শিশুদের স্থূলতা বাড়ছে, অপুষ্টির সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে নতুন স্বাস্থ্যঝুঁকি

ইন্দোনেশিয়ার ১৫ বছর বয়সী কিশোরী ইন্তান পেরমাতাসারি, যিনি স্থূলতার কারণে স্কুলে উপহাস ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতার শিকার হয়েছেন।

একসময় উন্নয়নশীল বিশ্বের শিশুস্বাস্থ্যের প্রধান উদ্বেগ ছিল ক্ষুধা ও অপুষ্টি। এখন সেই সংকটের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরেক বিপদ—অতিরিক্ত ওজন ও স্থূলতা। একই দেশ, একই পরিবার এমনকি একই শিশুর জীবনে অপুষ্টি ও স্থূলতা পাশাপাশি দেখা যাচ্ছে। জনস্বাস্থ্যের ভাষায় এটি ‘ডাবল বার্ডেন অব ম্যালনিউট্রিশন’ বা অপুষ্টির দ্বৈত বোঝা।

ইন্দোনেশিয়ার বগর শহরের ১৫ বছর বয়সী ইন্তান পেরমাতাসারির গল্প এই পরিবর্তনের কঠিন বাস্তবতা তুলে ধরে। চার বছর বয়সেই তার শরীরের আকার এত দ্রুত বাড়তে থাকে যে স্কুলের কোনো ইউনিফর্মই ঠিকমতো হতো না। পরিবারের সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেও খাবারের আবদার ফিরিয়ে দেওয়া কঠিন ছিল।

বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তার ওজনও বাড়তে থাকে। স্কুলে শুরু হয় উপহাস ও নিপীড়ন। সহপাঠীরা তাকে নিয়ে ব্যঙ্গ করত, চিমটি কাটত, টাকা চুরি করত এবং বই ছুড়ে মারত। শেষ পর্যন্ত ১২ বছর বয়সে স্কুল ছাড়তে বাধ্য হন ইন্তান।

তারপর দীর্ঘ সময় তিনি ঘরের মধ্যেই নিজেকে আটকে রাখেন। বাইরে বের হওয়ার ক্ষেত্রেও তৈরি হয় ভয় ও সংকোচ। স্থূলতা তার জন্য শুধু শারীরিক সমস্যা হয়ে থাকেনি। এটি তার শিক্ষা, সামাজিক জীবন ও মানসিক সুস্থতার ওপরও গভীর প্রভাব ফেলেছে। ইন্তানের ঘটনা সম্প্রতি রয়টার্সের একটি বিশেষ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য বলছে, শিশুদের অতিরিক্ত ওজন ও স্থূলতা এখন আর উচ্চ আয়ের দেশগুলোর সমস্যা নয়। নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতেও এটি দ্রুত বাড়ছে। বিশেষ করে শহরাঞ্চলে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক।

১৯৯০ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে ৫ থেকে ১৯ বছর বয়সী শিশু ও কিশোরদের বৈশ্বিক স্থূলতার হার চার গুণ বেড়েছে। ২০২২ সালে এই বয়সী প্রায় ৩৯ কোটি শিশু ও কিশোর অতিরিক্ত ওজনের মধ্যে ছিল। তাদের প্রায় ১৬ কোটি স্থূলতায় আক্রান্ত ছিল।

আরও উদ্বেগজনক পরিবর্তন দেখা গেছে ২০২৫ সালে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবে, ওই বছর বিশ্বে স্কুলপড়ুয়া শিশু ও কিশোরদের প্রায় ১০ শতাংশ, অর্থাৎ ১৮ কোটি ৮০ লাখ, স্থূলতায় আক্রান্ত ছিল। প্রথমবারের মতো এই সংখ্যা কম ওজনের শিশুদের সংখ্যাকে ছাড়িয়ে যায়।

এটি বিশ্বজুড়ে পুষ্টি পরিস্থিতির একটি বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত।

এই পরিবর্তনের অর্থ এই নয় যে উন্নয়নশীল দেশগুলো ক্ষুধা ও অপুষ্টির সমস্যা থেকে বেরিয়ে গেছে। বরং অনেক দেশে পুরোনো সমস্যা থেকেই গেছে। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নতুন সমস্যা।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, অনেক নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশে একই সঙ্গে অপুষ্টি এবং অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতা দেখা যাচ্ছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে একই পরিবারেও একজন শিশু অপুষ্টিতে ভুগছে, অন্যজন অতিরিক্ত ওজনের সমস্যায় আক্রান্ত।

এ পরিস্থিতিকে ‘ডাবল বার্ডেন’ বলা হয়।

এর পেছনে রয়েছে খাদ্যাভ্যাসের দ্রুত পরিবর্তন। একদিকে দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর শিশু পর্যাপ্ত পুষ্টি পাচ্ছে না। অন্যদিকে বাজারে সহজলভ্য হচ্ছে বেশি চিনি, লবণ ও চর্বিযুক্ত সস্তা প্রক্রিয়াজাত খাবার। এসব খাবারে ক্যালরি বেশি হলেও প্রয়োজনীয় পুষ্টি তুলনামূলক কম। শারীরিক পরিশ্রম ও সক্রিয়তার সুযোগ কমে যাওয়াও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে।

ইন্দোনেশিয়ার মতো দ্রুত পরিবর্তনশীল অর্থনীতির দেশগুলোতে এই রূপান্তর স্পষ্ট। গত দুই দশকে দেশটির অপুষ্টির পরিস্থিতিতে উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে। একই সময়ে খাদ্যব্যবস্থা ও জীবনযাত্রায় বড় পরিবর্তন এসেছে।

বগরের শ্রমজীবী এলাকায় বড় হওয়া ইন্তানের খাবারের তালিকায় ছিল ভাজা সয়াবিনের খাবার, নারকেল দিয়ে রান্না করা মুরগি এবং চিনিযুক্ত নাস্তা। পরিবারের কাছে এগুলো ছিল তুলনামূলক সহজলভ্য খাবার।

সমস্যাটি শুধু একটি পরিবারের খাদ্য পছন্দের নয়। খাদ্যের দাম, বাজারে কোন খাবার বেশি পাওয়া যায়, বিজ্ঞাপন, শহুরে জীবনযাপন এবং শারীরিক সক্রিয়তার সুযোগ—সবকিছু মিলে শিশুর খাদ্যাভ্যাস তৈরি হয়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও বলছে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও দ্রুত নগরায়ণের সঙ্গে জীবনযাত্রায় পরিবর্তন এসেছে। একই সঙ্গে বেড়েছে অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস ও শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা। এই অঞ্চলে অপুষ্টি ও ক্ষুদ্রপুষ্টির ঘাটতির পাশাপাশি এখন অতিপুষ্টির সমস্যাও বাড়ছে।

শিশুদের স্থূলতা ভবিষ্যৎ স্বাস্থ্যের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে। অতিরিক্ত ওজনের শিশুর প্রাপ্তবয়স্ক অবস্থায় স্থূল থাকার সম্ভাবনা বেশি। তাদের অল্প বয়সে ডায়াবেটিস ও হৃদ্‌রোগসহ বিভিন্ন অসংক্রামক রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিও বাড়ে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয় মানসিক ও সামাজিক ক্ষতি।

ইন্তানের ক্ষেত্রে সহপাঠীদের নির্যাতন তার স্কুলজীবন থামিয়ে দিয়েছিল। দীর্ঘদিন সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন থাকার অভিজ্ঞতাও তৈরি হয়। অর্থাৎ স্থূলতার প্রভাব কেবল চিকিৎসকের চেম্বারে মাপা ওজন দিয়ে বোঝা যায় না। এর প্রভাব শিক্ষা, আত্মবিশ্বাস, সামাজিক সম্পর্ক ও ভবিষ্যৎ কর্মজীবন পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।

স্থূলতার চিকিৎসায় সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ওজন কমানোর বিভিন্ন ওষুধ নিয়ে বড় অগ্রগতি হয়েছে। কিন্তু এসব চিকিৎসা নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশের অধিকাংশ পরিবারের নাগালের বাইরে।

ইন্দোনেশিয়ার চিকিৎসক ড. যোগ দেবায়েরা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, তার দেখা শিশু রোগীদের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ স্থূল। তবে অনেক ক্ষেত্রেই চিকিৎসা শুরু হয় তখনই, যখন শিশুর স্থূলতার সঙ্গে গুরুতর অসুস্থতা বা অন্য কোনো জটিলতা যুক্ত হয়।

ইন্তানের চিকিৎসায় গত বছর ওজন কমানোর ওষুধের খরচও চিকিৎসককে নিজে বহন করতে হয়েছিল। তার পরিবারের পক্ষে এই ব্যয় বহন করা সম্ভব ছিল না।

এখানেই বৈশ্বিক স্বাস্থ্যব্যবস্থার বড় বৈষম্যটি স্পষ্ট হয়। উন্নত দেশে যে চিকিৎসা সহজে পাওয়া যায়, দরিদ্র পরিবারের শিশুর জন্য সেটিই হয়ে উঠতে পারে প্রায় অসম্ভব একটি ব্যয়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, শিশুদের স্থূলতা মূলত প্রতিরোধযোগ্য। তাই চিকিৎসার পাশাপাশি খাদ্যপরিবেশ বদলানো জরুরি।

২০২৬ সালের জানুয়ারিতে WHO স্কুলে স্বাস্থ্যকর খাদ্য পরিবেশ তৈরির জন্য নতুন বৈশ্বিক নির্দেশনা প্রকাশ করেছে। সংস্থাটি বলেছে, স্কুলে শুধু স্বাস্থ্যকর খাবার সরবরাহ করাই যথেষ্ট নয়। পুরো স্কুল পরিবেশকেই স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের পক্ষে তৈরি করতে হবে।

এর অর্থ হতে পারে স্কুলে স্বাস্থ্যকর খাবারের সহজলভ্যতা বাড়ানো। একই সঙ্গে উচ্চ চিনি, লবণ ও চর্বিযুক্ত খাবারের বিপণন নিয়ন্ত্রণ করা। শিশুদের নিয়মিত শারীরিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ তৈরি করাও জরুরি।

শিশুদের স্থূলতাকে শুধু ব্যক্তিগত নিয়ন্ত্রণের ব্যর্থতা হিসেবে দেখলে সমস্যার বড় অংশই অদৃশ্য থেকে যায়। কারণ একটি শিশু কী খাবে, কতটা নড়াচড়া করবে এবং কোন খাবার তার সামনে বারবার হাজির হবে—এসব সিদ্ধান্ত সবসময় তার নিজের হাতে থাকে না।

এই বৈশ্বিক পরিবর্তন বাংলাদেশের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশে অপুষ্টি, খর্বাকৃতি ও ক্ষুদ্রপুষ্টির ঘাটতি এখনো জনস্বাস্থ্যের গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা। একই সঙ্গে নগরায়ণ, খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন এবং প্রক্রিয়াজাত খাবারের বিস্তার নতুন ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে।

ফলে শিশু পুষ্টির নীতি শুধু ‘শিশু কম খাচ্ছে কি না’—এই প্রশ্নে সীমাবদ্ধ রাখার সুযোগ নেই। শিশুটি কী খাচ্ছে, খাবারটি কতটা পুষ্টিকর, কতটা প্রক্রিয়াজাত এবং তার দৈনন্দিন জীবন কতটা সক্রিয়—এসব প্রশ্নও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ভাষায়, অপুষ্টি ও স্থূলতা এখন একই সমস্যার দুই দিক।

ইন্তানের গল্প তাই শুধু ইন্দোনেশিয়ার কোনো এক কিশোরীর গল্প নয়। এটি এমন এক বৈশ্বিক পরিবর্তনের প্রতিচ্ছবি, যেখানে ক্ষুধা থেকে বেরিয়ে আসা সমাজও ভুল খাদ্যব্যবস্থার কারণে নতুন স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছে।

শিশুদের জন্য ভবিষ্যতের লড়াই তাই শুধু ক্ষুধার বিরুদ্ধে নয়। একই সঙ্গে লড়তে হবে এমন এক খাদ্যব্যবস্থার বিরুদ্ধে, যেখানে সস্তা খাবার সহজলভ্য হলেও স্বাস্থ্যকর খাবার সবার নাগালে থাকে না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *