পুরনো লিথিয়াম ব্যাটারির আগ্রাসনে পরিবেশ বিপর্যয়ের শঙ্কা

মারুফ আহমেদ

বাংলাদেশে দ্রুত বাড়ছে লিথিয়াম ব্যাটারির ব্যবহার। স্মার্টফোন, ল্যাপটপ, ইজিবাইক, সৌরবিদ্যুৎ, আইপিএস, বৈদ্যুতিক যানবাহন থেকে শুরু করে নানা ধরনের বৈদ্যুতিক যন্ত্রে এখন লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারির চাহিদা ব্যাপক। কিন্তু এই সম্ভাবনাময় বাজারের আড়ালেই তৈরি হচ্ছে বড় ধরনের পরিবেশ ও জননিরাপত্তা ঝুঁকি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ব্যবহৃত ও লাইফসাইকেল শেষ হওয়া পুরনো লিথিয়াম ব্যাটারি বাংলাদেশে ঢুকে পড়ছে ভয়ংকর ই-বর্জ্য হিসেবে।

সরেজমিনে দেশের বিভিন্ন ব্যাটারি মার্কেটে দেখা গেছে, চীন থেকে আসা পুরনো লিথিয়াম ব্যাটারির সেল খুলে নতুন কেসিংয়ে জুড়ে “নতুন ব্যাটারি” হিসেবে বিক্রি করা হচ্ছে। এসব ব্যাটারির দাম তুলনামূলক কম হওয়ায় সাধারণ ক্রেতারা সহজেই আকৃষ্ট হচ্ছেন। কিন্তু কয়েক বছরের মধ্যেই এসব ব্যাটারি কার্যক্ষমতা হারিয়ে বিপজ্জনক ই-বর্জ্যে পরিণত হচ্ছে।

পরিবেশবিদদের মতে, এটি শুধু অর্থনৈতিক প্রতারণা নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদে দেশের জন্য ভয়াবহ পরিবেশগত হুমকি।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উন্নত দেশগুলো বিশেষ করে চীন তাদের পুরনো ও ঝুঁকিপূর্ণ লিথিয়াম ব্যাটারি সরিয়ে দিতে আন্তর্জাতিক বাজার ব্যবহার করছে। কারণ এসব ব্যাটারি ধ্বংস ও পুনঃপ্রক্রিয়াজাত করতে বিপুল খরচ হয়। চীনে প্রতি কেজি পুরনো লিথিয়াম ব্যাটারি ধ্বংসে ২ থেকে ৩ ডলার পর্যন্ত ব্যয় হয়। অথচ সেই ই-বর্জ্যই বাংলাদেশে অর্থের বিনিময়ে আমদানি করা হচ্ছে।

ব্যাটারি খাতের সংশ্লিষ্টরা জানান, একটি মানসম্মত লিথিয়াম ব্যাটারি, বিশেষ করে এলটিও  প্রযুক্তির ব্যাটারি, ২৫ থেকে ৮০ বছর পর্যন্ত দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর থাকতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশে বাজারে থাকা অনেক ব্যাটারি মাত্র ৩ থেকে ৪ বছরের মধ্যেই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এর প্রধান কারণ হিসেবে উঠে এসেছে পুরনো ও ব্যবহৃত সেল পুনরায় ব্যবহার করার বিষয়টি।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, পুরনো লিথিয়াম ব্যাটারির সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হচ্ছে অতিরিক্ত তাপ সৃষ্টি, ফুলে যাওয়া, শর্ট সার্কিট এবং অগ্নিকাণ্ড। লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারিতে থাকা কোবাল্ট, গ্রাফাইট ও লিথিয়ামের মতো উপাদান অত্যন্ত সংবেদনশীল। ভুলভাবে সংরক্ষণ বা ফেলে দিলে এগুলো বিস্ফোরণ ও আগুনের কারণ হতে পারে।

বিশেষ করে নগর বর্জ্যের সঙ্গে এসব ব্যাটারি মিশে গেলে ঝুঁকি আরও বাড়ে। পুরনো ব্যাটারি আবর্জনার স্তূপে চূর্ণবিচূর্ণ হলে ভেতরের রাসায়নিক উপাদান সহজেই আগুন ধরাতে পারে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কেন্দ্র ও রিসাইক্লিং প্লান্টে অগ্নিকাণ্ডের পেছনে লিথিয়াম ব্যাটারিকে বড় কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

এদিকে আন্তর্জাতিক বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান রিসার্চ এন্ড মার্কেটস–এর তথ্যমতে, বাংলাদেশে ২০২৫ সালে লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারির বাজার মূল্য প্রায় ২৯৭ দশমিক ৮৮ মিলিয়ন ডলার। ২০৩০ সালের মধ্যে তা ৪৩৫ মিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও বৈদ্যুতিক যানবাহনের প্রসারের কারণে এই বাজার আরও বড় হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

কিন্তু সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাজার বাড়লেও নিরাপত্তা ও পরিবেশ সুরক্ষায় কার্যকর নীতিমালা এখনও দুর্বল। দেশে পুরনো লিথিয়াম ব্যাটারি আমদানি, সংরক্ষণ, বিক্রি ও পুনর্ব্যবহার নিয়ে কঠোর নজরদারি নেই। ফলে অসাধু ব্যবসায়ীরা সহজেই ব্যবহৃত সেল বাজারে ছাড়তে পারছেন।

পরিবেশ ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা এখনই সরকারি উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তাদের মতে, পুরনো লিথিয়াম ব্যাটারি আমদানিতে কঠোর নিয়ন্ত্রণ, নিরাপদ রিসাইক্লিং নীতিমালা এবং বিকল্প প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ জরুরি। বিশেষ করে সলিড-স্টেট ব্যাটারি ও সোডিয়াম-আয়ন ব্যাটারির মতো তুলনামূলক নিরাপদ প্রযুক্তিতে গবেষণা ও শিল্প সহায়তা বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন তারা।

বিশেষজ্ঞদের ভাষায়, “আজ যে ব্যাটারি সস্তা মনে হচ্ছে, কয়েক বছর পর সেটিই পরিবেশ ও জননিরাপত্তার জন্য বড় বিপদ হয়ে উঠতে পারে।”

বাংলাদেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও বৈদ্যুতিক প্রযুক্তির প্রসার যত বাড়ছে, ততই বাড়ছে নিরাপদ ব্যাটারি ব্যবস্থাপনার প্রয়োজনীয়তা। এখনই কার্যকর নীতিমালা না হলে ভবিষ্যতে লিথিয়াম ই-বর্জ্য দেশের জন্য নতুন পরিবেশ সংকটে পরিণত হতে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *