বোল্টের রেকর্ড ছাড়িয়ে ৮.৮৬ সেকেন্ডে ১০০ মিটার দৌড়াল চীনা রোবট

বেইজিংয়ে বিশ্ব মানবরূপী রোবট গেমসে তিয়াংগং আলট্রার নতুন কীর্তি; রোবটের সক্ষমতার পাশাপাশি উঠে এসেছে প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতাও

বেইজিংয়ের বিশ্ব মানবরূপী রোবট গেমসে ১০০ মিটার দৌড়াচ্ছে চীনের তিয়াংগং আলট্রা রোবট

মানুষের ১০০ মিটার দৌড়ের বিশ্ব রেকর্ড এখন আর রোবটের কাছে অতিক্রম করা অসম্ভব নয়। চীনের মানবরূপী রোবট তিয়াংগং আলট্রা বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় বিশ্ব মানবরূপী রোবট গেমসে ১০০ মিটার দৌড়েছে মাত্র ৮.৮৬ সেকেন্ডে। এর মধ্য দিয়ে রোবটটি ছাড়িয়ে গেছে কিংবদন্তি স্প্রিন্টার ইউসেইন বোল্টের ৯.৫৮ সেকেন্ডের বিশ্ব রেকর্ড।

তবে ঘটনাটির সবচেয়ে চমকপ্রদ দিক শুধু ৮.৮৬ সেকেন্ডের সময় নয়। মাত্র এক বছর আগে একই রোবট ১০০ মিটার শেষ করেছিল ২১.৫০ সেকেন্ডে। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে এর সময় কমেছে প্রায় ১৩ সেকেন্ড।

বিশ্ব মানবরূপী রোবট গেমসের এবারের আসর শুরু হয় ২২শে আগস্ট। বেইজিংয়ের ন্যাশনাল স্পিড স্কেটিং ওভালে আয়োজিত এই প্রতিযোগিতা চলে ২৬শে আগস্ট পর্যন্ত।

প্রতিযোগিতার শুরুতেই তিয়াংগং আলট্রা ১০০ মিটার দৌড়ে ৯.৩৯ সেকেন্ড সময় করে। এই সময়টিই বোল্টের ৯.৫৮ সেকেন্ডের রেকর্ডের চেয়ে দ্রুত ছিল। কয়েক দিন পর সেমিফাইনালে রোবটটি আরও উন্নতি করে ৮.৮৬ সেকেন্ডে দৌড় শেষ করে।

রোবটটি তৈরি করেছে বেইজিং হিউম্যানয়েড রোবট ইনোভেশন সেন্টার। চীনের প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ও গবেষণা সংস্থাগুলোর সমন্বিত উদ্যোগের অংশ হিসেবে তিয়াংগং সিরিজের রোবট তৈরি করা হচ্ছে।

দৌড়ের পর অবশ্য রোবটটির পারফরম্যান্স পুরোপুরি নিখুঁত ছিল না। ফিনিশ লাইনের পর এটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে একটি প্যাডেড ব্যারিয়ারে আঘাত করে। সংঘর্ষের পর ছোট আগুনও দেখা যায়। অন্য একটি রোবট সেমিফাইনালে দৌড়ের সময় কার্যত ভেঙে পড়ে।

এ ধরনের ঘটনা দেখিয়েছে, গতি বাড়লেও রোবটের স্থিতিশীলতা ও নির্ভরযোগ্যতা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ।

এবারের গেমসে রোবটদের সক্ষমতা যাচাই করা হয়েছে শুধু দৌড়ের মাধ্যমে নয়। অ্যাথলেটিকসের পাশাপাশি ছিল ফুটবল, জিমন্যাস্টিকস, মার্শাল আর্ট, ভারোত্তোলন, নাচসহ নানা প্রতিযোগিতা।

তিয়াংগং সিরিজের রোবটগুলো ইতোমধ্যে মানুষের একাধিক ক্রীড়া রেকর্ড অতিক্রম করেছে বলে আয়োজক ও নির্মাতা প্রতিষ্ঠান জানিয়েছে। এর মধ্যে ৪০০ মিটার, ১,৫০০ মিটার ও হাই জাম্পও রয়েছে।

তবে এসব ফলাফলকে মানুষের ক্রীড়া রেকর্ডের সঙ্গে সরাসরি তুলনা করার ক্ষেত্রে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি। রোবটের শরীর, শক্তি ব্যবস্থাপনা, নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং প্রতিযোগিতার পরিবেশ মানুষের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। ফলে ৮.৮৬ সেকেন্ডের সময়টি প্রযুক্তিগত সক্ষমতার একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হলেও এটি মানব অ্যাথলেটিকসের রেকর্ডকে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিস্থাপন করে না।

২০২৬ সালের বিশ্ব মানবরূপী রোবট গেমস আগের আসরের তুলনায় অনেক বড় হয়েছে। এবার অংশ নিয়েছে ৬৬৬টি দল ও ২ হাজার ৫৬টি রোবট। অংশগ্রহণ এসেছে ১৬টি দেশ ও ছয়টি মহাদেশ থেকে। মোট প্রতিযোগিতা ছিল ৫১টি এবং অনুষ্ঠিত হয়েছে ১ হাজার ৩০১টি ম্যাচ বা প্রতিযোগিতা।

২০২৫ সালের প্রথম আসরে অংশ নিয়েছিল ২৮০টি দল এবং ৫০০টির বেশি রোবট। এক বছরের মধ্যে দলের সংখ্যা বেড়েছে ১৩৮ শতাংশ। তবে এই প্রতিযোগিতায় চীনের আধিপত্য ছিল স্পষ্ট। ৬৬৬টি দলের মধ্যে ৬৪১টিই চীনা। মোট ২ হাজার ৫৬টি রোবটের মধ্যে চীনের রোবটের সংখ্যা ছিল ১ হাজার ৯৭৫।

এই গেমসের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হলো, প্রতিযোগিতাকে শুধু ক্রীড়া প্রদর্শনীতে সীমাবদ্ধ রাখা হয়নি। মোট ৫১টি ইভেন্টের মধ্যে ২১টি ছিল বাস্তব পরিস্থিতিভিত্তিক কাজ।

কারখানা, হোটেল, বাড়ি, লজিস্টিকস, খুচরা বিক্রয় ও জরুরি উদ্ধার পরিস্থিতিতে রোবটের কাজ করার সক্ষমতা পরীক্ষা করা হয়েছে। পণ্য সাজানো, যন্ত্রপাতি ব্যবহার, রক্ষণাবেক্ষণ ও সেবা দেওয়ার মতো কাজও ছিল এসব পরীক্ষায়।

এখানেই রোবটের আসল সক্ষমতার বড় পরীক্ষা। কারণ দ্রুত দৌড়ানো তুলনামূলকভাবে নির্দিষ্ট একটি কাজ। কিন্তু বাস্তব জীবনের কাজে পরিবেশ পরিবর্তিত হয়। বস্তু ভিন্ন হয়। মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হয়। ভুল হলে পরিস্থিতি সামলাতে হয়।

বিশ্ব মানবরূপী রোবট গেমসকে তাই শুধু বিনোদন বা প্রযুক্তি প্রদর্শনী হিসেবে দেখছেন না সংশ্লিষ্টরা। চীন মানবরূপী রোবটকে ভবিষ্যতের শিল্প ও সেবা খাতে ব্যবহারের জন্য বড় পরিসরে উন্নয়ন করছে।

গেমসের আয়োজকদের বক্তব্যেও বিষয়টি স্পষ্ট। এবারের আয়োজনের লক্ষ্য ছিল রোবটের গতি, ভারসাম্য, সমন্বয়, সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং বাস্তব কাজের সক্ষমতা পরীক্ষা করা।

অর্থাৎ ১০০ মিটারে ৮.৮৬ সেকেন্ডের দৌড় যতটা আলোড়ন তৈরি করেছে, তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে একটি রোবট কতটা নির্ভরযোগ্যভাবে কারখানায় কাজ করতে পারে, হোটেলে সেবা দিতে পারে কিংবা বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে উদ্ধারকাজ করতে পারে।

তিয়াংগং আলট্রার ৮.৮৬ সেকেন্ডের দৌড় নিঃসন্দেহে মানবরূপী রোবট প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতির প্রতীক। এক বছর আগে ২১.৫০ সেকেন্ড থেকে এবার ৯ সেকেন্ডের নিচে চলে আসা সেই অগ্রগতির গতি আরও স্পষ্ট করেছে।

কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে রোবট এখন সামগ্রিকভাবে মানুষের চেয়ে সক্ষম হয়ে গেছে।

বরং বেইজিংয়ের গেমস একটি ভিন্ন বাস্তবতা সামনে এনেছে। নির্দিষ্ট কিছু কাজে রোবট মানুষের সক্ষমতাকে ছাড়িয়ে যেতে পারে। একই সঙ্গে সাধারণ ও বাস্তব কাজের ক্ষেত্রে তারা এখনো পড়ে যেতে পারে, যান্ত্রিক ত্রুটিতে থেমে যেতে পারে কিংবা আগুনও ধরে যেতে পারে।

তাই বোল্টের রেকর্ড ভাঙার চেয়ে বড় প্রশ্ন হয়তো অন্যটি—রোবট কত দ্রুত দৌড়াতে পারে, সেটি নয়; মানুষ যে ধরনের অনিশ্চিত ও বহুমাত্রিক কাজ প্রতিদিন করে, রোবট কতটা নির্ভরযোগ্যভাবে তা করতে পারে।

বেইজিংয়ের প্রতিযোগিতা সেই প্রশ্নের উত্তর এখনো পুরোপুরি দেয়নি। তবে উত্তর খোঁজার গতি যে আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে, তিয়াংগং আলট্রার ৮.৮৬ সেকেন্ডের দৌড় সেটিই দেখিয়ে দিয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *