আলঝেইমারের নতুন রহস্য: অ্যামাইলয়েড ধরা পড়ার অন্তত সাত বছর আগেই কর্টেক্সে সূক্ষ্ম পরিবর্তনের সন্ধান
একজন মানুষ তখনও স্বাভাবিক।
স্মৃতি ঠিক আছে। কথা বলতে সমস্যা নেই। দৈনন্দিন কাজেও কোনো অস্বাভাবিকতা নেই। এমনকি মস্তিষ্কের আধুনিক স্ক্যানেও আলঝেইমারের স্পষ্ট কোনো চিহ্ন দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু মস্তিষ্কের ভেতরে হয়তো তখনই কিছু বদলাতে শুরু করেছে।
নতুন এক দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা আলঝেইমার রোগের শুরুর পর্যায় সম্পর্কে এমনই একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত দিয়েছে। গবেষকেরা দেখেছেন, মস্তিষ্কের কর্টেক্সে কিছু সূক্ষ্ম কাঠামোগত পরিবর্তন শুরু হতে পারে অ্যামাইলয়েড-বিটা জমা পিইটি স্ক্যানে স্পষ্টভাবে ধরা পড়ার অন্তত সাত বছর আগে।
অর্থাৎ, স্ক্যানে রোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ চিহ্ন দৃশ্যমান হওয়ার আগেই মস্তিষ্কে পরিবর্তনের ছাপ থাকতে পারে। তবে এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা আছে।
গবেষণাটি বলছে না যে আলঝেইমার ঠিক সাত বছর আগে শুরু হয়। বরং বলছে, বর্তমানে আলঝেইমারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জৈবিক চিহ্ন হিসেবে বিবেচিত অ্যামাইলয়েড জমা দৃশ্যমান হওয়ার অনেক আগেই মস্তিষ্কের কাঠামোতে পরিবর্তন দেখা যেতে পারে। এই পার্থক্যটিই গবেষণাটির আসল গুরুত্ব।
আলঝেইমার নিয়ে বিজ্ঞানীদের সবচেয়ে বড় প্রশ্নগুলোর একটি হলো—রোগটি আসলে কখন শুরু হয়? স্মৃতিভ্রংশ যখন চোখে পড়ে, তখন কি রোগটি শুরু হয়? নাকি তার বহু বছর আগে?
এত দিন আলঝেইমারের গবেষণায় অ্যামাইলয়েড-বিটা প্রোটিনের ভূমিকা ছিল কেন্দ্রে। মস্তিষ্কে এই প্রোটিন জমে প্লেক তৈরি করে। পিইটি স্ক্যানের মাধ্যমে নির্দিষ্ট পর্যায়ে সেই জমাট শনাক্ত করা যায়।
কিন্তু নতুন গবেষণা বলছে, দৃশ্যমান অ্যামাইলয়েড প্লেককে রোগের একেবারে প্রথম সংকেত ধরে নেওয়া হয়তো যথেষ্ট নয়। কারণ তারও আগে মস্তিষ্কের গঠনে পরিবর্তন দেখা দিতে পারে।
এটি কোনো স্বল্পমেয়াদি গবেষণা নয়। গবেষকেরা দীর্ঘ সময় ধরে মানসিকভাবে সুস্থ মানুষের মস্তিষ্ক পর্যবেক্ষণ করেছেন। গবেষণায় তিনটি দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা দলের তথ্য একত্র করা হয়েছে। সব মিলিয়ে বিশ্লেষণে ১ হাজার ৫১ জন জ্ঞানগতভাবে সুস্থ মানুষের ৪ হাজার ৫৭০টি এমআরআই স্ক্যান ব্যবহার করা হয়। পাশাপাশি ৬৯১ জনের ১ হাজার ৬৮৪টি অ্যামাইলয়েড পিইটি স্ক্যান বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
এরপর গবেষকেরা সময়ের দিকে উল্টো পথে তাকিয়েছেন। যাদের পরে পিইটি স্ক্যানে অ্যামাইলয়েডের মাত্রা বেড়ে গেছে, তাদের আগের বছরের এমআরআই কেমন ছিল? সেখানেই মিলেছে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র। গবেষকেরা দেখেছেন, যারা পরবর্তী সময়ে অ্যামাইলয়েড পিইটি-এ পজিটিভ হয়েছেন, তাদের মস্তিষ্কের কর্টেক্সে আগে থেকেই কিছু কাঠামোগত পার্থক্য ছিল।
এই পার্থক্য পিইটি-এ অ্যামাইলয়েড উচ্চমাত্রায় শনাক্ত হওয়ার অন্তত সাত বছর আগেও দেখা যাচ্ছিল। কিছু বিশ্লেষণে আরও আগের, প্রায় আট থেকে নয় বছর আগের এমআরআই-তেও একই ধরনের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
এখানে আরেকটি বিষয় বোঝা জরুরি। এটি এমন কোনো পরিবর্তন নয়, যা একটি সাধারণ এমআরআই রিপোর্ট হাতে নিয়ে চিকিৎসক সহজেই বলে দিতে পারবেন—‘এই রোগীর আলঝেইমার হবে।’ গবেষকেরা মূলত বিপুলসংখ্যক স্ক্যানের মধ্যে পরিসংখ্যানগত পার্থক্য খুঁজেছেন। বিশেষ করে মস্তিষ্কের কর্টেক্সের পুরুত্ব এবং সময়ের সঙ্গে সেই পুরুত্বের পরিবর্তন বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
যারা পরে অ্যামাইলয়েড পিইটি-এ পজিটিভ হয়েছেন, তাদের কর্টেক্সের কিছু অংশ তুলনামূলকভাবে পুরু ছিল। একই সাথে সময়ের সঙ্গে কর্টেক্স পাতলা হওয়ার গতিতেও পার্থক্য ছিল। অর্থাৎ, রোগের সম্ভাব্য জৈবিক ইতিহাসে পরিবর্তনটি খুব সূক্ষ্ম। কিন্তু দীর্ঘ সময়ের তথ্য একসঙ্গে রাখলে সেটি দৃশ্যমান হয়ে ওঠে।
এখানেই গবেষণাটি আলঝেইমার গবেষণার পুরোনো প্রশ্নটিকে নতুন করে সামনে এনেছে। একটি সম্ভাবনা হলো, অ্যামাইলয়েডের সঙ্গে সম্পর্কিত কোনো প্রক্রিয়া পিইটি স্ক্যানে দৃশ্যমান হওয়ার অনেক আগেই মস্তিষ্ককে প্রভাবিত করতে শুরু করে। অর্থাৎ, অ্যামাইলয়েডের গল্প শুরু হয় স্ক্যানে প্লেক দেখা দেওয়ার আগেই।
আরেকটি সম্ভাবনা আরও বড়। হতে পারে, অ্যামাইলয়েড উচ্চমাত্রায় জমার আগেই অন্য কোনো জৈবিক প্রক্রিয়া মস্তিষ্কে পরিবর্তন শুরু করে। সেক্ষেত্রে আলঝেইমারকে শুধু ‘অ্যামাইলয়েডের রোগ’ হিসেবে দেখলে পুরো ছবিটি ধরা পড়বে না। তবে নতুন গবেষণা এই প্রশ্নের চূড়ান্ত উত্তর দেয়নি। বরং নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।
আলঝেইমারের জৈবিক প্রক্রিয়া একক কোনো পরিবর্তনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। অ্যামাইলয়েডের পাশাপাশি টাউ প্রোটিনের পরিবর্তন, মস্তিষ্কে প্রদাহ, রক্তনালির সমস্যা, বিপাকীয় পরিবর্তন এবং স্নায়ুকোষের কার্যকারিতার পরিবর্তন—সবই রোগের সঙ্গে সম্পর্কিত।
মস্তিষ্কের বর্জ্য অপসারণ ব্যবস্থার সঙ্গেও আলঝেইমারের সম্পর্ক নিয়ে গবেষণা চলছে। এই ব্যবস্থাকে বলা হয় গ্লিম্ফ্যাটিক সিস্টেম। ফলে একটি সম্ভাবনা হলো, আলঝেইমারের শুরুতে একাধিক প্রক্রিয়া পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত থাকে। অ্যামাইলয়েড হয়তো সেই গল্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। পুরো গল্প নয়।
মস্তিষ্কের ভেতরের পরিবর্তন খুঁজতে এখন আর শুধু এমআরআই বা পিইটি-এর ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে না। রক্ত পরীক্ষাও দ্রুত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। এর মধ্যে পি-টাউ২১৭ বিশেষভাবে আলোচিত একটি বায়োমার্কার। রক্তে এই প্রোটিনের মাত্রা বিশ্লেষণ করে আলঝেইমারের সঙ্গে সম্পর্কিত পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যেতে পারে। এটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ পিইটি স্ক্যান ব্যয়বহুল এবং সবার জন্য সহজলভ্য নয়।
রক্ত পরীক্ষা তুলনামূলকভাবে সহজ। ভবিষ্যতে এটি ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিদের প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত করার কাজে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এখানেও সতর্কতা জরুরি। পি-টাউ২১৭ পরীক্ষা অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক হলেও এটি নিখুঁত নয়। ফলস পজিটিভ এবং ফলস নেগেটিভ—দুই ধরনের ফলের সম্ভাবনাই রয়েছে। তাই কোনো একক পরীক্ষার ফলকে চূড়ান্ত রোগ নির্ণয় হিসেবে দেখা ঠিক নয়।
আলঝেইমারের ক্ষেত্রে সময়টাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি। কারণ স্মৃতিভ্রংশ দৃশ্যমান হওয়ার আগেই যদি মস্তিষ্কে রোগের প্রক্রিয়া বহু বছর ধরে চলতে থাকে, তাহলে উপসর্গ দেখা দেওয়ার পর চিকিৎসা শুরু করা হয়তো অনেক দেরি হয়ে যেতে পারে। এ কারণেই গবেষকেরা এখন আরও আগের সংকেত খুঁজছেন।
রক্তের বায়োমার্কার। পিইটি স্ক্যান। এমআরআই। সেরেব্রোস্পাইনাল ফ্লুইড। জেনেটিক ও অন্যান্য জৈবিক তথ্য।
সব মিলিয়ে লক্ষ্য একটাই—আলঝেইমারকে রোগী ভুলে যেতে শুরু করার আগেই শনাক্ত করা। এমনকি তারও আগে।
নতুন গবেষণার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তাটি সম্ভবত সংখ্যাটিতে নয়। ‘সাত বছর’ শিরোনাম তৈরি করার মতো আকর্ষণীয় সংখ্যা। কিন্তু বিজ্ঞানী হিসেবে আসল প্রশ্ন হলো—এই কাঠামোগত পরিবর্তন কি ভবিষ্যতে আলঝেইমারের নির্ভরযোগ্য পূর্বাভাস দিতে পারবে?
এখনো তার উত্তর নেই।
আজকের এমআরআই দেখে কোনো ব্যক্তির ভবিষ্যতে আলঝেইমার হবে কি না, এই গবেষণার ভিত্তিতে তা নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয় কিন্তু গবেষণাটি একটি দরজা খুলে দিয়েছে। সেটি হলো—আলঝেইমারের দৃশ্যমান রোগ শুরু হওয়ার অনেক আগেই মস্তিষ্কে তার কোনো ছাপ থাকতে পারে। এখন বিজ্ঞানীদের কাজ সেই ছাপকে আরও স্পষ্ট করা।
কোন পরিবর্তন সত্যিই রোগের পূর্বাভাস দেয়? কোনটি শুধু স্বাভাবিক বার্ধক্যের অংশ? কোন জৈবিক পরিবর্তন আগে ঘটে? আর কোন পর্যায়ে চিকিৎসা শুরু করলে রোগের অগ্রগতি সবচেয়ে কার্যকরভাবে ধীর করা সম্ভব?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর মিললে আলঝেইমার চিকিৎসার দর্শনই বদলে যেতে পারে। তখন চিকিৎসার লক্ষ্য শুধু হারিয়ে যাওয়া স্মৃতি সামলানো হবে না। লক্ষ্য হতে পারে—স্মৃতি হারানোর অনেক আগেই রোগের পথ থামিয়ে দেওয়া।