ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধে কতদূর টিকবে সৌদির ‘হেজিং’ কৌশল?

মধ্যপ্রাচ্যে ইরান, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার ছয় সপ্তাহের যুদ্ধে এক অন্যরকম ভূমিকায় দেখা গেছে সৌদি আরবকে। যুদ্ধ শুরুর পরপরই পারস্য উপসাগরে ছড়িয়ে পড়ে ইরানের প্রতিশোধমূলক হামলা। হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেয় তেহরান, যা দশকের পর দশক ধরে চলা একটি নিরাপত্তা কাঠামোকে শেষ করে দেয়। এরপরও সৌদি আরব সরাসরি কোন সামরিক পদক্ষেপ নেয়নি। মার্কিন বাহিনীকে ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি দিলেও, ইরানের হামলার জবাবে নীরব থেকেছে রিয়াদ।

ফরেন অ্যাফেয়ার্সে প্রকাশিত এক বিশ্লেষণী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সৌদি আরবের এই সংযম আসলে দীর্ঘদিনের ‘হেজিং’ বা দ্বিমুখী কৌশলেরই বর্ধিত রূপ।

সৌদি আরব একদিকে শক্তিশালী ইরানকে ভয় পায়, অন্যদিকে ইসরায়েলের আঞ্চলিক আধিপত্যকেও মেনে নিতে চায় না। তেহরান ও তেল আবিব—কোনো একটি যেন অঞ্চলের একচ্ছত্র শক্তি না হয়, সেটাই রিয়াদের মূল লক্ষ্য।

২০১৬ সালে দূতাবাসে হামলার পর ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন হয় সৌদি আরবের। ২০২৩ সালে চীনের মধ্যস্থতায় দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিক হয়। কিন্তু বর্তমান যুদ্ধ সেই সম্পর্ককে আবার হোঁচট খাওয়ায়। তবু দুই রাজধানীই চায় না সম্পর্ক পুরোপুরি ভেঙে পড়ুক।

২০১৯ সালে ইয়েমেনের হুতিদের সৌদির তেল স্থাপনায় হামলার ঘটনা রিয়াদের জন্য এক বড় ধাক্কা ছিল। দেশটির অর্ধেক তেল উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া ছিল নমনীয়। এই অভিজ্ঞতা থেকে সৌদি নেতৃত্ব বুঝতে পারে, মার্কিন নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতির ওপর পুরোপুরি নির্ভর করা যাবে না।

এরপর সৌদি আরব নিজেই ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনে বিনিয়োগ করে, পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের হুমকি দেয় এবং বেইজিংয়ের দিকে ঝুঁকে পড়ে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তি ও ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের চেষ্টাও চালায়।

কিন্তু ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের ইসরায়েলে হামলা এবং এর পরবর্তী গাজা যুদ্ধ সব সমীকরণ বদলে দেয়। যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েল-সৌদি সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণকে প্রতিরক্ষা চুক্তির পূর্বশর্ত হিসেবে দেখলেও, গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান তা রাজনৈতিকভাবে অসম্ভব করে তোলে।

নিরাপত্তার বিকল্প খোঁজার অংশ হিসেবে গত বছর পাকিস্তানের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তি করে সৌদি আরব। এর ভিত্তিতে গঠিত হয় একটি আঞ্চলিক জোট, যেখানে যুক্ত হয় মিসর ও তুরস্ক। এই ‘কোয়ার্টেট’ বা চতুর্জন জোটের লক্ষ্য—ইরান ও ইসরায়েল উভয়ের হুমকি থেকে সৌদি স্বার্থ রক্ষা।

যুদ্ধ শুরুর পর মুসলিম দেশগুলোর বিদেশমন্ত্রীদের জরুরি বৈঠক ডাকা হয়, যেখানে পাকিস্তান মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় আসে। এই জোট শুধু যুদ্ধ শেষ করতেই সাহায্য করছে না, তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে কোনো চুক্তিতে সৌদি আরব যাতে বাদ না পড়ে সেটিও লক্ষ্য।

পাকিস্তানের পারমাণবিক অস্ত্র ও তুরস্কের ন্যাটো সদস্যপদ এই জোটকে আঞ্চলিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। এছাড়া গত মার্চে ইউক্রেইনের সঙ্গে ড্রোন প্রযুক্তি সংক্রান্ত চুক্তি করে সৌদি আরব, যা তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালী করবে।

ইরান যুদ্ধের সময় হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেয়, যা বিশ্বের তেল সরবরাহের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি রুট। তেহরান মনে করে, মার্কিত মিত্রতা উপসাগরীয় দেশগুলোকে নিরাপদ রাখতে পারে না—এই বার্তা দেওয়াই তাদের লক্ষ্য ছিল।

ইরান এখন হরমুজ প্রণালী নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতাকে একটি কৌশলগত হাতিয়ার হিসেবে দেখছে। তেহরানের নীতিনির্ধারকদের মধ্যে একটি মত হচ্ছে, যদি আগেই এই ‘হরমুজ কার্ড’ খেলা হতো, তাহলে নিষেধাজ্ঞা বা যুদ্ধের মুখোমুখি হতে হতো না। এমনকি সুয়েজ খালের মতো এই প্রণালী থেকে টোল আদায়ের পরিকল্পনাও তাদের রয়েছে।

রিয়াদের সামনে দুটি অপছন্দের পথ: এক. ইসরায়েলের আধিপত্য মেনে নেওয়া; দুই. চলমান ইরানি হুমকি সহ্য করা। দুটিই সৌদি আরবের কাঙ্ক্ষিত নয়।

যদি সৌদি আরব যুদ্ধে সরাসরি অংশ নেয়, তাহলে ফিলিস্তিন ইস্যুতে কোনো অর্থবহ ছাড় না পেয়েই ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণে বাধ্য হতে পারে—যা সৌদি জনগণ ও আরব বিশ্বের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। রিয়াদ মনে করে, ইসরায়েল এই যুদ্ধকে উপসাগরীয় দেশগুলোকে নিজেদের ওপর নির্ভরশীল করার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, যুদ্ধ যেভাবেই শেষ হোক না কেন, সৌদি আরবকে তার অর্থনীতি ও কৌশলগত স্বাধীনতা সংরক্ষণ করতে হবে। রিয়াদ যুক্তরাষ্ট্রের কিছু সমর্থন চাইবেই, তবে তা মিসর, পাকিস্তান ও তুরস্কের সঙ্গে আঞ্চলিক জোট এবং চীনের ওপর আরও বেশি নির্ভরশীলতার মাধ্যমে পূরণ করতে হবে।

সৌদি আরবের জন্য আরও একটি চ্যালেঞ্জ হলো উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের (জিসিসি) সব দেশকে এক মতে আনা। সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইন ইরানের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক অবস্থান নিয়েছে, অন্যদিকে ওমান ও কাতার ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখেছে।

ইরান ও সৌদি আরব সবসময় প্রতিবেশী থাকবে—ভৌগোলিক বাস্তবতা তাদের বিকল্প সীমিত করে দিয়েছে। সহাবস্থানের বিকল্প হলো চলমান সংঘাতের চক্র, যা ইরান ও উপসাগরীয় আরব দেশগুলো উভয়ের জন্যই ধ্বংসাত্মক হবে।

তথ্যসূত্র: ফরেন অ্যাফেয়ার্স

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *