ইতালির ভেনিসে অভিনেত্রী আজমেরী হক বাঁধনের ওপর হামলার ঘটনায় নতুন করে আলোচনায় এসেছে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সহিংসতা, প্রবাসে দলীয় সংঘাত এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পরও টিকে থাকা মব সংস্কৃতি।
হামলার ঘটনায় ইতালির পুলিশ তদন্ত শুরু করেছে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও ইতালিতে বাংলাদেশ দূতাবাসও বিষয়টি তদারক করছে বলে সংশ্লিষ্টদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
বাঁধন ভেনিস আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে অংশ নিতে ইতালিতে যান। সেখানে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ‘আলী’ নিয়ে তিনি উৎসবে উপস্থিত ছিলেন। উৎসবের আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে থাকা অবস্থায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের একদল কর্মীর সঙ্গে বাগ্বিতণ্ডা ও তাঁর উপর হামলার ঘটনা ঘটে ।
অভিযোগ রয়েছে, হামলাকারীরা বাঁধনকে লক্ষ্য করে পানি ও কোমল পানীয় ছোড়ে। তাঁর ফোন ফেলে দেওয়া হয়। তাঁর সঙ্গে থাকা স্বজনদেরও ধাক্কাধাক্কি করা হয়। ঘটনাস্থলে থাকা একটি শিশুও আতঙ্কিত হয়ে পড়ে।
ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ওই ভিডিও তদন্তের কাজে ইতালীয় পুলিশকে দেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন।
ঘটনার পর ইতালিতে বাংলাদেশের দূতাবাসের কর্মকর্তারা বাঁধনের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। দূতাবাসের দুই কর্মকর্তা তাঁকে নিয়ে ইতালীয় পুলিশের কাছে যান। সেখানে হামলার বিষয়ে মামলা করা হয় বলে জানানো হয়েছে।
অপরাধীদের শনাক্তে ভিডিও ফুটেজ ব্যবহার করা হচ্ছে। হামলায় জড়িত কয়েকজনের পরিচয় শনাক্ত হয়েছে বলেও বিভিন্ন পক্ষের দাবি রয়েছে। তবে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত এসব তথ্যকে পুলিশের আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
বাঁধনের সঙ্গে ইতালীয় পুলিশ যোগাযোগ রাখছে। পরবর্তী সময়ে সাক্ষ্য দেওয়ার প্রয়োজন হলে তাঁকে আবার ইতালিতে যেতে হতে পারে। পুলিশ তাঁর কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি সাক্ষ্য দিতে ফিরে আসার বিষয়ে সম্মতি দিয়েছেন বলে জানানো হয়েছে।
ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসব কর্তৃপক্ষও ঘটনাটিকে গুরুত্ব দিয়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যে এসেছে। উৎসব চলাকালে বাঁধনের নিরাপত্তা ও থাকার বিষয়ে আয়োজকদের পক্ষ থেকে সহযোগিতার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকেও ঘটনাটিকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে বলে জানানো হয়েছে।
বাঁধনের ওপর হামলার পর দেশে রাজনৈতিক বিতর্কও তীব্র হয়েছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক মতের মানুষ ঘটনাটির নিন্দা জানিয়েছেন। ঘটনাটি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আওয়ামী লীগপন্থী ও অন্যান্য পক্ষের মধ্যে পাল্টাপাল্টি বক্তব্যও দেখা গেছে। তবে যে পক্ষের মানুষই জড়িত থাকুক, রাজনৈতিক মতের কারণে কাউকে শারীরিকভাবে হেনস্তা করার কোনো বৈধতা নেই।
বাঁধনের ঘটনায় রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে যে তৎপরতা দেখা গেছে, তার সঙ্গে জুলাই আন্দোলনে নিহত সাধারণ মানুষের পরিবারগুলোর বাস্তবতা তুলনা করে প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে।
এর একটি মর্মান্তিক উদাহরণ হিসেবে সামনে এসেছে জসীম উদ্দিন হাওলাদারের পরিবারের ঘটনা।
জসীম উদ্দিন হাওলাদার ছিলেন একজন ড্রাইভার। তাঁর পরিচিতজনদের বক্তব্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই জুমার নামাজের পর তিনি আন্দোলনে যোগ দেন। সেখানে তিনি গুলিবিদ্ধ হন। ২৯শে জুলাই হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়। ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর তাঁর স্ত্রী রুমা বেগম স্বামীর হত্যার ঘটনায় মামলা করেন বলে জানা গেছে।
এরপর মামলার জবানবন্দি দিতে ২০২৫ সালের ১৭ই মার্চ তিনি পটুয়াখালী থেকে ঢাকায় আসেন বলে পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
পরিবারের দাবি, এর পরদিন ১৮ই মার্চ জসীমের বড় মেয়েকে পটুয়াখালী আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকজন ব্যক্তি ধর্ষণ করেন। অভিযোগ রয়েছে, ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়।
এই ঘটনার পর সামাজিক ও মানসিক চাপে জসীমের মেয়ে ২৬শে এপ্রিল ঢাকায় আত্মহত্যা করেন বলে পরিবারের বক্তব্যে দাবি করা হয়েছে।
৭ই সেপ্টেম্বর রুমা বেগম আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে কাঁদতে কাঁদতে জবানবন্দি দেয়ার সময়—এসব তথ্য তুলে ধরেন । এই অভিযোগগুলোর সত্যতা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দায় অবশ্যই বিচারিক প্রক্রিয়ায় নির্ধারিত হওয়ার বিষয়। তবে একজন জুলাই শহীদের পরিবারের ওপর এমন গুরুতর নির্যাতনের অভিযোগ সামনে আসা রাষ্ট্র ও সমাজের জন্য গভীর উদ্বেগের বিষয়।
বাঁধনের ঘটনায় বাংলাদেশ সরকার, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং ইতালিতে বাংলাদেশ দূতাবাস সক্রিয় হয়েছে। ইতালীয় পুলিশও অভিযোগটি তদন্ত করছে। এটা একজন বাংলাদেশি নাগরিকের নিরাপত্তার জন্য রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনের স্বাভাবিক উদাহরণ। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, একই রাষ্ট্র কি জুলাই আন্দোলনে নিহত সাধারণ নাগরিকদের পরিবারগুলোর নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচারের ক্ষেত্রেও একই মাত্রার গুরুত্ব দিচ্ছে?
জসীম উদ্দিন হাওলাদার কোনো চলচ্চিত্র তারকা ছিলেন না। তিনি ছিলেন একজন ড্রাইভার। আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগও তাঁর ছিল না। তিনি কোনো রাজনৈতিক দলের বড় নেতা ছিলেন না। কিন্তু জুলাই আন্দোলনে তিনি গুলিবিদ্ধ হয়েছিলেন। তাঁর পরিবারও পরবর্তী সময়ে ভয়াবহ অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছে বলে পরিবারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে।
এই পার্থক্যই রাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি করে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ফলে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ক্ষমতার কাঠামোতে বড় পরিবর্তন আসে। বিএনপির অনেক নেতা পরবর্তীতে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে আসেন। জামায়াতে ইসলামীর অনেক নেতাও সংসদে প্রতিনিধিত্বের সুযোগ পেয়েছেন। এই রাজনৈতিক পরিবর্তনের অন্যতম নৈতিক ভিত্তি ছিল জুলাই আন্দোলনে অংশ নেওয়া মানুষের আত্মত্যাগ।
তাই জুলাইয়ের একজন শহীদের পরিবারের ওপর গুরুতর নির্যাতনের অভিযোগ উঠলে সেটি শুধু একটি পরিবারের ব্যক্তিগত ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি রাজনৈতিক জবাবদিহির প্রশ্নও।
প্রশ্ন হলো—জুলাইয়ের জন্য যারা রাজনৈতিক সুবিধা পেয়েছেন, তাঁরা জুলাইয়ের নিহত ও আহতদের পরিবারের জন্য কী করেছেন?
জসীম উদ্দিন হাওলাদারের পরিবারের অভিযোগ যদি সত্য হয়, তাহলে সেটা নিয়ে সংসদে আলোচনা হয়েছে কি? রাষ্ট্রীয়ভাবে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত হয়েছে কি? অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি? শহীদের পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছে কি?
এসব প্রশ্নের উত্তর জনগণের জানা প্রয়োজন।
বাঁধনের ওপর হামলাকে শুধু একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখছেন না অনেকে। তাঁদের মতে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশে মব বা দলবদ্ধভাবে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। ২০২৪ সালের আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসে বিভিন্ন মাজার ও আখড়ায় হামলার ঘটনা ঘটে। নারী ফুটবল ম্যাচ বন্ধ করে দেওয়া, সংবাদমাধ্যমের কার্যালয়ে হামলা এবং গুজবের ভিত্তিতে মানুষকে মারধরের ঘটনাও আলোচনায় আসে।
এ ধরনের ঘটনার ক্ষেত্রে একটি সাধারণ প্রবণতা দেখা যায়। একটি গোষ্ঠী কাউকে ‘আমাদের’ বা ‘ওদের’ হিসেবে চিহ্নিত করে। এরপর আইনগত প্রক্রিয়ার বাইরে গিয়ে শাস্তি দেওয়ার চেষ্টা করে। রাজনৈতিক পরিচয় তখন ব্যক্তির পরিচয়ের সবচেয়ে বড় পরিচায়ক হয়ে দাঁড়ায়।ফলে একজন ব্যক্তি কী বলেছেন বা করেছেন, তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে তিনি কোন দলের সমর্থক বলে বিবেচিত হচ্ছেন।
রাজনৈতিক মেরুকরণের সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো প্রতিপক্ষকে মানুষ হিসেবে দেখার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলা। প্রথমে তাকে ভুল মনে হয়। এরপর তাকে খারাপ বলা হয়। তারপর তাকে রাষ্ট্র বা সমাজের শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। শেষ পর্যন্ত তার ওপর আক্রমণকে ন্যায্য মনে হতে শুরু করে।
রুয়ান্ডার ১৯৯৪ সালের গণহত্যা এই প্রক্রিয়ার সবচেয়ে ভয়াবহ উদাহরণগুলোর একটি। প্রায় একশ দিনে আট লাখের বেশি মানুষ নিহত হন। হুতু উগ্রবাদীরা তুতসি জনগোষ্ঠীকে অমানবিক ভাষায় চিহ্নিত করেছিল। প্রচারমাধ্যমের ভাষা সহিংসতাকে আরও উসকে দিয়েছিল।
বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতিকে রুয়ান্ডার সঙ্গে সরাসরি তুলনা করার সুযোগ নেই। দুই দেশের ইতিহাস ও রাজনৈতিক বাস্তবতা আলাদা।তবে একটি শিক্ষা সার্বজনীন। কোনো গোষ্ঠীকে দীর্ঘদিন ধরে অমানবিক ভাষায় চিহ্নিত করা হলে সহিংসতার সামাজিক বাধা দুর্বল হয়ে যায়।
কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ শাসনামল নিয়ে গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, দুর্নীতি, অর্থপাচার, রাজনৈতিক দমন এবং ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের সহিংসতা নিয়ে গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগের বিচার ও রাজনৈতিক জবাবদিহি প্রয়োজন কিন্তু একই সঙ্গে প্রশ্ন হলো, আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের নামে নতুন কোনো সহিংস রাজনৈতিক সংস্কৃতি তৈরি হচ্ছে কি না। কোনো দল বা গোষ্ঠীর অপরাধের জবাব অন্য দল বা গোষ্ঠীর অপরাধ হতে পারে না। আইনের শাসনের বিকল্প মব নয়।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে স্থানীয় পর্যায়ে একটি ‘খরচযোগ্য’ রাজনৈতিক কর্মী শ্রেণি তৈরি হয়েছে বলে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা রয়েছে। এদের অনেকেই কেন্দ্রীয় রাজনীতির সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী নন। কিন্তু স্থানীয় পর্যায়ে দলীয় ক্ষমতার প্রদর্শন, প্রতিপক্ষকে ভয় দেখানো, সংঘর্ষ এবং বিভিন্ন অবৈধ কর্মকাণ্ডে তাদের ব্যবহার করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
শীর্ষ নেতৃত্ব রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে নিরাপদ অবস্থানে থাকলেও মাঠের কর্মীরা প্রায়ই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকি নেন। বিদেশে রাজনৈতিক সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার ঘটনাও সেই বাস্তবতারই একটি সম্প্রসারণ।
ভেনিসের ঘটনায় হামলায় জড়িতদের বিরুদ্ধে ইতালীয় আইনে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে, তা তদন্ত ও আদালতের সিদ্ধান্তের বিষয়। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট। কোনো রাজনৈতিক দলের প্রতি আনুগত্য দেখাতে গিয়ে নিজের ভবিষ্যৎ, পরিবারের নিরাপত্তা কিংবা বিদেশে বৈধ অবস্থান ঝুঁকিতে ফেলা শেষ পর্যন্ত কর্মীর নিজেরই ক্ষতি করতে পারে।
বাংলাদেশের বহু প্রবাসী নাগরিক জীবনের বড় ঝুঁকি নিয়ে ইউরোপে পৌঁছান। অনিয়মিত অভিবাসনের ক্ষেত্রে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দেওয়ার ঘটনাও রয়েছে। ইতালিতে পৌঁছানোর পর অনেকেই দীর্ঘ আইনি ও অভিবাসন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যান। এই বাস্তবতায় বিদেশের মাটিতে রাজনৈতিক সহিংসতায় জড়িয়ে পড়া অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
ভেনিসের ঘটনার ক্ষেত্রে ইতালীয় আইনই মূল বিচারিক কাঠামো। হামলায় কারা জড়িত এবং তাঁদের বিরুদ্ধে কী অভিযোগ প্রমাণিত হবে, সেটি ইতালীয় কর্তৃপক্ষের তদন্তে নির্ধারিত হবে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিরোধ বিদেশের মাটিতে নিয়ে গিয়ে সহিংসতায় জড়ানো কোনো পক্ষের জন্যই নিরাপদ নয়।
বাঁধন পরিচিত মুখ। তিনি একজন অভিনেত্রী। আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করছিলেন। তাঁর ওপর হামলার পর রাষ্ট্র পাশে দাঁড়িয়েছে। দূতাবাস সক্রিয় হয়েছে। ইতালীয় পুলিশ তদন্ত করছে। এটি ইতিবাচক।
কিন্তু একই নীতি প্রত্যেক নাগরিকের জন্য প্রযোজ্য হওয়া প্রয়োজন।
শহীদ জসীম উদ্দিন হাওলাদারের পরিবার হোক কিংবা অন্য কোনো সাধারণ নাগরিকের পরিবার—তাদের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও ন্যায়বিচারের অধিকার কোনোভাবেই কম নয়। রাষ্ট্রের দায়িত্ব নির্ধারিত হওয়া উচিত নাগরিকের পরিচিতি দিয়ে নয়। নাগরিকত্ব দিয়ে।
কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের নিজেদের অতীত কর্মকাণ্ড নিয়ে আত্মসমালোচনা করা প্রয়োজন—এমন দাবি রয়েছে বিভিন্ন মহল থেকে। গুম, হত্যাকাণ্ড, দুর্নীতি, অর্থপাচার এবং জুলাই-আগস্টের সহিংসতার মতো অভিযোগের রাজনৈতিক ও আইনি জবাবদিহি প্রয়োজন। একই সঙ্গে আওয়ামী লীগের বাইরে থাকা রাজনৈতিক দলগুলোকেও নিজেদের কর্মীদের কর্মকাণ্ডের দায় নিতে হবে।
মব-রাজনীতি, প্রতিপক্ষকে হেনস্তা এবং রাজনৈতিক প্রতিশোধ কোনোভাবেই গণতান্ত্রিক রাজনীতির অংশ হতে পারে না। যে অস্ত্র আজ প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হচ্ছে, সেটিই আগামীকাল নিজের বিরুদ্ধে ফিরে আসতে পারে।
বাঁধনের ওপর হামলার নিন্দা করার জন্য তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে একমত হওয়ার প্রয়োজন নেই। তাঁর ওপর হামলা যদি রাজনৈতিক কারণে হয়ে থাকে, তাহলে সেটি শুধু একটি ব্যক্তির ওপর হামলা নয়। এটি মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপরও আঘাত।
একইভাবে জসীম উদ্দিন হাওলাদারের পরিবারের অভিযোগ সত্য হলে, সেটিও শুধু একটি পরিবারের ট্র্যাজেডি নয়। এটি জুলাইয়ের আত্মত্যাগ, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা এবং বিচারব্যবস্থার প্রতি রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতার প্রশ্ন।
গণতন্ত্রের পরীক্ষা কেবল নিজের পক্ষের মানুষকে রক্ষা করা নয়। পরীক্ষাটি হলো প্রতিপক্ষের অধিকারও রক্ষা করা। রাজনীতির লড়াই হতে পারে কঠিন। মতবিরোধ হতে পারে তীব্র। কিন্তু প্রতিপক্ষকে মানুষ হিসেবে দেখার ক্ষমতা হারিয়ে ফেললে রাজনীতি আর গণতান্ত্রিক থাকে না।
ভেনিসের ঘটনাটি তাই শুধু একজন অভিনেত্রীর ওপর হামলার ঘটনা নয়। এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির একটি আয়না। এই আয়নায় একদিকে দেখা যাচ্ছে রাষ্ট্রীয় সুরক্ষা পাওয়ার সক্ষমতা। অন্যদিকে দেখা যাচ্ছে সাধারণ নাগরিক ও শহীদ পরিবারের অনিশ্চিত বাস্তবতা।
জুলাইয়ের আত্মত্যাগের প্রকৃত মূল্যায়ন হবে তখনই, যখন রাষ্ট্র পরিচয় দেখে নয়, অধিকার দেখে নাগরিককে সুরক্ষা দেবে; প্রতিশোধ নয়, বিচারকে রাজনৈতিক সংস্কৃতির ভিত্তি করবে।
ভিন্ন মতের মানুষকে হারাতে হবে ভোটে, যুক্তিতে ও আইনের মাধ্যমে।
মব বানিয়ে নয়।