বাংলাদেশ-নাইজেরিয়ার নৌ সহযোগিতায় খুলছে নতুন দুয়ার

বাংলাদেশ ও নাইজেরিয়ার মধ্যে নৌ ও সামুদ্রিক নিরাপত্তা সহযোগিতা আরও গভীর করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দুই দেশের মধ্যে সমুদ্র নিরাপত্তা, পেশাগত প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি বিনিময়, নৌ জাহাজ নির্মাণ এবং প্রতিরক্ষা শিল্পের সক্ষমতা বাড়ানোর মতো পাঁচটি ক্ষেত্রে সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

আবুজায় নাইজেরিয়ার নৌবাহিনী প্রধান ভাইস অ্যাডমিরাল ইদি আব্বাসের সঙ্গে বাংলাদেশের হাইকমিশনার মিয়া মো. মাইনুল কবিরের এক বৈঠকে এসব বিষয় উঠে আসে। নাইজেরিয়ার নৌবাহিনীর পরিচালক, নেভাল ইনফরমেশন ক্যাপ্টেন আবিওডুন ফোলোরুনশোর বিবৃতির বরাত দিয়ে দেশটির সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান নাইজেরিয়া এ তথ্য জানিয়েছে।

বৈঠকে মিয়া মো. মাইনুল কবির বাংলাদেশ ও নাইজেরিয়ার দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে আরও বাস্তবভিত্তিক সহযোগিতায় রূপ দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন। বিশেষ করে সামুদ্রিক নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা খাতে দুই দেশের নৌবাহিনীর মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন ।

আলোচনার মূল ক্ষেত্রগুলো ছিল সমুদ্র নিরাপত্তা, পেশাগত প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি বিনিময়, নৌ জাহাজ নির্মাণ এবং নিজস্ব প্রতিরক্ষা শিল্পের বিকাশ। তবে এখন পর্যন্ত এসব বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিরক্ষা চুক্তি বা নৌ-জোট গঠনের ঘোষণা আসেনি। বরং বৈঠকটি ভবিষ্যৎ সহযোগিতার সম্ভাব্য ক্ষেত্র নির্ধারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

নাইজেরিয়া দীর্ঘদিন ধরে গালফ অব গিনিতে জলদস্যুতা ও অন্যান্য সামুদ্রিক অপরাধ মোকাবিলা করছে। দেশটির নৌবাহিনী প্রধান বৈঠকে এই অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন।

তার মতে, এই অভিজ্ঞতা বাংলাদেশ ও নাইজেরিয়ার নৌবাহিনীর মধ্যে প্রশিক্ষণ, পেশাগত বিনিময় এবং পারস্পরিক শিক্ষার সুযোগ তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে সীমান্ত অতিক্রমকারী সামুদ্রিক অপরাধ মোকাবিলায় বিভিন্ন দেশের নৌবাহিনীর মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।

নাইজেরিয়ার বহুপাক্ষিক সামুদ্রিক নিরাপত্তা উদ্যোগে অংশগ্রহণের অভিজ্ঞতাও আলোচনায় আসে। বিশেষ করে কম্বাইন্ড মেরিটাইম টাস্ক ফোর্স -এর সঙ্গে দেশটির সম্পৃক্ততার কথা উল্লেখ করা হয়। নাইজেরিয়ার নৌবাহিনী মনে করে, এ ধরনের বহুপাক্ষিক কাঠামো থেকে বাংলাদেশও সামুদ্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতা নিতে পারে।

বৈঠকের একটি উল্লেখযোগ্য দিক ছিল বাংলাদেশের পোশাকশিল্প নিয়ে নাইজেরিয়ার আগ্রহ।

নাইজেরিয়ার নৌবাহিনী সামরিক পোশাকের স্থানীয় উৎপাদন বাড়াতে বাংলাদেশের গার্মেন্টস শিল্পের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করেছে। এর মাধ্যমে দেশটির নিজস্ব প্রতিরক্ষা শিল্পে স্থানীয় উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।

বাংলাদেশের জন্যও এটি গুরুত্বপূর্ণ। তৈরি পোশাক খাতে দীর্ঘদিনের উৎপাদন ও রপ্তানি অভিজ্ঞতা এখন প্রতিরক্ষা-সংশ্লিষ্ট উৎপাদন ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্রে কাজে লাগানোর সুযোগ তৈরি করতে পারে।

নৌ জাহাজ নির্মাণেও দুই দেশের মধ্যে কারিগরি সহযোগিতার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। বাংলাদেশের নৌ জাহাজ নির্মাণ সক্ষমতা গত এক দশকে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলো এখন বিভিন্ন ধরনের সামরিক ও টহল জাহাজ নির্মাণে সক্ষমতা অর্জন করেছে।

অন্যদিকে নাইজেরিয়ারও নিজস্ব নৌ জাহাজ নির্মাণ সক্ষমতা বাড়ানোর লক্ষ্য রয়েছে। ফলে দুই দেশের মধ্যে প্রযুক্তিগত জ্ঞান, প্রশিক্ষণ এবং জাহাজ নির্মাণ-সংক্রান্ত অভিজ্ঞতা বিনিময় ভবিষ্যতে বাস্তব সহযোগিতায় রূপ নিতে পারে।

বাংলাদেশ ও নাইজেরিয়ার নৌবাহিনীর মধ্যে জাহাজ নির্মাণের একটি পরোক্ষ যোগসূত্র অবশ্য আগেও ছিল। দুই দেশের নৌবাহিনী চীনের তৈরি Type 056-এর রপ্তানি সংস্করণ ব্যবহার করে। বাংলাদেশ ব্যবহার করে C13B শ্রেণির করভেট এবং নাইজেরিয়া P18N শ্রেণির অফশোর প্যাট্রল ভেসেল।

তবে এবারের আলোচনার লক্ষ্য চীনা জাহাজের অভিজ্ঞতা ভাগাভাগি নয়। বরং দুই দেশের নিজস্ব প্রতিরক্ষা শিল্প ও জাহাজ নির্মাণ সক্ষমতা কীভাবে আরও শক্তিশালী করা যায়, সেটিই আলোচনার কেন্দ্রে ছিল।

বাংলাদেশের সামুদ্রিক নিরাপত্তার পরিধি শুধু নিজস্ব উপকূলীয় জলসীমায় সীমাবদ্ধ নয়। বঙ্গোপসাগরের নিরাপত্তা, আন্তঃদেশীয় অপরাধ, অবৈধ চলাচল এবং আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা ইস্যু।

নাইজেরিয়ার অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য বিশেষভাবে মূল্যবান হতে পারে। কারণ গালফ অব গিনি ও বঙ্গোপসাগরের ভৌগোলিক বাস্তবতা ভিন্ন হলেও সামুদ্রিক অপরাধের অনেক ধরন সীমান্ত অতিক্রম করে পরিচালিত হয়।

অন্যদিকে নাইজেরিয়ার জন্য বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা ভিন্ন ধরনের মূল্য বহন করতে পারে। তৈরি পোশাক শিল্প, জনবল উন্নয়ন এবং সীমিত সম্পদে প্রতিরক্ষা সক্ষমতা তৈরির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা দেশটির কাজে লাগতে পারে।

বৈঠক শেষে নাইজেরিয়ার নৌবাহিনী প্রধানকে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। সফরটি হলে আলোচনাগুলোকে প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি বিনিময় এবং জাহাজ নির্মাণে সম্ভাব্য সহযোগিতার কাঠামো নিয়েও তখন আরও নির্দিষ্ট আলোচনা হতে পারে।

নাইজেরিয়ার নৌবাহিনীর ভাষ্য অনুযায়ী, বৈঠকটি আন্তর্জাতিক নৌবাহিনীগুলোর সঙ্গে টেকসই যোগাযোগের গুরুত্ব তুলে ধরেছে। এর লক্ষ্য সমুদ্র নিরাপত্তা জোরদার করা, পেশাগত ও কারিগরি সক্ষমতা বাড়ানো এবং নিজস্ব প্রতিরক্ষা শিল্পের বিকাশ ঘটানো।

এখন এই আলোচনা কতটা বাস্তব প্রকল্পে রূপ নেয়, সেটিই হবে পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *