এসআইআর প্রক্রিয়ার পর পশ্চিমবঙ্গে পাল্টে গেল বহু আসনের সমীকরণ

২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন ঘিরে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়া নিয়ে। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম Scroll.in-এর এক তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণে দাবি করা হয়েছে, বিজেপি যে ২০৭টি আসনে জয় পেয়েছে, তার প্রায় অর্ধেক আসনে জয়ের ব্যবধানের চেয়ে বেশি সংখ্যক ভোটারকে এসআইআর প্রক্রিয়ায় ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছিল।

বিশ্লেষণে বলা হয়, এমন আসনের সংখ্যা ছিল ১০৫টি। এর মধ্যে ৮৬টি আসনে এর আগে কখনও বিজেপি জিততে পারেনি। ফলে নির্বাচনের ফলাফল ও ভোটার তালিকা সংশোধনের মধ্যে সম্পর্ক নিয়ে রাজনৈতিক ও গবেষণা মহলে নতুন প্রশ্ন উঠেছে।

পশ্চিমবঙ্গে এসআইআর কার্যক্রম চলে প্রায় ছয় মাস। এই সময়ের মধ্যে মোট প্রায় ৯১ লাখ ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ পড়ে। এতে রাজ্যের মোট ভোটার তালিকা প্রায় ১২ শতাংশ কমে যায়।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, বাদ পড়া ভোটারদের অন্তত ২৭ লাখের আবেদন এখনও বিচারাধীন। এসব মামলা বিশেষ ট্রাইব্যুনালে রয়েছে। বিজেপি ছিল একমাত্র বড় রাজনৈতিক দল, যারা শুরু থেকেই এই প্রক্রিয়ার পক্ষে অবস্থান নেয়।

বিরোধী দলগুলো অভিযোগ তোলে, এই সংশোধনী প্রক্রিয়া ছিল রাজনৈতিকভাবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। তবে নির্বাচন কমিশন দাবি করে, ভুয়া ও অকার্যকর ভোটার শনাক্ত করতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।

দক্ষিণ কলকাতার যাদবপুর আসন দীর্ঘদিন বামেদের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত ছিল। পরে সেখানে তৃণমূলের শক্ত অবস্থান গড়ে ওঠে। কিন্তু এবার সেই আসনেও বড় পরিবর্তন দেখা যায়।

এসআইআর প্রক্রিয়ায় যাদবপুরে ৫৬ হাজারের বেশি ভোটারের নাম বাদ পড়ে। এরপর বিজেপি প্রথমবারের মতো আসনটি জিতে নেয়। জয়ের ব্যবধান ছিল ২৭ হাজার ৭১৬ ভোট।

উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, ২০২১ সালের নির্বাচনে বিজেপি এখানে তৃতীয় স্থানে ছিল।

তৃণমূল নেত্রী মমতা ব্যানার্জীর ভবানীপুর আসনেও একই ধরনের চিত্র দেখা গেছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেখানে ৫১ হাজারের বেশি ভোটার বাদ পড়ার পর তিনি বিজেপি নেতা সুভেন্দু অধিকারীর কাছে ১৫ হাজার ১০৫ ভোটে হেরে যান।

একইভাবে তোলিগঞ্জে তৃণমূল নেতা অরুপ বিশ্বাস ২০ বছরের মধ্যে প্রথমবার পরাজিত হন। সেখানে তার হারার ব্যবধান ছিল ৬ হাজার ১৩ ভোট। অথচ এসআইআর প্রক্রিয়ায় বাদ পড়া ভোটারের সংখ্যা ছিল প্রায় ৩৭ হাজার ৮৮৯।

এ ছাড়া শশী পাঞ্জা, সিদ্দিকুল্লাহ চৌধুরী, মলয় ঘটক ও স্নেহাশীস চক্রবর্তীর আসনেও একই ধরনের প্রবণতা দেখা গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

বিশ্লেষণটি তৈরি করা হয়েছে ভারতের নির্বাচন কমিশনের ফলাফল এবং কলকাতাভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান সাবার ইনস্টিটিউট-এর তথ্যের ভিত্তিতে।

তবে প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, এটি সরাসরি ভোট কারচুপির প্রমাণ নয়। কারণ বাদ পড়া ভোটারদের রাজনৈতিক পরিচয় বা দলীয় সমর্থনের নির্দিষ্ট তথ্য প্রকাশ হয়নি।

তারপরও যে ১২৯টি আসন তৃণমূল থেকে বিজেপির দখলে গেছে, তার মধ্যে ৮৬টিতে একই ধরণের প্যাটার্ন পাওয়া যাওয়ায় বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে পর্যালোচনার দাবি রাখে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, ভোটার তালিকা সংশোধন গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার অংশ হলেও, সেই প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠলে নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতাও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *