উদ্যোক্তা হওয়ার পথে বড় বাধা ব্যর্থতার ভয়

এআই ও ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহার করে নতুন ব্যবসার পরিকল্পনা করছেন তরুণ জেন জেড উদ্যোক্তারা

ব্যবসা শুরু করা এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে সহজ। ওয়েবসাইট তৈরি, অনলাইন পেমেন্ট, ডিজিটাল মার্কেটিং কিংবা কনটেন্ট তৈরি—প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই প্রযুক্তি প্রবেশের বাধা কমিয়ে দিয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই সেই সুযোগ আরও বাড়িয়েছে।

কিন্তু উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ বাড়লেও মানুষের ঝুঁকি নেওয়ার আগ্রহ একই হারে বাড়ছে না। বরং ব্যর্থতার ভয় অনেক সম্ভাব্য উদ্যোক্তাকে পিছিয়ে দিচ্ছে।

গ্লোবাল এন্টারপ্রেনারশিপ মনিটরের (জিইএম) ২০২৪/২৫ গ্লোবাল রিপোর্টে এই বৈপরীত্য স্পষ্ট হয়েছে। ২০১৯ সালে ৫০টি অর্থনীতির মধ্যে ৩৪টিতে এমন অন্তত ৪০ শতাংশ মানুষ ছিলেন, যারা ভালো ব্যবসার সুযোগ দেখলেও ব্যর্থতার ভয়ে উদ্যোগ নিতে চাইতেন না। ২০২৪ সালে ৫১টি অর্থনীতির মধ্যে এমন দেশের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৪৩টিতে। অর্থাৎ অনুপাতটি ৬৮ শতাংশ থেকে বেড়ে ৮৪ শতাংশে পৌঁছেছে।

আরও বিস্তৃতভাবে দেখলে, ২০১৯ সালে জরিপে অংশ নেওয়া মানুষের ৪৪ শতাংশ বলেছিলেন, ব্যর্থতার আশঙ্কায় তারা ব্যবসা শুরু করবেন না। ২০২৪ সালে এই হার বেড়ে ৪৯ শতাংশ হয়েছে।

নতুন ব্যবসার প্রাথমিক অবকাঠামো তৈরির খরচ ও জটিলতা কমেছে। অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে দোকান খোলা যায়। ডিজিটাল পেমেন্টের মাধ্যমে গ্রাহকের কাছ থেকে অর্থ নেওয়া যায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে বিজ্ঞাপন দেওয়া যায়। ক্যানভা বা এ ধরনের টুল দিয়ে পেশাদার মানের ডিজাইন তৈরি করা সম্ভব।

এআই আরও একটি বড় পরিবর্তন এনেছে। আগে একটি ওয়েবসাইট বা সফটওয়্যার তৈরিতে প্রযুক্তিগত দক্ষতা ও আলাদা কর্মী প্রয়োজন হতো । এখন এআই অনেক কাজের প্রাথমিক ধাপ সহজ করে দিয়েছে। কোড লেখা, কনটেন্ট তৈরি, বাজার বিশ্লেষণ কিংবা গ্রাহকের প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার মতো কাজেও ছোট উদ্যোক্তারা এআই ব্যবহার করতে পারছেন।

তবে প্রযুক্তি প্রবেশের বাধা কমালেও ব্যবসার মৌলিক ঝুঁকি দূর করেনি। বাজারে চাহিদা থাকবে কি না, নগদ অর্থের প্রবাহ ঠিক থাকবে কি না, প্রতিযোগীর সঙ্গে টিকে থাকা যাবে কি না—এসব প্রশ্ন এখনো আছে।

যুক্তরাজ্যের সাম্প্রতিক একটি জরিপে তরুণদের উদ্যোক্তা হওয়ার আগ্রহের চিত্রও স্পষ্ট হয়েছে। ব্লক-এর জন্য পাবলিক ফার্স্ট  পরিচালিত ২০২৫ সালের জরিপে দেখা যায়, ১৮ থেকে ৩৪ বছর বয়সী ব্রিটিশদের ৬৭ শতাংশ নিজের ব্যবসা শুরু করার বিষয়ে আগ্রহী বা তা বিবেচনা করছেন। একই বয়সী প্রায় ৩৮ শতাংশ ইতোমধ্যে ব্যবসা বা সাইড-হাসল শুরু করেছেন।

অর্থাৎ তরুণদের কাছে উদ্যোক্তা হওয়া এখন আর শুধু পূর্ণকালীন চাকরি ছেড়ে ব্যবসায় নামার বিষয় নয়। চাকরির পাশাপাশি ছোট ব্যবসা, ফ্রিল্যান্সিং কিংবা অনলাইন উদ্যোগও উদ্যোক্তা হওয়ার নতুন পথ তৈরি করছে।

লিংকডইন-এর ২০২৫ সালের গবেষণাতেও উদ্যোক্তা পরিচয়ের বিস্তারের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। যুক্তরাষ্ট্রে লিংকডইন সদস্যদের মধ্যে নিজেদের প্রোফাইলে ‘ফাউন্ডার’ পরিচয় যোগ করার হার এক বছরে ৬৯ শতাংশ বেড়েছে। গবেষণায় এআই ও প্রযুক্তিকে ছোট ব্যবসা তৈরির গতি বাড়ানোর অন্যতম চালিকা শক্তি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

সমস্যাটি শুধু ব্যবসা ব্যর্থ হওয়ার আর্থিক ঝুঁকিতে সীমাবদ্ধ নয়। সামাজিক পরিচয়ও এখানে গুরুত্বপূর্ণ।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে ব্যক্তিগত সাফল্য প্রকাশ্য হয়ে গেছে। একজন তরুণ উদ্যোক্তা তার নতুন ব্যবসা, আয়, জীবনযাপন কিংবা সাফল্যের গল্প প্রতিদিন তুলে ধরতে পারেন। ফলে সাফল্যের একটি নির্দিষ্ট ছবি তৈরি হয়।

কিন্তু ব্যর্থতার গল্প তুলনামূলকভাবে কম দেখা যায়।

কেউ ব্যবসা বন্ধ করলে সেটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ নাও করতে পারেন। ফলে অন্যদের চোখে মনে হতে পারে, সবাই এগিয়ে যাচ্ছে। শুধু তিনিই পিছিয়ে আছেন।

এখানেই তৈরি হয় এক ধরনের মানসিক চাপ। উদ্যোক্তার প্রথম ব্যর্থতাকে তখন ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা হিসেবে না দেখে ব্যক্তিগত অযোগ্যতার প্রমাণ মনে হতে পারে।

মনোবিজ্ঞানী ও নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক জোনাথন হেইড্ট তাঁর দ্য অ্যাংকশাস জেনারেশন বইয়ে শিশু-কিশোরদের বেড়ে ওঠায় স্মার্টফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব নিয়ে আলোচনা করেছেন। তাঁর মূল যুক্তি হলো, খেলাধুলা ও সরাসরি সামাজিক যোগাযোগনির্ভর শৈশবের জায়গা অনেকাংশে ফোননির্ভর শৈশব নিয়েছে।

তবে এখান থেকে সরাসরি বলা ঠিক হবে না যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমই জেন জিদের ব্যর্থতার ভয় তৈরি করেছে। উদ্বেগ, আত্মবিশ্বাস, পারিবারিক পরিবেশ, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, শিক্ষাব্যবস্থা এবং কর্মসংস্থানের পরিস্থিতি—সবকিছুই এর সঙ্গে যুক্ত হতে পারে।

তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের একটি প্রভাব অস্বীকার করা কঠিন। এখানে মানুষ অন্যের জীবনের সম্পাদিত ও সাফল্যকেন্দ্রিক সংস্করণ বেশি দেখে। এতে নিজের অবস্থাকে অন্যের সঙ্গে তুলনা করার প্রবণতা বাড়তে পারে।

উদ্যোক্তা হওয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা হলো—ব্যবসার ফলাফল কখনো পুরোপুরি পূর্বানুমান করা যায় না।

একটি ভালো ধারণাও ব্যর্থ হতে পারে। আবার প্রথম উদ্যোগ ব্যর্থ হওয়ার পর দ্বিতীয় উদ্যোগ সফল হতে পারে। বাজারের পরিবর্তন, ভুল সময়, ভুল মূল্য নির্ধারণ, নগদ অর্থের সংকট কিংবা ব্যবস্থাপনার ভুল—অনেক কারণেই একটি ব্যবসা টিকতে পারে না।

জিইএম-এর গবেষণায় একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে এসেছে। ব্যবসা থেকে বেরিয়ে আসা উদ্যোক্তারা অনেক অর্থনীতিতে পরবর্তীতে আবার ব্যবসা শুরু করার ব্যাপারে অন্যদের তুলনায় বেশি আগ্রহী। অর্থাৎ একটি উদ্যোগ থেকে বেরিয়ে আসা সবসময় উদ্যোক্তা জীবনের সমাপ্তি নয়।

এটি ব্যর্থতাকে নতুনভাবে দেখার সুযোগ দেয়।

ব্যর্থতা মানেই ‘আমি পারিনি’—এমন নয়। বরং প্রশ্ন হতে পারে, ‘কোন অনুমানটি ভুল ছিল?’

এই পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ। প্রথম ধারণা ব্যর্থ হলে উদ্যোক্তা নিজের পরিচয়কে ব্যর্থ না ভেবে ব্যবসায়িক ধারণাটিকে পরীক্ষা করা একটি অনুমান হিসেবে দেখতে পারেন।

ব্যর্থতার ভয় কমাতে তরুণদের শুধু মানসিকভাবে শক্ত হওয়ার পরামর্শ যথেষ্ট নয়। ব্যবসা শুরু করার বাস্তব ঝুঁকিও কমাতে হবে।

জিইএম তাদের প্রতিবেদনে আর্থিক সহায়তা, সহজলভ্য প্রশিক্ষণ, মেন্টরশিপ এবং সহজতর নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।

বিশেষ করে তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য ছোট পরিসরে ব্যবসা পরীক্ষা করার সুযোগ গুরুত্বপূর্ণ। সব উদ্যোক্তাকে শুরুতেই বড় বিনিয়োগ করতে হবে—এমন ধারণা ঝুঁকি বাড়ায়।

এর বদলে ছোট পরিসরে পণ্য পরীক্ষা, গ্রাহকের প্রতিক্রিয়া নেওয়া এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবসার মডেল পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি করা যেতে পারে।

এআইও এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে জিইএম-এর তথ্য বলছে, অনেক প্রাথমিক পর্যায়ের উদ্যোক্তা এখনো তাদের ব্যবসায় এআইয়ের গুরুত্ব সম্পর্কে পুরোপুরি নিশ্চিত নন। ৪৯টি অর্থনীতির মধ্যে ৩৬টিতে ৩০ শতাংশেরও কম প্রাথমিক পর্যায়ের উদ্যোক্তা বলেছেন, আগামী তিন বছরে তাদের ব্যবসায়িক কৌশলে এআই ‘খুব গুরুত্বপূর্ণ’ হবে।

অর্থাৎ প্রযুক্তি হাতে থাকলেই হবে না। সেটি কীভাবে ব্যবসার বাস্তব সমস্যার সমাধানে ব্যবহার করা যায়, সেই দক্ষতাও প্রয়োজন।

জেন জি এমন এক সময়ে কর্মজীবনে প্রবেশ করছে, যখন প্রযুক্তি একই সঙ্গে সুযোগ এবং অনিশ্চয়তা তৈরি করছে।

এআই অনেক কাজ সহজ করছে। একই সঙ্গে কিছু কাজের ধরন বদলে দিচ্ছে। প্রচলিত চাকরির নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে। অন্যদিকে উদ্যোক্তা হওয়ার প্রবেশপথও সহজ হচ্ছে।

এই বাস্তবতায় উদ্যোক্তা হওয়া হয়তো সবার জন্য প্রয়োজনীয় পথ নয়। কিন্তু নিজের দক্ষতাকে পণ্য বা সেবায় রূপ দেওয়ার সক্ষমতা ভবিষ্যৎ কর্মজীবনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

সেখানে সবচেয়ে বড় বাধা হয়তো প্রযুক্তির অভাব নয়। বরং ভুল করার ভয়।

কারণ ব্যবসা শুরু করার প্রযুক্তি এখন অনেকের হাতেই আছে। কিন্তু প্রথম উদ্যোগটি ব্যর্থ হলে আবার শুরু করার মানসিকতা এবং সেই ব্যর্থতা থেকে শেখার সুযোগ সবার নেই।

ভবিষ্যতের উদ্যোক্তা প্রজন্মের সাফল্য তাই শুধু কে কত দ্রুত ব্যবসা শুরু করতে পারে, তার ওপর নির্ভর করবে না। বরং কে ব্যর্থতাকে ব্যক্তিগত পরাজয় না ভেবে শেখার অংশ হিসেবে নিতে পারে, সেটিও বড় পার্থক্য তৈরি করবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *