ঢাবিতে পাহাড়ের সংস্কৃতি তুলে ধরছে জুম সংসদ

Mro film

টিএসসির ইনডোর গেমস রুম। সাধারণত এই প্রাঙ্গণে শোনা যায় মূলধারার বাংলা গানের আওয়াজ, রাজনৈতিক স্লোগান বা আড্ডার কোলাহল। কিন্তু রোববার (২৩শে আগস্ট) সেখানে শোনা গেল এক সম্পূর্ণ ভিন্ন ভাষার সুর। দেখা গেল ম্রো জনগোষ্ঠীর লোককথা।

এই আয়োজনটি কেবল সিনেমা প্রদর্শনীর মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; এটি ছিল এক ধরনের সাংস্কৃতিক আত্মনিশ্চয়তা, যেখানে প্রান্তিক থেকে উঠে আসা কণ্ঠস্বর নিজেই নিজের গল্প বলার অধিকার প্রতিষ্ঠা করছিল।”

বাংলাদেশের জাতীয় বয়ানে পাহাড় প্রায়ই কেবল একটি ‘ভৌগোলিক প্রেক্ষাপট’ বা পর্যটনের জায়গা হিসেবেই উপস্থাপিত হয়। সেখানকার মানুষ, তাদের ভাষা, তাদের লোকজ ঐতিহ্য প্রায়শই মূলধারার ইতিহাসের পাতা থেকে মুছে যায় বা কেবল ‘ফোকলোর’ বা নৃতাত্ত্বিক কৌতূহল হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকে। এই যে দৃশ্যমানতার সংকট, এর বিরুদ্ধেই ২০১৭ সাল থেকে নিরলস লড়াই করছে ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় জুম সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সংসদ’।

আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস উপলক্ষে জুম সংসদ শুরু করেছে নিয়মিত আয়োজন ‘ওয়াং, শুনতা সাংচিয়া কম্’  বাংলায় যার অর্থ, ‘এসো, গল্পটা জানি’।  এই শিরোনামটিই যথেষ্ট। কারণ ইতিহাস জুড়ে আদিবাসী সম্প্রদায়ের গল্প প্রায়ই অন্যের লেখা ইতিহাসের বইয়ে বন্দি থাকে। কিন্তু যখন তারা নিজেই মাইক্রোফোন হাতে নেয়, তখন বয়ান বদলে যায়।

এর প্রথম পর্বের বিষয় ছিল ‘চলচ্চিত্রের পর্দায় ম্রো জীবন, ভাষা ও সংস্কৃতির গল্প’। এই আয়োজনে প্রদর্শিত হয় এবিএম নাজমুল হুদা পরিচালিত দুটি স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র—’ম্রো রূপকথা’ ও ‘পরিণাম’।

‘ম্রো রূপকথা’ শুধু একটি সিনেমা নয়। এটি ইয়াংঙান ম্রোর মতো একজন মানুষের নিজ মাতৃভাষায় প্রথম সাহিত্যগ্রন্থ প্রকাশের যে সংগ্রাম, তার চলমান দলিল। এটি দেখায়, কীভাবে একটি লিখিত ভাষার অনুপস্থিতি একটি সম্প্রদায়কে প্রান্তিক করে রাখে, এবং সেই ভাষাকে লিপিবদ্ধ করার লড়াই কতটা মরণপণ।

অন্যদিকে ‘পরিণাম’ বাংলা ভাষার বাইরে অন্য ভাষায় নির্মিত প্রথম অ্যানিমেটেড চলচ্চিত্র । ম্রো জনগোষ্ঠীর প্রচলিত একটি রূপকথার গল্প অবলম্বনে চলচ্চিত্রটি নির্মিত। এতে মানুষের কর্মের ফল এবং প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো বিশাল ও প্রতিযোগিতাপূর্ণ প্রাঙ্গণে মূলধারার সাংস্কৃতিক বয়ানটি প্রায়শই একরৈখিক বা প্রাধান্য বিস্তারকারী মনে হতে পারে, যেখানে সংখ্যালঘু কণ্ঠস্বরগুলো সহজেই হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে থাকে। কিন্তু জুম সংসদের মতো উদ্যোগ ঠিক এই ফাটল ধরা জায়গাগুলোতেই সেতুবন্ধন তৈরি করছে। যা এই প্রাঙ্গণকে প্রকৃত অর্থে বহুত্ববাদী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করে তোলার একটি সক্রিয় প্রচেষ্টা।

সংগঠনটির ‘জুম ম্যাগাজিন’ প্রকাশনা এর একটি জ্বলন্ত উদাহরণ। এটি কেবল অভ্যন্তরীণ সংরক্ষণাগার নয়। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা নিজেদের ইতিহাস, সমসাময়িক সংকট এবং গবেষণা নিজেরাই লিপিবদ্ধ করতে পারছে। গান, নাচ, আবৃত্তি বা বিতর্কের মাধ্যমে তারা কেবল সাংস্কৃতিক চর্চাই করছে না, বরং নেতৃত্ব ও যোগাযোগ দক্ষতারও বিকাশ ঘটাচ্ছে, যা ভবিষ্যতে তাদের নিজস্ব সম্প্রদায়ের পক্ষে কথা বলার ক্ষমতা যোগাবে।

জুম সংসদের কার্যক্রমে দুটি সমান্তরাল ও গুরুত্বপূর্ণ প্রবণতা স্পষ্ট।

একদিকে, এটি আদিবাসী শিক্ষার্থীদের তাদের শেকড়ের সাথে যুক্ত রেখে, নিজেদের ভাষা ও সংস্কৃতি সংরক্ষণের চেষ্টা করছে।

অন্যদিকে, এটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বহুত্ববাদী সাংস্কৃতিক পরিসরে পাহাড়ের বৈচিত্র্যকে দৃশ্যমান করার এক সেতুবন্ধন। এটি মূলধারাকে মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, বাংলাদেশের সংস্কৃতি কেবল একরৈখিক নয়, এটি বহুরৈখিক। পার্বত্য অঞ্চলের সামাজিক উৎসব বা ভাষা বৈচিত্র্য উৎসব যখন ক্যাম্পাসে পালিত হয়, তখন তা মূলধারার শিক্ষার্থীদের মধ্যেও এক ধরনের সাংস্কৃতিক সংবেদনশীলতা তৈরি করে।

যতদিন পর্যন্ত না ম্রো, চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা বা গারো ভাষার গল্পগুলো আমাদের জাতীয় সাহিত্য ও সংস্কৃতির মূল স্রোতধারায় স্বাভাবিক অংশ হিসেবে গৃহীত হবে, ততদিন পর্যন্ত জুম সংসদের মতো উদ্যোগগুলো কেবল গুরুত্বপূর্ণই থাকবে না, বরং অপরিহার্যও থাকবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *