মধ্যপ্রাচ্যের প্রথম দেশ হিসেবে লেবাননে মৃত্যুদণ্ড বিলোপের ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত 

লেবাননের সংসদে মৃত্যুদণ্ড বিলোপের আইন অনুমোদনের পর সংসদীয় অধিবেশনের দৃশ্য।

 

মৃত্যুদণ্ড বিলোপের পক্ষে ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে লেবাননের সংসদ। মঙ্গলবার সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে মৃত্যুদণ্ড বাতিলের আইন অনুমোদিত হয়। এর মধ্য দিয়ে লেবানন মধ্যপ্রাচ্যের প্রথম দেশ হিসেবে মৃত্যুদণ্ডের বিধান আনুষ্ঠানিকভাবে বিলোপের পথে গেল।

তবে একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। লেবানন আরব বিশ্বের প্রথম দেশ নয়। জিবুতি ১৯৯৫ সালেই মৃত্যুদণ্ড বিলোপ করেছে। ফলে লেবানন আরব লীগের দ্বিতীয় দেশ এবং মধ্যপ্রাচ্যের প্রথম দেশ হিসেবে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

সংসদের অনুমোদিত সংশোধিত আইনে মৃত্যুদণ্ডের পরিবর্তে সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও কঠোর শ্রম রাখার কথা বলা হয়েছে। আইনটি লেবাননের বিভিন্ন আইনে থাকা মৃত্যুদণ্ডের বিধান বাতিল করবে। আগে দেওয়া মৃত্যুদণ্ডও নতুন আইনের অধীনে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে রূপান্তরিত হবে। নতুন আইনের আওতায় মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার সুযোগও থাকবে না।

লেবাননের সংসদে মোট ১২৮টি আসন রয়েছে। ভোটে সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্য আইনটির পক্ষে অবস্থান নেন। তবে হিজবুল্লাহর সংসদীয় ব্লক এর বিরোধিতা করে।

লেবাননে মৃত্যুদণ্ডের বিধান থাকলেও ২০০৪ সালের জানুয়ারির পর কোনো মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়নি। অর্থাৎ দুই দশকের বেশি সময় ধরে দেশটিতে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ওপর কার্যত স্থগিতাদেশ ছিল। এই সময়ে আদালত অবশ্য মৃত্যুদণ্ডের রায় দিয়েছে। হত্যা, সন্ত্রাসবাদ ও রাষ্ট্রদ্রোহের মতো গুরুতর অপরাধে মৃত্যুদণ্ডের বিধান ছিল। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর হিসাবে চলতি বছর মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দীর সংখ্যা প্রায় ৮০ থেকে ৮৪ জনের মধ্যে ছিল। সংসদের এবারের সিদ্ধান্ত সেই অঘোষিত স্থগিতাদেশকে স্থায়ী আইনি কাঠামো দেওয়ার উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

মৃত্যুদণ্ড বিলোপের উদ্যোগটি হঠাৎ নেওয়া হয়নি। ২০২৬ সালের জুনে সংসদের বিচারবিষয়ক কমিটি বিলটি অনুমোদন করে। পরে জুলাইয়ে তিনটি সংসদীয় কমিটির যৌথ বৈঠকেও বিলটি অনুমোদিত হয়। তবে জুলাইয়ের সংসদীয় অধিবেশনে রাজনৈতিক বিরোধের কারণে বিলটির ওপর ভোট হয়নি। লেবানিজ ফোর্সেসের সদস্যরা অধিবেশন থেকে বেরিয়ে গেলে প্রয়োজনীয় কোরাম নষ্ট হয়। ফলে ভোট স্থগিত হয়ে যায়। ১১ই  আগস্টের অধিবেশনে শেষ পর্যন্ত বিলটি অনুমোদিত হয়।

মৃত্যুদণ্ড বিলোপের পক্ষে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে আসছে লেবাননের মানবাধিকার সংগঠনগুলো। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলেছে, এই আইন দেশটির বিচারব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনবে। জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিবেদকের কার্যালয়ও বছরের শুরুতে বিলটি নিয়ে চলমান আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়াকে স্বাগত জানিয়েছিল।

জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার ভলকার টুর্কও সংসদের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন। তিনি মধ্যপ্রাচ্যের অন্য দেশগুলোকেও মৃত্যুদণ্ড বিলোপের আহ্বান জানিয়েছেন।

লেবাননের বিচারমন্ত্রী আদেল নাসার এই সিদ্ধান্তকে ‘ঐতিহাসিক পদক্ষেপ’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তাঁর মতে, রাষ্ট্রের হাতে কাউকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার ক্ষমতা না রাখাই আইনের শাসন ও মানবাধিকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

মধ্যপ্রাচ্যে মৃত্যুদণ্ড এখনো বহাল রয়েছে। ফলে লেবাননের সিদ্ধান্তটির আঞ্চলিক গুরুত্ব রয়েছে। দেশটি এমন একটি সময়ে এই পদক্ষেপ নিল, যখন রাজনৈতিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক সংকট ও আঞ্চলিক সংঘাত তার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করছে।

লেবাননের ক্ষেত্রে সিদ্ধান্তটি আরও তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ দেশটিতে দীর্ঘদিন মৃত্যুদণ্ড কার্যকর না হলেও আইনটি বহাল ছিল। এবার সেই আইনি ব্যবস্থাটিই সরিয়ে ফেলার উদ্যোগ নেওয়া হলো।

সংসদে অনুমোদনের পর আইনটি পরবর্তী সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হবে। এরপর রাষ্ট্রপতি জোসেফ আউনের অনুমোদন পেলে এটি কার্যকর হবে। সরকার ইতোমধ্যে মৃত্যুদণ্ড বিলোপের পক্ষে অবস্থান জানিয়েছে। ফলে ১১ই  আগস্টের ভোটকে চূড়ান্ত আইনি কার্যকারিতার শেষ ধাপ না বলে একটি ঐতিহাসিক সংসদীয় অনুমোদন হিসেবে দেখা বেশি সঠিক।

তবু এই ভোটের তাৎপর্য কম নয়। দুই দশকের অঘোষিত স্থগিতাদেশের পর লেবানন এখন মৃত্যুদণ্ডকে আইনের বই থেকেও সরিয়ে দেওয়ার পথে। মধ্যপ্রাচ্যের অন্য দেশগুলো এই সিদ্ধান্ত অনুসরণ করবে কি না, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *