একটি বন্যপ্রাণী জব্দের ঘটনা হয়তো একটি দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে একটি মামলা। কিন্তু এর পেছনে থাকতে পারে সীমান্ত পেরোনো একটি দীর্ঘ পাচারপথ, অর্থদাতা, সংগঠক এবং একাধিক দেশের অপরাধী নেটওয়ার্ক। সেই নেটওয়ার্ক ভাঙতে শুধু প্রাণী উদ্ধার বা পাচারকারী গ্রেপ্তার যথেষ্ট নয়—প্রয়োজন দেশগুলোর মধ্যে গোয়েন্দা তথ্য, তদন্ত ও আইন প্রয়োগের ঘনিষ্ঠ সমন্বয়।
দক্ষিণ এশিয়ায় আন্তঃদেশীয় বন্যপ্রাণী অপরাধ মোকাবিলায় এমন আঞ্চলিক সহযোগিতা জোরদারের আহ্বান জানিয়েছেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু।
বৃহস্পতিবার (১০ই সেপ্টেম্বর) নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুতে দক্ষিণ এশিয়া বন্যপ্রাণী আইন প্রয়োগ নেটওয়ার্কের (এসএডব্লিউইএন) প্রথম সাধারণ পরিষদে বক্তব্যে তিনি বলেন, সীমান্ত, পরিবহন ব্যবস্থা, বাণিজ্যিক চ্যানেল, অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ও আর্থিক ব্যবস্থাকে ব্যবহার করে অপরাধী চক্র দক্ষিণ এশিয়ায় বন্যপ্রাণী পাচার চালাচ্ছে। তাই এই অপরাধের বিরুদ্ধে বিচ্ছিন্ন জাতীয় উদ্যোগের বদলে আঞ্চলিকভাবে সমন্বিত ব্যবস্থা প্রয়োজন।
বন্যপ্রাণী পাচারকে দীর্ঘদিন ধরে মূলত শিকার, অবৈধ পরিবহন ও জব্দের দৃষ্টিতে দেখা হয়েছে। কিন্তু মন্ত্রীর বক্তব্যে উঠে এসেছে অপরাধটির আরেকটি দিক—এর পেছনে থাকা সংগঠিত নেটওয়ার্ক।
আবদুল আউয়াল মিন্টুর মতে, একটি বন্যপ্রাণী জব্দ হওয়ার পর তদন্ত থেমে গেলে মূল অপরাধীরা অনেক সময় ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়। বরং প্রতিটি জব্দের ঘটনাকে একটি বড় অপরাধী নেটওয়ার্কের সন্ধান পাওয়ার সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করা উচিত। কোথা থেকে প্রাণীটি এসেছে, কোন পথে সেটি পরিবহন করা হয়েছে, কারা এর সঙ্গে যুক্ত, কে অর্থ দিয়েছে এবং কোথায় পাঠানোর কথা ছিল—তদন্তে এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
অর্থাৎ বন্যপ্রাণী পাচারকে শুধু পরিবেশগত অপরাধ হিসেবে নয়, সংঘবদ্ধ অপরাধ হিসেবেও দেখার প্রয়োজন রয়েছে বলে তাঁর বক্তব্যে উঠে এসেছে।
বন্যপ্রাণী অপরাধের পদ্ধতি বদলাচ্ছে। অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে পাচার বা অবৈধ বেচাকেনা পরিচালনার সম্ভাবনাও এখন আইন প্রয়োগকারী সংস্থার জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
এ কারণে অনলাইন মনিটরিং, সাইবার তদন্ত এবং ডিজিটাল প্রমাণ ব্যবহারের ওপর জোর দিয়েছেন মন্ত্রী। বড় ধরনের বন্যপ্রাণী অপরাধের ক্ষেত্রে আর্থিক তদন্ত, সম্পদের উৎস শনাক্তকরণ এবং জাতীয় আইন অনুযায়ী মানি লন্ডারিংবিরোধী ব্যবস্থাও ব্যবহারের আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। এই পদ্ধতির লক্ষ্য শুধু একজন পাচারকারীকে গ্রেপ্তার করা নয়; বরং অপরাধের অর্থের প্রবাহ এবং এর সঙ্গে যুক্ত নেটওয়ার্ক পর্যন্ত পৌঁছানো।
বন্যপ্রাণী অপরাধের তদন্তে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন আবদুল আউয়াল মিন্টু। তিনি বন্যপ্রাণী ফরেনসিক, ডিএনএ বিশ্লেষণ, ডিজিটাল ফরেনসিক এবং ভূ-স্থানিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর আহ্বান জানান। পাশাপাশি দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে যৌথ প্রশিক্ষণ ও বিশেষজ্ঞ বিনিময়ের প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন।
উদ্ধার করা এবং জব্দ করা জীবিত বন্যপ্রাণীর পুনর্বাসন ও নিজ দেশে প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রেও দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানোর আহ্বান জানান তিনি।
এসএডব্লিউইএন-এর কৌশলগত পরিকল্পনা ২০২৬-২০৩০ নিয়েও বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরেন মন্ত্রী। তিনি বলেন, প্রস্তাবিত পরিকল্পনাটি দক্ষিণ এশিয়ায় বন্যপ্রাণী অপরাধ মোকাবিলার অগ্রাধিকারগুলোকে একটি বাস্তবায়নযোগ্য আঞ্চলিক কর্মসূচিতে রূপ দেওয়ার সুযোগ তৈরি করেছে। বাংলাদেশ এমন একটি পরিকল্পনাকে সমর্থন করে, যেখানে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, আইন প্রয়োগ, ফৌজদারি বিচার, ডিজিটাল ও আর্থিক তদন্ত, বিজ্ঞান ও ফরেনসিক, সক্ষমতা উন্নয়ন এবং বন্যপ্রাণীর অবৈধ চাহিদা কমানোর বিষয়গুলো গুরুত্ব পাবে।
মন্ত্রী বলেন, এসএডব্লিউইএন-এর প্রথম সাধারণ পরিষদ রাজনৈতিক অঙ্গীকারকে বাস্তব কার্যক্রমে পরিণত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। সদস্য দেশগুলোর উচিত কাঠমান্ডু থেকে আরও শক্তিশালী গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় ব্যবস্থা, বাস্তবভিত্তিক যৌথ কার্যক্রম এবং বন্যপ্রাণীর জন্য হুমকি তৈরি করা অপরাধী নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়ার অভিন্ন অঙ্গীকার নিয়ে ফিরে যাওয়া।
বাংলাদেশ এসএডব্লিউইএন-এর সদস্য দেশ, আন্তর্জাতিক সংস্থা ও উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে একটি শক্তিশালী, আন্তঃসংযুক্ত ও কার্যকর আঞ্চলিক বন্যপ্রাণী আইন প্রয়োগ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে প্রস্তুত বলেও জানান তিনি।
সম্মেলনে নেপালের হাউজ অব রিপ্রেজেন্টেটিভের স্পিকার দোল প্রসাদ আরিয়াল, নেপালের কৃষি, বন ও পরিবেশমন্ত্রী গীতা চৌধুরী, এসএডব্লিউইএন-এর মহাসচিব ড. কৃষ্ণ প্রাসাদ আচার্য এবং নেপাল, শ্রীলঙ্কা, ভুটান, পাকিস্তান, মালদ্বীপ ও বাংলাদেশের প্রতিনিধিসহ বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।