প্রযুক্তির সবচেয়ে বড় ভোক্তারাই কেন এখন ক্ষুব্ধ
এসময় তরুণ প্রজন্মকে বলা হয় ‘ডিজিটাল নেটিভ’—যারা প্রযুক্তির ভেতরেই বড় হয়েছে, যাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ স্মার্টফোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অনলাইন দুনিয়া। কিন্তু এখন সেই প্রজন্মের বড় একটি অংশই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) নিয়ে উদ্বেগ, ক্ষোভ ও প্রতিবাদে মুখর হয়ে উঠছে।
এআইকে ঘিরে বিশ্বজুড়ে যখন বিপুল উচ্ছ্বাস, তখন তরুণদের একাংশের প্রতিক্রিয়া যেন উল্টো স্রোত। প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর ভাষায় এটি ভবিষ্যতের বিপ্লব; কিন্তু অনেক তরুণের কাছে এটি অনিশ্চয়তা, চাকরি হারানোর ভয় এবং নিজের সৃজনশীল পরিচয় হারিয়ে ফেলার আশঙ্কার প্রতীক।
গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে এআই নিয়ে বক্তাদের বক্তব্য ঘিরে অস্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া দেখা যায়।
অ্যারিজোনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে সাবেক গুগল প্রধান নির্বাহী এরিক স্মিড বলেন, “এআইয়ের প্রভাব আগের সবকিছুর চেয়ে বড়, দ্রুত এবং সুদূরপ্রসারী হবে। এটি প্রতিটি পেশা, প্রতিটি শ্রেণিকক্ষ, প্রতিটি হাসপাতাল এবং প্রতিটি সম্পর্ককে স্পর্শ করবে।”
কিন্তু তাঁর বক্তব্যের মাঝেই গ্যালারি থেকে ভেসে আসে তীব্র ‘বু’ ধ্বনি।
এর কয়েক দিন আগে ফ্লোরিডার সেন্ট্রাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনেও একই ধরনের ঘটনা ঘটে। রিয়েল এস্টেট উদ্যোক্তা গ্লোরিয়া কলফিল্ড যখন বলেন, “এআইয়ের উত্থানই পরবর্তী শিল্পবিপ্লব,” তখন শিক্ষার্থীদের একাংশ তাঁকে বাধা দিয়ে বিক্ষোভ প্রকাশ করেন। বিস্মিত কলফিল্ড মঞ্চ থেকেই প্রশ্ন করেন, “কি হলো? আমি কি কোনো স্পর্শকাতর বিষয়ে কথা বলে ফেললাম?”
তরুণদের এই মনোভাবের প্রতিফলন দেখা গেছে সাম্প্রতিক জরিপেও।
২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে পরিচালিত গ্যালাপের এক সমীক্ষা বলছে, জেনারেশন জেড—অর্থাৎ ১৯৯৭ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে জন্ম নেওয়া তরুণদের মধ্যে এআই নিয়ে আশাবাদীদের সংখ্যা গত এক বছরে ১৪ শতাংশ পয়েন্ট কমে ২২ শতাংশে নেমে এসেছে।
অন্যদিকে, এআই নিয়ে ক্ষুব্ধ তরুণের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩১ শতাংশে। উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ৪২ শতাংশ উত্তরদাতা। প্রায় অর্ধেক তরুণ মনে করেন, এআইয়ের ঝুঁকি এর সম্ভাব্য সুবিধার চেয়ে বেশি।
বিশ্লেষকদের পর্যবেক্ষণ, সাধারণভাবে এআই ব্যবহারের অভিজ্ঞতা বাড়লে ইতিবাচক মনোভাবও বাড়ে। কিন্তু তরুণদের ক্ষেত্রে সেই চিত্র ভিন্ন। তারা এআই ব্যবহার করছে, কিন্তু একই সঙ্গে এর বিরুদ্ধেও অবস্থান নিচ্ছে। কারণ, তাদের ধারণা—এআই গভীর শেখার প্রক্রিয়া ও সৃজনশীল বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করছে।
তরুণদের উদ্বেগের পেছনে বাস্তব কারণও রয়েছে।
স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড সম্প্রতি ঘোষণা দিয়েছে, তারা সাত হাজারের বেশি চাকরি কমিয়ে এআইনির্ভর ব্যবস্থা বাড়াবে। মেটা কর্মীদের কম্পিউটারে ট্র্যাকিং সফটওয়্যার ব্যবহার করে এআই মডেল প্রশিক্ষণ দিচ্ছে এবং এ মাস থেকে বিশ্বজুড়ে ১০ শতাংশ কর্মী ছাঁটাইয়ের পরিকল্পনা করেছে।
অন্যদিকে অ্যামাজন সম্প্রতি ৩০ হাজার করপোরেট চাকরি কমিয়েছে। ফিনটেক প্রতিষ্ঠান ব্লকও ফেব্রুয়ারিতে প্রায় অর্ধেক কর্মী ছাঁটাই করেছে।
এরিক স্মিড নিজেও শিক্ষার্থীদের চাকরি হারানোর ভয়কে “যুক্তিসংগত” বলে স্বীকার করেছেন। তবে তাঁর মতো অনেক করপোরেট নেতার বক্তব্য, এই পরিবর্তন অনিবার্য এবং নতুন বাস্তবতার সঙ্গে সবাইকে খাপ খাইয়ে নিতে হবে।
কিন্তু তরুণদের প্রশ্ন ভিন্ন—কেন তাদের ভবিষ্যৎ এমন এক পরিবর্তনের কাছে উৎসর্গ করতে হবে, যেটিকে করপোরেট বিশ্ব ‘অনিবার্য’ বলে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে?
এআই নিয়ে উদ্বেগ শুধু চাকরির বাজারে সীমাবদ্ধ নয়। অনেক তরুণ মনে করছেন, এটি তাদের শিক্ষা ও ব্যক্তিগত দক্ষতার ধারণাকেও বদলে দিচ্ছে।
সেন্ট্রাল ফ্লোরিডা বিশ্ববিদ্যালয়ে “আর্ট অব এআই” নামে একটি কোর্স ঘিরে বিতর্ক তৈরি হয়। এক শিক্ষার্থী প্রশ্ন তোলেন, “আমি টিউশন ফি দিয়ে দক্ষতা শিখতে এসেছি, এআই ব্যবহার করতে নয়। যদি এআই-ই আমার কাজ করে দেয়, তাহলে আমি কী শিখব?”
একই ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা যায় মিডল টেনেসি স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনেও। মিউজিক ইন্ডাস্ট্রির নির্বাহী স্কট বোরচেট্টা শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বলেন, “তোমরা প্রথম বর্ষে যা শিখেছ, তার অনেক কিছুই ইতিমধ্যে অপ্রচলিত হয়ে গেছে।” তাঁর এই বক্তব্যের পরও সমাবর্তনে বিক্ষোভধ্বনি শোনা যায়।
এআইবিরোধী এই মনোভাব এখন শুধু যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে সীমাবদ্ধ নয়।
চীনের আদালত, দক্ষিণ কোরিয়ার গাড়ি শিল্পের ট্রেড ইউনিয়ন, হলিউডের চিত্রনাট্যকার থেকে শুরু করে ভারতের চলচ্চিত্র শিল্প—বিভিন্ন ক্ষেত্রেই এআই নিয়ে উদ্বেগ ও প্রতিবাদ বাড়ছে।
তবে তরুণদের প্রতিক্রিয়াকে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হচ্ছে। কারণ, প্রযুক্তির সবচেয়ে বড় সমর্থক ও ভোক্তা হিসেবেই এতদিন তাদের দেখা হতো। এখন তারাই প্রযুক্তিনির্ভর ভবিষ্যতের বিরুদ্ধে প্রশ্ন তুলছে।
অ্যারিজোনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে এরিক স্মিড বলেছিলেন, “প্রশ্ন এই নয় যে এআই বিশ্বকে বদলে দেবে কি না—এটি বদলাবেই। প্রশ্ন হলো, আপনি কি এআইকে বদলে দিতে সাহায্য করবেন?”
কিন্তু তরুণদের প্রতিক্রিয়া ইঙ্গিত দিচ্ছে অন্য এক বাস্তবতার দিকে। তারা হয়তো প্রযুক্তির বিরোধিতা করছে না; বরং এমন একটি ভবিষ্যতের বিরোধিতা করছে, যেখানে মানুষের সৃজনশীলতা, দক্ষতা ও কর্মজীবনের নিয়ন্ত্রণ করপোরেট স্বার্থের হাতে চলে যেতে পারে।
বিশ্বজুড়ে যখন এআই খাতে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ হচ্ছে, তখন তরুণদের এই ‘বু’ ধ্বনি হয়তো কেবল ক্ষণিকের আবেগ নয়। এটি এমন এক প্রজন্মের ঘোষণা, যারা নিজেদের ভবিষ্যৎ নিজেরাই নির্ধারণ করতে চায়।