রিয়াকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি বছর প্রায় ১০ লাখের বেশি মানুষ গ্রিন কার্ড পান। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই সংখ্যা আরও বেড়েছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ অর্থবছরে প্রায় ১৩ লাখ ৬০ হাজার গ্রিন কার্ড ইস্যু করা হয়েছে। এটি আগের বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি।
গ্রিন কার্ডপ্রাপ্তদের বড় অংশ পরিবারভিত্তিক ক্যাটাগরির। কর্মভিত্তিক গ্রিন কার্ডের হার তুলনামূলকভাবে অনেক কম।
২০২৩ অর্থবছরে গ্রিন কার্ড পাওয়া শীর্ষ দেশগুলোর মধ্যে ছিল মেক্সিকো, কিউবা, ভারত, ডোমিনিকান রিপাবলিক ও চীন।
বিশেষ করে ভারত ও চীনের কর্মভিত্তিক আবেদনকারীরা দীর্ঘ ব্যাকলগের কারণে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তির শিকার। অনেক ক্ষেত্রে অপেক্ষার সময় কয়েক দশক পর্যন্ত পৌঁছেছে।
নতুন নীতির পাশাপাশি মার্কিন নাগরিকত্ব ও অভিবাসন সেবা সংস্থা-এর কাজের গতি কমে যাওয়াও উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
গবেষণা প্রতিষ্ঠান নিসকানেন সেন্টারের বিশ্লেষণ বলছে, ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে সংস্থাটি শরণার্থী গ্রিন কার্ডের মাত্র ৫৬টি আবেদন সম্পন্ন করেছে। আগের এক বছরে মাসিক গড় ছিল প্রায় ২ হাজার ৮৭৮টি। একই সময়ে সব ধরনের আবেদন নিষ্পত্তির হারও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ২০২৫ অর্থবছরের শেষে মার্কিন নাগরিকত্ব ও অভিবাসন সেবা সংস্থা-এর কাছে ১১.৬৫ মিলিয়নের বেশি মামলা অনিষ্পন্ন অবস্থায় ছিল। এটি আগের বছরের তুলনায় ২৩ শতাংশ বেশি।
যুক্তরাষ্ট্রের বৈচিত্র্য ভিসা বা ডিভি লটারি কর্মসূচিও বর্তমানে অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে একটি আলোচিত হত্যাকাণ্ডের পর নতুন ডিভি ভিসা কার্যক্রম স্থগিত করা হয়। প্রতি বছর এই কর্মসূচির মাধ্যমে ৫৫ হাজার মানুষ গ্রিন কার্ড পাওয়ার সুযোগ পেতেন। এ কারণে অনেক সম্ভাব্য আবেদনকারী এখন বিকল্প পথ খুঁজছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, নতুন মেমো অভিবাসন আইন পরিবর্তন না করলেও প্রশাসনের হাতে অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা দিয়েছে। ফলে যোগ্য আবেদনকারীদের ক্ষেত্রেও অনিশ্চয়তা বাড়তে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি, স্বাস্থ্যসেবা এবং গবেষণা খাত দীর্ঘদিন ধরে বিদেশি দক্ষ কর্মীদের ওপর নির্ভরশীল। নতুন নীতির ফলে এসব খাতে জনবল সংকটের আশঙ্কাও দেখা দিতে পারে।
অভিবাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সিদ্ধান্তের প্রকৃত প্রভাব আগামী কয়েক বছরে আরও স্পষ্ট হবে। তবে আপাতত হাজারো শিক্ষার্থী, কর্মী এবং তাদের পরিবারের ভবিষ্যৎ নতুন করে প্রশ্নের মুখে পড়েছে।