খোলা ম্যানহোল: রাজধানীর সড়কে নীরব মৃত্যুফাঁদ

ঢাকার সড়কে ঢাকনাবিহীন ম্যানহোল

মারুফ আহমেদ

রাজধানীর ব্যস্ত সড়ক থেকে পাড়া-মহল্লার অলিগলি—কোথাও যেন থামছে না ম্যানহোলের ঢাকনা চুরি। একসময় রাতের আঁধারে এই চুরি হতো। এখন অনেক জায়গায় দিনের বেলাতেও ঢাকনা খুলে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে।

ফলে একটি সাধারণ চুরি ক্রমেই পরিণত হয়েছে জননিরাপত্তার বড় সংকটে। ঢাকনাহীন ম্যানহোল হয়ে উঠছে পথচারী, শিশু, বয়স্ক ও মোটরসাইকেল আরোহীদের জন্য মরণফাঁদ।

রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে এবং বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, এই সমস্যা বিচ্ছিন্ন কোনো এলাকার নয়। ঢাকার প্রধান সড়ক থেকে শুরু করে আবাসিক এলাকার ভেতরের রাস্তাতেও খোলা ম্যানহোলের দেখা মিলছে। কোথাও বাঁশের খুঁটিতে লাল কাপড় বেঁধে সতর্ক করা হয়েছে। কোথাও আবার কোনো সতর্কতামূলক ব্যবস্থা ছাড়াই খোলা রয়েছে গভীর গর্ত।

২০২৬ সালের জানুয়ারিতে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে রাজধানীর অন্তত অর্ধশতাধিক এলাকার সড়ক ও অলিগলিতে ঢাকনাবিহীন ম্যানহোলের কথা উঠে আসে। একই প্রতিবেদনে শুধু ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় বছরে প্রায় চার কোটি টাকার ম্যানহোলের ঢাকনা চুরির কথা বলা হয়।

দিনের আলোয় একটি খোলা ম্যানহোল এড়িয়ে চলা সম্ভব। কিন্তু রাতের অন্ধকারে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। বৃষ্টির পানি জমলে ঝুঁকি আরও বাড়ে। পানির নিচে থাকা ম্যানহোলের অবস্থান বোঝার সুযোগ থাকে না। একটি গাড়ি, রিকশা বা মোটরসাইকেল সামান্য ভুল করলেই দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।

সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকে শিশুরা। অনেক শিশু অভিভাবক ছাড়াই স্থানীয় রাস্তায় চলাচল করে। তাদের পক্ষে রাস্তার মাঝখানে থাকা একটি গভীর ম্যানহোলের বিপদ বুঝে ওঠা সবসময় সম্ভব নয়।

ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় এমন ম্যানহোল রয়েছে, যার চারপাশে কোনো ব্যারিকেড নেই। অনেক জায়গায় পর্যাপ্ত সড়কবাতিও নেই। ফলে রাতের বেলায় এগুলো কার্যত অদৃশ্য মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়।

রাজধানীর ম্যানহোল ব্যবস্থাপনায় ঢাকা ওয়াসা ও দুই সিটি করপোরেশনের ভূমিকা রয়েছে। পুরোনো এক জরিপে ঢাকা ওয়াসা ও দুই সিটি করপোরেশনের আওতায় মোট ৭৪ হাজার ৩৩৩টি ম্যানহোলের তথ্য পাওয়া যায়। এর প্রায় ১০ শতাংশ ঢাকনাবিহীন ছিল বলে সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

তবে ম্যানহোলের ঢাকনা না থাকার কারণ শুধু চুরি নয়। ভারী যানবাহনের চাপে ঢাকনা ভেঙে যাওয়া, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার সময় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া এবং দীর্ঘদিন রক্ষণাবেক্ষণের অভাবও এর অন্যতম কারণ হিসেবে উঠে এসেছে।

অর্থাৎ সমস্যাটি একই সঙ্গে চুরি, রক্ষণাবেক্ষণ ও দায়িত্ব পালনের সংকট।

ম্যানহোলের ঢাকনা সাধারণত লোহার হওয়ায় এগুলো চোরদের কাছে মূল্যবান। ভাঙারি ব্যবসার বাজারে কম দামে বিক্রি করা গেলেও একটি ঢাকনা পুনরায় তৈরি ও স্থাপন করতে সিটি করপোরেশন বা সংশ্লিষ্ট সংস্থার কয়েক হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ হয়।

একটি পুরোনো প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, একটি ঢাকনা তৈরিতে প্রায় ছয় হাজার টাকা খরচ হলেও ভাঙারির বাজারে সেটি মাত্র কয়েকশ টাকায় বিক্রি হতে পারে। অপরাধীর লাভ সামান্য। কিন্তু এর সামাজিক ক্ষতি বিশাল।

একটি ঢাকনা চুরি হওয়ার পর সেটি প্রতিস্থাপন না করা পর্যন্ত প্রতিটি পথচারী সম্ভাব্য দুর্ঘটনার ঝুঁকিতে থাকেন। একজন মানুষ সেই গর্তে পড়ে আহত হলে চিকিৎসা ব্যয়, কর্মক্ষমতা হারানো কিংবা স্থায়ী পঙ্গুত্বের ক্ষতি বহন করতে হয় পরিবারকে।

ম্যানহোলের ঢাকনা চুরির সঙ্গে মাদকসেবী, ভবঘুরে বা ছিচকে চোরদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। বিভিন্ন প্রতিবেদনেও এ ধরনের অভিযোগ এসেছে। তবে সমস্যাটিকে শুধু মাদকাসক্তদের অপরাধ হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি পাওয়া যাবে না।

ঢাকনা চুরি হয়ে যাওয়ার পর সেটি কোথায় বিক্রি হচ্ছে, কারা কিনছে এবং পুনর্ব্যবহারের নামে কারা এসব ধাতব সামগ্রী গ্রহণ করছে—সেই বাজারটিও নজরদারির আওতায় আনা প্রয়োজন। কারণ চুরি করা ঢাকনার কোনো ক্রেতা না থাকলে চুরি করে লাভ করা কঠিন।

২০২৬ সালের একটি প্রতিবেদনে ডিএসসিসির হিসাবে বছরে প্রায় দুই হাজার ম্যানহোলের ঢাকনা চুরি হওয়ার কথা বলা হয়েছে। এর বাজারমূল্য প্রায় সাড়ে তিন কোটি টাকা বলে ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। দুই সিটি মিলিয়ে ক্ষতির পরিমাণ আরও বেশি হতে পারে।

রাজধানীর ঢাকা-৯ আসনের সবুজবাগ, খিলগাঁও ও মুগদা এলাকার বিভিন্ন অলিগলিতে ম্যানহোলের ঢাকনা চুরির পাশাপাশি সড়কের দুরবস্থার অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কোনো কোনো এলাকায় দীর্ঘ সময় ধরে ঢাকনাবিহীন ম্যানহোল পড়ে আছে। স্থানীয়ভাবে সতর্ক করার চেষ্টা হলেও স্থায়ী সমাধান হচ্ছে না।

মাদারটেকের নুরুল আমিনের অভিযোগ, স্থানীয় মাদকাসক্তদের পাশাপাশি একটি সংঘবদ্ধ চক্রও এ ধরনের চুরির সঙ্গে জড়িত থাকতে পারে। তাঁর মতে, শুধু সরকারি সংস্থার ওপর নির্ভর না করে স্থানীয় বাড়িওয়ালা ও বাসিন্দাদেরও নজরদারিতে যুক্ত হতে হবে।

বাগানবাড়ী এলাকার এক অভিভাবকের মতে, মাদক ও কিশোর অপরাধ নিয়ন্ত্রণ না করলে এ ধরনের সামাজিক অপরাধও কমানো কঠিন তাঁর ভাষায়, এলাকার মাদক কারবারিদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা গেলে স্থানীয় নিরাপত্তা পরিস্থিতিরও উন্নতি হতে পারে।

স্থানীয় এক ব্যবসায়ী জানান, মাদারটেকের একটি ব্যস্ত প্রবেশপথের ম্যানহোলের ঢাকনা কয়েক মাস ধরে নেই। ওই রাস্তা দিয়ে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষ চলাচল করলেও এখনো স্থায়ীভাবে ঢাকনা বসানো হয়নি বলে তাঁর অভিযোগ।

ঢাকা-৯ আসনের সংসদ সদস্য হাবিবুর রশিদ হাবিব বর্তমানে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ এবং রেলপথ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী। সরকারি তথ্য অনুযায়ী তিনি পূর্ব মাদারটেকের বাসিন্দা এবং ২০২৬ সালের নির্বাচনে ঢাকা-৯ আসন থেকে নির্বাচিত হন।

ফলে তাঁর নির্বাচনী এলাকার স্থানীয় সড়ক ও নাগরিক নিরাপত্তার বিষয়টি আরও গুরুত্বের সঙ্গে দেখার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

ম্যানহোল নিয়ে সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলোর একটি হলো দায়িত্বের বিভাজন। রাজধানীর সব ম্যানহোল একই সংস্থার নয়। ঢাকা ওয়াসা মূলত স্যুয়ারেজের ম্যানহোলের সঙ্গে যুক্ত। আর স্টর্ম স্যুয়ারেজ বা পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থার কিছু ম্যানহোল সিটি করপোরেশনের আওতায় পড়ে। এর ফলে একটি ম্যানহোলের ঢাকনা চুরি হলে অনেক সময় প্রশ্ন ওঠে—ঢাকনাটি কে বসাবে?

সিটি করপোরেশন ওয়াসার দিকে ইঙ্গিত করে। ওয়াসা আবার সংশ্লিষ্ট সিটি কর্তৃপক্ষের দায়িত্বের কথা বলে। এর মাঝখানে পড়ে থাকেন নগরবাসী।

রাস্তা কাটার কাজেও একই ধরনের সমস্যা দেখা যায়। পানি, বিদ্যুৎ, টেলিযোগাযোগ কিংবা সড়ক সংস্কারের কাজের পর অনেক জায়গায় গর্ত ও ভাঙা অংশ দ্রুত মেরামত করা হয় না। ফলে একটি ছোট অব্যবস্থাপনা সময়ের সঙ্গে বড় ঝুঁকিতে পরিণত হয়।

লোহার ঢাকনা চুরি ঠেকাতে বিকল্প হিসেবে ফাইবারের ঢাকনা ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ডিএসসিসির উদ্যোগে পরীক্ষামূলকভাবে কয়েকটি ওয়ার্ডে ফাইবারের ম্যানহোল ঢাকনা বসানো হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, এগুলো বুয়েটের পরীক্ষায় মানোত্তীর্ণ হয়েছে এবং লোহার ঢাকনার তুলনায় খরচও কম।

প্রস্তাবিত ঢাকনাগুলো ব্যবহারের জায়গা অনুযায়ী ভিন্ন সক্ষমতার হতে পারে। ফুটপাতের জন্য অপেক্ষাকৃত কম চাপ সহনীয় ঢাকনা এবং প্রধান সড়কের জন্য ২৫ থেকে ৩০ টন পর্যন্ত চাপ নিতে সক্ষম ঢাকনার কথা বলা হয়েছে। এটি কার্যকর সমাধান হতে পারে। তবে শুধু ঢাকনার উপাদান বদলালেই সমস্যার সমাধান হবে না। চুরি শনাক্ত করা, দ্রুত প্রতিস্থাপন, নিয়মিত পরিদর্শন এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থার জবাবদিহিও নিশ্চিত করতে হবে।

ম্যানহোলের ঢাকনা চুরি করা নিঃসন্দেহে অপরাধ। কিন্তু একটি ঢাকনা চুরি হওয়ার পর দিনের পর দিন সেটি খোলা পড়ে থাকা আরও বড় প্রশাসনিক ব্যর্থতা। কারণ চুরি হওয়ার ঘটনা সব সময় কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণে নাও থাকতে পারে। কিন্তু চুরি হয়ে যাওয়ার পর একটি বিপজ্জনক গর্ত কত ঘণ্টা বা কত দিন খোলা থাকবে, সেটি ব্যবস্থাপনার বিষয়।

কোনো এলাকায় একটি ম্যানহোলের ঢাকনা চুরি হলে সেখানে তাৎক্ষণিকভাবে ব্যারিকেড দেওয়া, সতর্কতামূলক চিহ্ন বসানো এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে নতুন ঢাকনা স্থাপনের ব্যবস্থা থাকতে হবে। কোন সংস্থা কত ঘণ্টার মধ্যে ব্যবস্থা নেবে, সেটিও নির্ধারণ করা জরুরি।

একসময় ঢাকার অনেক মহল্লায় রাতের পাহারাদার থাকতেন। বাঁশি বাজিয়ে ও লাঠি হাতে তাঁরা এলাকায় টহল দিতেন। সেই ব্যবস্থা আধুনিক নগর ব্যবস্থাপনায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। কিন্তু স্থানীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থার ধারণাটি পুরোপুরি অপ্রাসঙ্গিকও নয়। সিসি ক্যামেরা, স্মার্ট লাইটিং, নাগরিক অভিযোগের অ্যাপ এবং নিয়মিত টহল—এসব ব্যবস্থাকে সমন্বিত করা যেতে পারে।

এর পাশাপাশি ভাঙারি ব্যবসায়ীদের ওপর নজরদারি বাড়ানো দরকার। চুরি করা সরকারি সম্পদ গ্রহণ করলে সংশ্লিষ্ট ক্রেতার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।

নগরবাসীর কাছে ম্যানহোলের ঢাকনা লোহার না ফাইবারের—তা মুখ্য নয়। তাঁরা চান নিরাপদ রাস্তা। তাঁরা চান, একটি শিশু স্কুলে যাওয়ার সময় রাস্তার মাঝখানে লুকিয়ে থাকা মৃত্যুফাঁদের শিকার না হোক। তাঁরা চান, রাতের অন্ধকারে একজন পথচারী যাতে নিশ্চিন্তে বাড়ি ফিরতে পারেন।

ঢাকার ম্যানহোল সংকট তাই শুধু চুরি প্রতিরোধের বিষয় নয়। এটি নাগরিক নিরাপত্তা, নগর ব্যবস্থাপনা এবং সরকারি সংস্থাগুলোর সমন্বিত দায়িত্বের প্রশ্ন। ম্যানহোলের ঢাকনা চুরি বন্ধ করতে অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে চুরি হওয়া ঢাকনা দ্রুত প্রতিস্থাপনের ব্যবস্থা করতে হবে।

আর সবচেয়ে জরুরি হলো—একটি খোলা ম্যানহোলকে যেন শুধু একটি খোলা গর্ত হিসেবে না দেখে সম্ভাব্য মৃত্যুফাঁদ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

কারণ একটি ঢাকনার দাম কয়েক হাজার টাকা হতে পারে। কিন্তু সেই ঢাকনা না থাকার কারণে একটি মানুষের জীবন বা পরিবারের ভবিষ্যতের মূল্য কোনো অর্থে পরিমাপ করা যায় না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *