বৃক্ষরোপণ শুধু সবুজায়ন নয়, জলবায়ু ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার লড়াই

বাংলাদেশে পরিবেশ রক্ষায় বৃক্ষরোপণ ও বন

ড. মোঃ আব্দুল ওয়াহাব

বৃক্ষরোপণকে অনেক সময় শুধু সবুজায়নের কর্মসূচি হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু বাস্তবে এর গুরুত্ব আরও ব্যাপক। বন ও বৃক্ষ পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, মাটি ও পানি রক্ষা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

বাংলাদেশের মতো জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশে বৃক্ষরোপণকে দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশ ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে দেখতে হবে। শুধু গাছ লাগানো নয়, প্রাকৃতিক বন রক্ষা এবং লাগানো গাছের পরিচর্যাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

বিশ্বের বনভূমির পরিস্থিতিও এ প্রয়োজনীয়তার কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও)–এর সর্বশেষ গ্লোবাল ফরেস্ট রিসোর্সেস অ্যাসেসমেন্ট অনুযায়ী, ২০২০ সালে বিশ্বের মোট স্থলভাগের প্রায় ৩১ শতাংশ বনভূমি ছিল। ১৯৯০ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে বিশ্বে প্রায় ১৭৮ মিলিয়ন হেক্টর বনভূমি কমেছে। তবে বন উজাড়ের বার্ষিক হার আগের তুলনায় কমেছে।

বৃক্ষ ও অন্যান্য সবুজ উদ্ভিদ সালোকসংশ্লেষণের মাধ্যমে বায়ুমণ্ডলের কার্বন ডাই-অক্সাইড ব্যবহার করে জৈব পদার্থ তৈরি করে। একই প্রক্রিয়ায় অক্সিজেনও উৎপন্ন হয়। এর সরলীকৃত রাসায়নিক সমীকরণ হলো—

6CO₂ + 6H₂O + আলো → C₆H₁₂O₆ + 6O₂

এই প্রক্রিয়া পৃথিবীর খাদ্যব্যবস্থার মৌলিক ভিত্তিগুলোর একটি। ধান, গম, ফল, শাকসবজি এবং অন্যান্য উদ্ভিদজাত খাদ্যের উৎপাদন সরাসরি বা পরোক্ষভাবে উদ্ভিদের জৈবিক উৎপাদন ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত।

তবে পরিবেশবিদদের মতে, শুধু অক্সিজেন উৎপাদন দিয়ে বৃক্ষের গুরুত্ব ব্যাখ্যা করলে বিষয়টির বড় অংশই বাদ পড়ে যায়। বন মাটিতে কার্বন ধরে রাখে, পানি সংরক্ষণে সহায়তা করে, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে এবং অসংখ্য প্রাণী ও উদ্ভিদের আবাসস্থল তৈরি করে।

বিশ্বের স্থলভাগের জীববৈচিত্র্যের বড় অংশ বননির্ভর। বন ধ্বংস হলে শুধু গাছ কমে না। একই সঙ্গে প্রাণীর আবাসস্থল, খাদ্যশৃঙ্খল এবং প্রাকৃতিক পরিবেশের ভারসাম্যও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

বোটানিক গার্ডেনস কনজারভেশন ইন্টারন্যাশনালের (বিজিসিআই) গ্লোবাল ট্রি এসেসমেন্ট অনুযায়ী, বিশ্বে পরিচিত ৫৮,৪৯৭টি বৃক্ষপ্রজাতির মধ্যে প্রায় ৩০ শতাংশ বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে। সংখ্যাটি প্রায় ১৭,৫০০ প্রজাতি। অন্তত ১৪২টি বৃক্ষপ্রজাতি ইতোমধ্যে বিলুপ্ত হিসেবে নথিভুক্ত হয়েছে। আবাসস্থল ধ্বংস, কৃষি সম্প্রসারণ, কাঠ আহরণ, অতিরিক্ত ব্যবহার এবং জলবায়ু পরিবর্তন এসব প্রজাতির জন্য বড় হুমকি।

অর্থাৎ, বৃক্ষ সংরক্ষণের প্রশ্নটি কেবল মানুষের জন্য ছায়া বা অক্সিজেন নিশ্চিত করার প্রশ্ন নয়। এটি পৃথিবীর জীববৈচিত্র্য রক্ষার প্রশ্নও।

বৃক্ষের শিকড় মাটিকে দৃঢ়ভাবে ধরে রাখে। ফলে বৃষ্টির পানি ও বাতাসের কারণে মাটির ক্ষয় কমে। পাহাড়ি এলাকা, নদীর তীর ও উপকূলীয় অঞ্চলে বৃক্ষের এই ভূমিকা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।

বনভূমি মাটিতে পানি ধরে রাখতেও সহায়তা করে। গাছপালা ও বনভূমির উপস্থিতি বৃষ্টির পানি মাটিতে প্রবেশের সুযোগ বাড়ায়। একই সঙ্গে বাষ্পীভবন ও বাষ্পোৎসর্জনের মাধ্যমে স্থানীয় জলচক্রেও ভূমিকা রাখে।

উপকূলীয় অঞ্চলে ম্যানগ্রোভ বন ঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও উপকূলীয় ক্ষয় থেকে মানুষের বসতি ও অবকাঠামোকে আংশিক সুরক্ষা দিতে পারে। সুন্দরবন এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণগুলোর একটি।

বন কার্বন ধারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক ব্যবস্থা। গাছের কাণ্ড, শাখা, পাতা, শিকড় এবং বনভূমির মাটিতে বিপুল পরিমাণ কার্বন সঞ্চিত থাকে। ফলে বন উজাড় হলে শুধু গাছের সংখ্যা কমে না, সঞ্চিত কার্বনের একটি অংশও বায়ুমণ্ডলে ফিরে যেতে পারে।

এফএও-এর হিসাবে, ১৯৯০ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে বিশ্বব্যাপী বনভূমি কমেছে প্রায় ১৭৮ মিলিয়ন হেক্টর। একই সময়ে বনভূমি সম্প্রসারণ ও পুনঃবনায়নের কারণে কিছু ক্ষতিও পুষিয়ে নেওয়া হয়েছে। ২০১০–২০২০ দশকে বৈশ্বিক নিট বনহানি ছিল বছরে প্রায় ৪ দশমিক ৭ মিলিয়ন হেক্টর।

শহরাঞ্চলেও বৃক্ষের গুরুত্ব বাড়ছে। গাছ ছায়া দেয় এবং বাষ্পোৎসর্জনের মাধ্যমে স্থানীয় তাপমাত্রা কমাতে সহায়তা করে। এ কারণে নগর এলাকায় বৃক্ষরোপণকে ক্রমেই তাপদাহ মোকাবিলার একটি কার্যকর প্রাকৃতিক ব্যবস্থা হিসেবে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

বাংলাদেশ ভৌগোলিকভাবে ঘনবসতিপূর্ণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা একটি দেশ। এখানে বনভূমি রক্ষা এবং বৃক্ষ আচ্ছাদন বাড়ানোর প্রয়োজন তাই বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

এফএও-এর গ্লোবাল ফরেস্ট রিসোর্সেস এসেসমেন্ট-এর সর্বশেষ সংস্করণ ১৯৯০ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত বিশ্বের বনসম্পদের পরিবর্তন বিশ্লেষণ করেছে। এই মূল্যায়ন বিশ্বের বনসম্পদ সম্পর্কে দেশগুলোর সরকারি তথ্য ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত পদ্ধতির ওপর ভিত্তি করে তৈরি।

বাংলাদেশে বন ও বৃক্ষসম্পদের পরিমাণ নিয়ে বিভিন্ন উৎসে ভিন্ন ভিন্ন সংজ্ঞা ও হিসাব ব্যবহৃত হয়। তাই শুধু একটি শতাংশ দিয়ে দেশের প্রকৃত বন পরিস্থিতি বিচার করা ঠিক নয়। প্রাকৃতিক বন, বাণিজ্যিক বন, সামাজিক বনায়ন এবং বৃক্ষ আচ্ছাদন—এসব আলাদা করে দেখা প্রয়োজন।

তবে বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশের প্রাকৃতিক বনভূমি বিভিন্ন ধরনের চাপের মুখে রয়েছে। আবাসস্থল ধ্বংস, অবৈধ দখল, অপরিকল্পিত উন্নয়ন, বন উজাড় এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এই চাপকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বৃক্ষরোপণের ক্ষেত্রে সংখ্যার চেয়ে গাছের প্রজাতি, স্থান নির্বাচন এবং পরবর্তী পরিচর্যা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

দেশীয় প্রজাতির গাছকে অগ্রাধিকার দেওয়া যেতে পারে। পাহাড়, উপকূল, নদীর তীর, রাস্তার পাশ, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের খালি জায়গা, পুকুরের পাড়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং বসতভিটার উপযুক্ত জায়গায় পরিকল্পিতভাবে বৃক্ষরোপণ করা সম্ভব।

তবে একই সঙ্গে বিদ্যমান প্রাকৃতিক বন রক্ষা করতে হবে। একটি পরিণত প্রাকৃতিক বনকে কেটে সেখানে নতুন চারা লাগানোকে বন সংরক্ষণের বিকল্প হিসেবে দেখা যায় না। কারণ পুরোনো বন একটি জটিল বাস্তুতন্ত্র তৈরি করে, যা নতুন লাগানো চারাগাছের বাগান দ্রুত তৈরি করতে পারে না।

বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিকে সফল করতে স্থানীয় জনগণকে যুক্ত করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সরকারি-বেসরকারি সংস্থা এবং সামাজিক সংগঠনকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।

স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বৃক্ষরোপণে যুক্ত করা যেতে পারে। তবে কর্মসূচি শুধু উদ্বোধন বা ছবি তোলার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে প্রতিটি গাছের পরিচর্যা ও বেঁচে থাকার হার পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন।

সেন্টার ফর গ্লোবাল এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (সিজিইডি) এ পর্যন্ত দেশের ১০ জেলায় ৭৫ হাজার গাছের চারা রোপন করেছে। আর রাজশাহীতে এক হাজার তাল গাছের চারা রোপন করেছে।।

বৃক্ষরোপণ নিয়ে সরকারের বড় কর্মসূচিও রয়েছে। তবে যে কোনো বড় সংখ্যার লক্ষ্যমাত্রার পাশাপাশি গাছের বেঁচে থাকার হার, প্রজাতির বৈচিত্র্য, রোপণের স্থান এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যার বিষয়টি নিশ্চিত করা জরুরি।

বৃক্ষরোপণ এখন আর কেবল একটি সামাজিক কর্মসূচি নয়। এটি জলবায়ু অভিযোজন, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, খাদ্যনিরাপত্তা, মাটি ও পানি ব্যবস্থাপনা এবং জনস্বাস্থ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ।

একটি গাছ লাগানো সহজ। কিন্তু সেই গাছকে বাঁচিয়ে বড় করা কঠিন। আরও কঠিন হলো একটি প্রাকৃতিক বনকে অক্ষত রাখা।

তাই বাংলাদেশের পরিবেশ রক্ষায় এখন প্রয়োজন শুধু বেশি গাছ লাগানোর প্রতিযোগিতা নয়। প্রয়োজন কোথায় কোন গাছ লাগবে, কীভাবে তা রক্ষা করা হবে এবং কীভাবে প্রাকৃতিক বনকে অক্ষত রাখা হবে—তার সমন্বিত পরিকল্পনা।

বিশ্বের বনভূমি কমার ইতিহাস এবং বিপন্ন বৃক্ষপ্রজাতির সংখ্যা একটি বিষয় স্পষ্ট করে দিয়েছে। বৃক্ষ সংরক্ষণ এখন ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য কোনো বিলাসিতা নয়। এটি মানুষের টিকে থাকা, জীববৈচিত্র্য রক্ষা এবং বাসযোগ্য পৃথিবী নিশ্চিত করার অন্যতম শর্ত।

 

 

ড. মোঃ আব্দুল ওয়াহাব
পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *