নারীদের প্রতি এআই-নির্ভর অনলাইন সহিংসতা ঠেকাতে ‘ঢাকা ডায়ালগ’ গঠনের উদ্যোগ

এআই-নির্ভর নারী নির্যাতন মোকাবিলায় ঢাকা ডায়ালগ নিয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আলোচনা

নারীদের হয়রানি, মানহানি ও হুমকির মতো অনলাইন সহিংসতায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) ব্যবহার বাড়ছে। এই পরিস্থিতিতে এআই-নির্ভর সহিংসতা মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদারের উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ।

এ লক্ষ্যে বৃহস্পতিবার (১০ই সেপ্টেম্বর) ঢাকার প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁওয়ে মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ সভার আয়োজন করে।

সভায় মূলত এআই ব্যবহার করে নারীদের হয়রানি, মানহানি ও অনলাইনে ঝুঁকির মধ্যে ফেলার বিষয়টি গুরুত্ব পায়। বক্তারা বলেন, প্রযুক্তির পরিবর্তনের গতি অনেক ক্ষেত্রে বিদ্যমান আইন ও প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতার চেয়ে বেশি। ফলে আইন, তদন্ত, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং ভুক্তভোগীদের সহায়তার ক্ষেত্রে নতুন উদ্যোগ প্রয়োজন।

আলোচনাটি ‘ঢাকা ডায়ালগ’ প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়ার অংশ। ২০২৬ সালের ২০শে এপ্রিল আফ্রিকার ডাকারে অনুষ্ঠিত ১০ম আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা ফোরামে বাংলাদেশ এ উদ্যোগের কথা তুলে ধরে।

ঢাকা ডায়ালগের লক্ষ্য হলো এআই-নির্ভর অনলাইন সহিংসতা মোকাবিলায় বিভিন্ন দেশের মধ্যে অভিন্ন সংজ্ঞা, নীতিমালা, রাজনৈতিক মনোযোগ, আইনগত ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং তথ্য-প্রমাণের ঘাটতি কমানো। একই সঙ্গে সরকার, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান, জাতিসংঘ, নাগরিক সমাজ, শিক্ষাবিদ ও ভুক্তভোগীদের সংগঠনকে একটি প্ল্যাটফর্মে আনার পরিকল্পনা রয়েছে।

সভাটি সঞ্চালনা করেন পররাষ্ট্রসচিব আসাদ আলম সিয়াম। তিনি ঢাকা ডায়ালগের পাঁচটি প্রধান কার্যক্ষেত্র তুলে ধরেন।

প্রথমত, বিভিন্ন দেশের জন্য প্রতিরোধ, তদন্ত ও প্রতিকার বিষয়ে অভিন্ন ভাষা, মানদণ্ড এবং স্বেচ্ছামূলক নির্দেশিকা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হবে। এআই-নির্ভর সহিংসতার ঘটনা শনাক্ত ও তুলনা করার জন্য অভিন্ন সংজ্ঞা ও শ্রেণিবিন্যাসও তৈরি করা হবে।

দ্বিতীয়ত, প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মগুলোর জবাবদিহির জন্য কিছু মানদণ্ড তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে সিনথেটিক বা কৃত্রিমভাবে তৈরি কনটেন্টের স্বচ্ছতা, লেবেলিং এবং উৎস শনাক্ত করার ব্যবস্থা থাকবে।

তৃতীয়ত, বিষয়টি আন্তর্জাতিক নীতিনির্ধারণের আলোচনায় নিয়মিতভাবে রাখার উদ্যোগ নেওয়া হবে। এ জন্য উচ্চপর্যায়ের বৈঠক এবং রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান, মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের সমন্বয়ে রাজনৈতিক চ্যাম্পিয়নদের একটি নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার কথা বলা হয়েছে।

চতুর্থত, বিশেষ করে গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোকে আইন প্রণয়ন ও পর্যালোচনায় সহায়তা করা হবে। পুলিশ, প্রসিকিউটর ও বিচারকদের ডিজিটাল প্রমাণ এবং এআই ফরেনসিক বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়ার বিষয়টিও গুরুত্ব পাবে। ভুক্তভোগীদের জন্য হেল্পলাইন ও সহায়তা ব্যবস্থা শক্তিশালী করার পাশাপাশি সিনথেটিক কনটেন্ট শনাক্ত ও অপসারণের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।

তবে এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা এবং সংখ্যালঘুদের অধিকার যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেটিও নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে।

পঞ্চমত, সরকার, জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা, প্রযুক্তি কোম্পানি, নাগরিক সমাজ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং ভুক্তভোগী নেটওয়ার্ককে একসঙ্গে কাজ করার সুযোগ তৈরি করা হবে। এআই নির্মাতা ও প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মগুলোর কাছ থেকে ‘সেফটি-বাই-ডিজাইন’ নীতির ভিত্তিতে স্বেচ্ছামূলক অঙ্গীকার নেওয়ার উদ্যোগও থাকবে।

সভায় বক্তব্য দেন পররাষ্ট্রবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম, সমাজকল্যাণমন্ত্রী ফারজানা শারমিন পুতুল, আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান, সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার জাহরাত আদিব চৌধুরী এবং মায়ের ডাকের প্রতিষ্ঠাতা সংসদ সদস্য সানজিদা ইসলাম তুলি।

শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেন, ঢাকা ডায়ালগ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির সঙ্গে নারীদের অনলাইন নিরাপত্তার মতো দৈনন্দিন বাস্তবতার যোগসূত্র তৈরি হচ্ছে।

সমাজকল্যাণমন্ত্রী ফারজানা শারমিন পুতুল অনলাইন সহিংসতার শিকার ব্যক্তিদের সহায়তায় সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা ও পুনর্বাসনের গুরুত্ব তুলে ধরেন। তাঁর মতে, সহিংসতা যখন রাস্তায় সীমাবদ্ধ না থেকে অনলাইন পরিসরেও ছড়িয়ে পড়ে, তখন রাষ্ট্রীয় সহায়তার কাঠামোকেও সেই বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নিতে হবে।

আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান এআই-নির্ভর অপরাধ তদন্ত ও বিচারের ক্ষেত্রে বিদ্যমান আইনি ও প্রমাণসংক্রান্ত সীমাবদ্ধতার কথা বলেন। বিশেষ করে কোনো ছবি বা কণ্ঠস্বর কৃত্রিমভাবে তৈরি হলে সেটির মাধ্যমে সংঘটিত ক্ষতি আদালতে কীভাবে প্রমাণ করা হবে, তা একটি বড় চ্যালেঞ্জ বলে তিনি উল্লেখ করেন।

ব্যারিস্টার জাহরাত আদিব চৌধুরী প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর দায়িত্বের বিষয়টি তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্য, ক্ষতি হওয়ার পর নিরাপত্তা ব্যবস্থা যুক্ত করার বদলে প্রযুক্তি তৈরির শুরু থেকেই নিরাপত্তাকে নকশার অংশ করতে হবে। সিনথেটিক মিডিয়া সম্পর্কে স্বচ্ছতাকেও তিনি একটি মৌলিক প্রত্যাশা হিসেবে উল্লেখ করেন।

সানজিদা ইসলাম তুলি নিখোঁজ ব্যক্তিদের পরিবারের পাশে কাজ করার অভিজ্ঞতার সঙ্গে ডিজিটাল ও এআই-নির্ভর সহিংসতার শিকার ব্যক্তিদের সহায়তার বিষয়টি যুক্ত করেন। তিনি এমন প্রতিষ্ঠান ও ব্যবস্থা তৈরির আহ্বান জানান, যেখানে ভুক্তভোগীরা অভিযোগ জানানোর পরপরই বিশ্বাসযোগ্য সহায়তা পাবেন। একই সঙ্গে একাধিক দপ্তরে ঘুরতে হবে না—এমন কার্যকর হেল্পলাইন ও রিপোর্টিং ব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

পরে উন্মুক্ত আলোচনায় অংশ নেন বিভিন্ন খাতের প্রতিনিধিরা। তাঁরা আইনগত ঘাটতি, প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মের জবাবদিহি, সিনথেটিক কনটেন্ট মোকাবিলা এবং বিভিন্ন দেশে ভুক্তভোগীদের সহায়তার পদ্ধতি নিয়ে মতামত দেন।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, পরবর্তী ধাপে আগ্রহী কয়েকটি সদস্যরাষ্ট্রকে ‘ফ্রেন্ডস অব দ্য ডায়ালগ’ হিসেবে যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। একই সঙ্গে একটি কারিগরি ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠন করা হবে। এই গ্রুপ ঢাকা ডায়ালগের প্রথম রেফারেন্স ডকুমেন্ট তৈরির কাজ করবে।

ওই নথিতে এআই-নির্ভর সহিংসতার অভিন্ন সংজ্ঞা ও মানদণ্ড অন্তর্ভুক্ত থাকবে। ‘ফ্রেন্ডস অব দ্য ডায়ালগ’-এর সদস্যদের ঐকমত্যের ভিত্তিতে নথিটি গ্রহণের পরিকল্পনা রয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *