আমজাদ সুমন
একটি সিনেমা বিশ্বব্যাপী ১ বিলিয়ন ডলার আয় করবে—হলিউডে এটি এখনও বিরল ঘটনা। শত বছরের বেশি সময় ধরে হাজার হাজার সিনেমা মুক্তি পেয়েছে। কিন্তু এর মধ্যে মাত্র ৬৪টি সিনেমা বিশ্বব্যাপী বক্স অফিসে ১ বিলিয়ন ডলার বা তার বেশি আয় করতে পেরেছে।
আগস্ট ২০২৬ পর্যন্ত বিজনেস ইনসাইডার-এর সংকলিত তালিকায় উঠে এসেছে এই ৬৪ সিনেমার নাম। তালিকাটি তৈরি করা হয়েছে বক্স অফিস মোজো-এর তথ্যের ভিত্তিতে। এতে মুদ্রাস্ফীতির প্রভাব হিসাব করা হয়নি। ফলে এটি মূলত সিনেমাগুলোর নামমাত্র বিশ্বব্যাপী বক্স অফিস আয়ের হিসাব।
এই তালিকায় একটি বিষয় খুব স্পষ্ট। বক্স অফিসের সবচেয়ে বড় সাফল্য এখন আর কেবল একটি ভালো সিনেমার ওপর নির্ভর করে না। বড় ফ্র্যাঞ্চাইজি, পরিচিত চরিত্র, অ্যানিমেশন, সুপারহিরো এবং বিশ্বজুড়ে একসঙ্গে মুক্তি—সবকিছু মিলে তৈরি হয় ‘ইভেন্ট সিনেমা’।
১ বিলিয়ন ডলারের ক্লাবে সবচেয়ে বড় উপস্থিতি পরিচালক জেমস ক্যামেরনের।
তাঁর আভাতার বিশ্বব্যাপী প্রায় ২.৯২৪ বিলিয়ন ডলার আয় করে তালিকার শীর্ষে রয়েছে। দ্বিতীয় অবস্থানে এভেনঞ্জারস : এন্ডগেম, যার আয় প্রায় ২.৮ বিলিয়ন ডলার। তৃতীয় আভাতার: দ্য ওয়ে অফ ওয়াটার, প্রায় ২.৩৪৩ বিলিয়ন ডলার নিয়ে।
চতুর্থ অবস্থানে রয়েছে টাইটানিক। একাধিকবার পুনঃমুক্তির পর সিনেমাটির মোট আয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ২.২৬৫ বিলিয়ন ডলারে। পঞ্চম স্টার ওয়ার্স : দ্য ফোর্স এওয়াকেনস, যার আয় প্রায় ২.০৭১ বিলিয়ন ডলার।
ক্যামেরনের জন্য বিষয়টি আরও তাৎপর্যপূর্ণ। তাঁর আভাতার, আভাতার: দ্য ওয়ে অফ ওয়াটার, টাইটানিক এবং আভাতার: ফায়ার এন্ড এশ—চারটি সিনেমাই ১ বিলিয়ন ডলারের ক্লাবে রয়েছে। বিজনেস ইনসাইডার-এর তালিকায় কোনো পরিচালকের এতগুলো বিলিয়ন ডলারের সিনেমা নেই।
১ বিলিয়ন ডলারের ক্লাবে মার্ভেলের উপস্থিতিও শক্তিশালী। দ্য অ্যাভেঞ্জার্স, অ্যাভেঞ্জার্স: এজ অফ আলট্রন, অ্যাভেঞ্জার্স: ইনফিনিটি ওয়ার এবং অ্যাভেঞ্জার্স: এন্ডগেম—চারটি অ্যাভেঞ্জার্স সিনেমাই এই সীমা অতিক্রম করেছে।
এ তালিকায় রয়েছে আয়রন ম্যান3, ক্যাপ্টেন আমেরিকা: সিভিল ওয়ার, ব্ল্যাক প্যান্থার এবং স্পাইডার ম্যান: নো ওয়ে হোম-এর মতো সিনেমাও।
আয়রন ম্যান-3 মাত্র ২৩ দিনে ১ বিলিয়ন ডলারের সীমা অতিক্রম করেছিল। ব্ল্যাক প্যান্থার সেই মাইলফলকে পৌঁছায় ২৬ দিনে। আর অ্যাভেঞ্জার্স মাত্র ১৯ দিনেই ১ বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করে।
তবে এই সাফল্য শুধু মার্ভেলের নয়। ডিসি-ও অ্যাকুয়াম্যান ও জোকার-এর মতো সিনেমার মাধ্যমে তালিকায় জায়গা করে নিয়েছে। অ্যাকুয়াম্যান ছিল প্রথম ডিসি সুপারহিরো সিনেমা, যা ১ বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করে।
২০১৯ সালের জোকার বক্স অফিস ইতিহাসে আলাদা জায়গা তৈরি করে।
সিনেমাটি বিশ্বব্যাপী প্রায় ১.০৭৯ বিলিয়ন ডলার আয় করে। একই সঙ্গে এটি ছিল ইতিহাসের প্রথম আর-রেটেড সিনেমা, যা ১ বিলিয়ন ডলারের মাইলফলক অতিক্রম করে। মুক্তির প্রায় ছয় সপ্তাহের মধ্যে এই অর্জন করে সিনেমাটি।
এর আগে ধারণা ছিল, ১ বিলিয়ন ডলারের বাজার মূলত পরিবারবান্ধব সিনেমা এবং বিশাল ফ্র্যাঞ্চাইজির জন্য। জোকার সেই ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করে।
বিলিয়ন ডলারের ক্লাবে অ্যানিমেশন সিনেমার উপস্থিতিও উল্লেখযোগ্য।
ফ্রোজেন, ফ্রোজেন II, ইনক্রিডিবল 2, টয় স্টোরি 3, টয় স্টোরি 4, ইনসাইড আউট 2 এবং জুটোপিয়া 2—সবগুলোই ১ বিলিয়ন ডলারের বেশি আয় করেছে।
বিশেষ করে ইনসাইড আউট 2 মাত্র ১৯ দিনে ১ বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করে। এটি দীর্ঘ সময় পর্যন্ত সবচেয়ে দ্রুত ১ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছানো অ্যানিমেশন সিনেমার রেকর্ড ধরে রাখে। সিনেমাটির মোট আয় প্রায় ১.৭ বিলিয়ন ডলার।
এখানে ডিজনী ও পিক্সার-এর সবচেয়ে বড় শক্তি হলো পরিচিত চরিত্র। একই সঙ্গে শিশু ও প্রাপ্তবয়স্ক দর্শককে হলে টানতে পারা।
বিলিয়ন ডলারের ইতিহাসে ২০১৯ সাল বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
ওই বছর ডিজনী-এর সাতটি সিনেমা ১ বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করে। সেগুলো হলো ক্যাপ্টেন মারভেল, আলাদিন, অ্যাভেঞ্জার্স: এন্ডগেম, দ্য লায়ন কিং, ফ্রোজেন II, স্টার ওয়ার্স: দ্য রাইজ অফ স্কাইওয়াকার এবং টয় স্টোরি 4।
একটি স্টুডিও একই বছরে এতগুলো সিনেমাকে ১ বিলিয়ন ডলারের ক্লাবে নিতে পারেনি।
এ ঘটনা হলিউডের ব্যবসায়িক কৌশলের একটি বড় পরিবর্তনও দেখায়। স্টুডিওগুলো এখন শুধু নতুন গল্পের ওপর নির্ভর করছে না। বরং আগে থেকেই পরিচিত চরিত্র ও ফ্র্যাঞ্চাইজিকে কেন্দ্র করে বিশাল আন্তর্জাতিক বাজার তৈরি করছে।
৬৪টি সিনেমার তালিকা বিশ্লেষণ করলে ফ্র্যাঞ্চাইজির আধিপত্য চোখে পড়ে।
জুরাসিক ওয়ার্ল্ড, জুরাসিক পার্ক, ফাস্ট অ্যান্ড ফিউরিয়াস, স্টার ওয়ার্স, ট্রান্সফর্মার্স, পাইরেটস অফ দ্য ক্যারিবিয়ান, হ্যারি পটার, টয় স্টোরি, অ্যাভেঞ্জার্স এবং অ্যাভাটার—একাধিক ফ্র্যাঞ্চাইজির একাধিক সিনেমা এখানে রয়েছে।
তবে প্রতিটি কিস্তি যে সফল হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।
দ্য হবিট: এন আনএক্সপেকটেড জার্নি ১ বিলিয়ন ডলার আয় করলেও পরবর্তী দুই কিস্তি সেই সীমা অতিক্রম করতে পারেনি।
অর্থাৎ একটি শক্তিশালী ব্র্যান্ড দর্শককে হলে আনতে পারে। কিন্তু সেটিই দীর্ঘমেয়াদি সাফল্যের নিশ্চয়তা নয়।
আন্তর্জাতিক বাজার ১ বিলিয়ন ডলারের সিনেমার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ট্রান্সফরমান: এজ অফ এক্সটিংকশন-এর মোট আয়ের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ এসেছিল চীন থেকে। অ্যাকুয়াম্যান-ও যুক্তরাষ্ট্রে মুক্তির আগেই চীনের বাজারে বড় সাফল্য পেয়েছিল।
পুরোনো সিনেমার ক্ষেত্রেও আন্তর্জাতিক বাজার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
জুরাসিক পার্ক ১৯৯৩ সালের মূল মুক্তির সময় চীনে মুক্তি পায়নি। পরে ২০১৩ সালের ৩ডি পুনঃমুক্তি এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক প্রদর্শনের মাধ্যমে সিনেমাটি ১ বিলিয়ন ডলারের সীমা অতিক্রম করে।
একই ঘটনা ঘটেছে হ্যারি পটার এন্ড দ্য সসার‘স স্টোন-এর ক্ষেত্রেও। ২০০১ সালের সিনেমাটি প্রায় ১৯ বছর পর চীনে পুনঃমুক্তির মাধ্যমে ১ বিলিয়ন ডলারের ক্লাবে প্রবেশ করে।
২০২৬ সালও বিলিয়ন ডলারের সিনেমার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
বিজনেস ইনসাইডার-এর তালিকায় দ্য সুপার মারিও গ্যালাক্সি মুভি ১.০১১ বিলিয়ন ডলার নিয়ে ২০২৬ সালের প্রথম সিনেমা হিসেবে এই সীমা অতিক্রম করে।
এরপর তালিকায় যোগ হয় ক্রিস্টোফার নোলান-এর দ্য ওডিসি। হোমার-এর মহাকাব্য অবলম্বনে নির্মিত সিনেমাটি প্রায় ১.২৯১ বিলিয়ন ডলার আয় করে। এটি নোলান-এর ক্যারিয়ারের সর্বোচ্চ আয়কারী সিনেমা হয়ে ওঠে।
এ বছর টয় স্টোরি 5-ও ১ বিলিয়ন ডলারের সীমা অতিক্রম করেছে। বিজনেস ইনসাইডার-এর হিসাবে সিনেমাটির আয় প্রায় ১.০৯৪ বিলিয়ন ডলার।
অন্যদিকে মাইকেল জ্যাকসন-এর জীবনভিত্তিক মাইকেল-ও ১ বিলিয়ন ডলারের ক্লাবে প্রবেশ করেছে। এটি ইতিহাসের প্রথম বায়োপিক, যার বিশ্বব্যাপী আয় ১ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে।
তালিকাটি আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় দেখায়। ১ বিলিয়ন ডলারের সিনেমা মানেই শুধু সুপারহিরো বা সিক্যুয়েল নয়।
বারবি প্রায় ১.৪৪৭ বিলিয়ন ডলার আয় করে। গ্রেটা গারউইগ-এর সিনেমাটি ১৭ দিনে ১ বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করে। একই সঙ্গে গারউইগ হয়ে ওঠেন প্রথম একক নারী পরিচালক, যার পরিচালিত সিনেমা এই মাইলফলক স্পর্শ করে।
টপ গান: মাভেরিক-এর সাফল্যও ব্যতিক্রমী। ১৯৮৬ সালের সিনেমার প্রায় চার দশক পর মুক্তি পাওয়া সিক্যুয়েলটি প্রায় ১.৪৯৬ বিলিয়ন ডলার আয় করে। এটি টম ক্রুজ-এর ক্যারিয়ারের সর্বোচ্চ আয়কারী সিনেমা।
১ বিলিয়ন ডলার শুনতে একটি বড় সংখ্যা। কিন্তু বিশ্বব্যাপী বক্স অফিসের বাজার বিবেচনায়ও এটি অত্যন্ত কঠিন সীমা।
একটি সিনেমাকে একই সময়ে বহু দেশের দর্শককে আকর্ষণ করতে হয়। বড় বাজেটের নির্মাণের পাশাপাশি প্রয়োজন ব্যাপক প্রচারণা। আন্তর্জাতিক পরিবেশক, স্থানীয় বাজারের উপযোগী বিপণন এবং দীর্ঘ সময় ধরে দর্শক ধরে রাখাও গুরুত্বপূর্ণ।
এর সঙ্গে রয়েছে মুক্তির সময়। একই সময়ে বড় কোনো সিনেমা মুক্তি পেলে বক্স অফিস ভাগ হয়ে যেতে পারে।
এ কারণেই ১ বিলিয়ন ডলারের ক্লাব আসলে শুধু জনপ্রিয় সিনেমার তালিকা নয়। এটি হলিউডের বৈশ্বিক ব্যবসায়িক শক্তিরও একটি সূচক।
৬৪টি সিনেমার তালিকা একটি বিষয় পরিষ্কার করে দিয়েছে। সিনেমা হলের ভবিষ্যৎ নিয়ে স্ট্রিমিং যুগে যত প্রশ্নই থাকুক, বড় পর্দার জন্য মানুষ এখনও বিপুল অর্থ ব্যয় করতে প্রস্তুত।
তবে সেই দর্শককে হলে ফেরাতে প্রয়োজন বিশেষ কিছু।
পরিচিত চরিত্র। বড় ফ্র্যাঞ্চাইজি। উচ্চমানের ভিজ্যুয়াল অভিজ্ঞতা। শিশু ও পরিবারকেন্দ্রিক অ্যানিমেশন। অথবা এমন একটি গল্প, যা সামাজিক ও সাংস্কৃতিকভাবে ‘ইভেন্ট’ হয়ে উঠতে পারে।
অ্যাভাটার, অ্যাভেঞ্জার্স, স্টার ওয়ার্স, টয় স্টোরি, জুরাসিক ওয়ার্ল্ড, ফ্রোজেন, স্পাইডার-ম্যান এবং বার্বি—সবগুলোর পথ আলাদা। কিন্তু সাফল্যের কেন্দ্রে রয়েছে একই বিষয়। দর্শককে ঘর থেকে বের করে সিনেমা হলে যাওয়ার মতো যথেষ্ট বড় কারণ তৈরি করা।
১ বিলিয়ন ডলারের ক্লাব তাই শুধু অর্থের হিসাব নয়। এটি আধুনিক সিনেমা ব্যবসায় দর্শকের মনোযোগ দখলের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষাগুলোর একটি।