ইউরোপের বাজারে ইরানের ওষুধ, পরমাণু চিকিৎসায়ও বাড়ছে সক্ষমতা

ইরানের ওষুধশিল্পে নতুন মাইলফলক তৈরি হয়েছে। দেশটির ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান সিনাজেনের  তৈরি জান্ডোরিয়াহ নামের একটি বায়োসিমিলার ওষুধ ইউরোপীয় ইউনিয়নে বাজারজাতের অনুমোদন পেয়েছে। ইউরোপীয় কমিশন ২৭শে এপ্রিল ২০২৬ ওষুধটির বিপণন অনুমোদন দেয়। এর আগে ফেব্রুয়ারিতে ইউরোপীয় মেডিসিনস এজেন্সির (ইএমএ) মানব-ওষুধবিষয়ক কমিটি এর পক্ষে ইতিবাচক মত দেয়। ইরানি ওষুধ কোম্পানি সিনাজেনের তৈরি Zandoriah

জান্ডোরিয়াহ-এর সক্রিয় উপাদান টেরিপ্যারাটাইড। এটি অস্টিওপোরোসিসের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়। বিশেষ করে মেনোপজ-পরবর্তী নারী, হাড় ভাঙার ঝুঁকিতে থাকা পুরুষ এবং দীর্ঘদিন গ্লুকোকর্টিকয়েড ব্যবহারের কারণে অস্টিওপোরোসিসের ঝুঁকিতে থাকা নারী-পুরুষের ক্ষেত্রে এটি ব্যবহারের অনুমোদন রয়েছে।

তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, জান্ডোরিয়াহ নতুন কোনো অণু বা সম্পূর্ণ নতুন আবিষ্কৃত ওষুধ নয়। এটি ফরস্টিওএর একটি বায়োসিমিলার। অর্থাৎ বিদ্যমান একটি জৈবিক ওষুধের সঙ্গে এর গঠন, বিশুদ্ধতা ও জৈবিক কার্যকারিতা অত্যন্ত সাদৃশ্যপূর্ণ। ইএমএ-এর মূল্যায়নে এসব তথ্যকে ইইউ-এর বায়োসিমিলার অনুমোদন কাঠামোর জন্য যথেষ্ট বিবেচনা করা হয়েছে।

জান্ডোরিয়াহ-এর অনুমোদনকে ইরানের ওষুধশিল্পের জন্য বিশেষ ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে। সিনাজেন জানিয়েছে, ইউরোপীয় ইউনিয়নে বিপণন অনুমোদন পাওয়া এটি তাদের প্রথম ওষুধ। ইরানি সংবাদমাধ্যমও এটিকে ইউরোপীয় বাজারে কোনো ইরানি ওষুধ কোম্পানির প্রথম প্রবেশ হিসেবে উল্লেখ করেছে।

ইউরোপীয় কমিশনের নথিতে জান্ডোরিয়াহ-এর বিপণন অনুমোদনধারী হিসেবে সিনাজেনের পর্তুগালভিত্তিক কোম্পানির নাম রয়েছে। ফলে ‘ইরানে উৎপাদিত’ কথাটি ব্যবহারের ক্ষেত্রে উৎপাদনস্থলের নির্দিষ্ট তথ্য আলাদা করে যাচাই করা প্রয়োজন। তবে সিনাজেন নিজেকে ইরানি ওষুধ কোম্পানি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে এবং জান্ডোরিয়াহ-কে তাদের ইরানি ওষুধশিল্পের ইউরোপীয় বাজারে প্রবেশের পণ্য হিসেবে ঘোষণা করেছে।

এটিকে মধ্যপ্রাচ্যে তৈরি প্রথম বায়োলজিক্যাল ওষুধ হিসেবে ইউরোপীয় অনুমোদন পাওয়া—এমন দাবি অবশ্য ইএমএ-এর নথিতে পাওয়া যায় না। তাই এমন ভাষ্যকে নিশ্চিত তথ্য হিসেবে উপস্থাপন করা ঠিক হবে না।

ইরানের বৈজ্ঞানিক সক্ষমতার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হলো নিউক্লিয়ার মেডিসিন ও রেডিওফার্মাসিউটিক্যাল। আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ) জানিয়েছে, ইরান উচ্চমানের রেডিওআইসোটোপ উৎপাদনে সক্ষমতা বাড়িয়েছে। এসব আইসোটোপ প্রোস্টেট, চোখ ও মস্তিষ্কের ক্যান্সারসহ বিভিন্ন রোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হচ্ছে।

আইএইএ-এর তথ্য অনুযায়ী, ইরানে নিউক্লিয়ার মেডিসিন ও রেডিওফার্মাসিউটিক্যাল উন্নয়নে দীর্ঘদিন ধরে কাজ চলছে। এর মধ্যে অ্যাক্টিনিয়াম-225, লুটেটিয়াম-177 ও গ্যালিয়াম-68-এর মতো রেডিওনিউক্লাইড ব্যবহার করে বিভিন্ন ডায়াগনস্টিক ও চিকিৎসা প্রযুক্তির উন্নয়নও রয়েছে।

এখানে ‘পরমাণু প্রযুক্তি’ বলতে শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদন বা সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম বোঝায় না। চিকিৎসাক্ষেত্রে রেডিওআইসোটোপের ব্যবহারও নিউক্লিয়ার প্রযুক্তির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। নির্দিষ্ট আইসোটোপকে নির্দিষ্ট অণুর সঙ্গে যুক্ত করে ক্যান্সার কোষ শনাক্ত বা ধ্বংস করার চিকিৎসা পদ্ধতি বর্তমানে বিশ্বজুড়ে ব্যবহৃত হচ্ছে।

ইরানের বৈজ্ঞানিক অবকাঠামো নিয়ে আলোচনায় ২০২৫ সালের ইরান-ইসরায়েল সংঘাত এবং যুক্তরাষ্ট্রের হামলার প্রসঙ্গও এসেছে। ২০২৫ সালের ২২শে জুন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ফোরডো, নাতাঞ্জ ও ইসফাহান-এর তিনটি পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালায়। আইএইএ পরে ইসফাহানের পারমাণবিক কমপ্লেক্সের কিছু টানেলের প্রবেশপথ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কথা নিশ্চিত করে।

করোনাভাইরাস মহামারির সময় ইরান নিজস্ব কয়েকটি টিকা তৈরি করেছিল। এর মধ্যে কোভইরান বেয়ারকাট ছিল সবচেয়ে আলোচিত। তৃতীয় ধাপের প্রায় ২০ হাজার অংশগ্রহণকারীর ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে টিকাটি উপসর্গযুক্ত কোভিড প্রতিরোধে ৫০ দশমিক ২ শতাংশ এবং গুরুতর রোগের ক্ষেত্রে ৭০ দশমিক ৫ শতাংশ কার্যকারিতা দেখায়। গুরুতর কোনো প্রতিকূল ঘটনা টিকার সঙ্গে সম্পর্কিত বলে গবেষণায় পাওয়া যায়নি।

তবে ‘কোনো সাইড ইফেক্ট ছিল না’—এমন দাবি বৈজ্ঞানিক তথ্যের সঙ্গে মেলে না। গবেষণায় টিকা নেওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ইনজেকশনের স্থানে ব্যথা, মাথাব্যথা ও ক্লান্তির মতো সাধারণ প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেছে। অধিকাংশ প্রতিক্রিয়া ছিল মৃদু বা মাঝারি এবং সাময়িক।

ইরানে তখন স্থানীয়ভাবে তৈরি একাধিক কোভিড টিকাও ব্যবহৃত হয়েছিল। ডব্লিউএইচও-এর ইরানসংক্রান্ত তথ্যেও কোভইরান বেয়ারকাট, পাস্তোকোভাক ও অন্যান্য স্থানীয় টিকার ব্যবহার নথিভুক্ত রয়েছে।

ইরানের ওষুধশিল্পের বিকাশকে তাই শুধু একটি ওষুধের ইউরোপীয় অনুমোদন দিয়ে বিচার করা যায় না। দেশটি দীর্ঘদিন ধরে নিষেধাজ্ঞা, আমদানি-সীমাবদ্ধতা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের নানা বাধার মধ্যে নিজস্ব ওষুধ ও বায়োটেকনোলজি সক্ষমতা গড়ে তোলার চেষ্টা করছে।

জান্ডোরিয়াহ-এর ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, একটি ইরানি কোম্পানির তৈরি বায়োসিমিলার ইউরোপীয় নিয়ন্ত্রক কাঠামোর কঠোর মূল্যায়ন পেরিয়েছে। এর অর্থ এই নয় যে ইরান ইউরোপের ওষুধশিল্পকে ইতোমধ্যে বড় প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ফেলেছে। তবে এটি দেখায়, নিষেধাজ্ঞার মধ্যে থেকেও ইরানের কিছু ওষুধ কোম্পানি উন্নত বায়োটেকনোলজি, মান নিয়ন্ত্রণ ও আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রক মানদণ্ডে পৌঁছানোর সক্ষমতা তৈরি করেছে।

ভবিষ্যতে এই সক্ষমতা আরও বিস্তৃত হলে এর প্রভাব শুধু স্বাস্থ্য খাতে সীমাবদ্ধ থাকবে না। উচ্চমূল্যের বায়োলজিক্যাল ওষুধ, রেডিওফার্মাসিউটিক্যাল এবং অন্যান্য বিশেষায়িত চিকিৎসা পণ্য স্থানীয়ভাবে তৈরি করতে পারলে ইরানের আমদানি-নির্ভরতা কমতে পারে। একই সঙ্গে বাড়তে পারে রপ্তানি আয়, গবেষণা বিনিয়োগ এবং বৈজ্ঞানিক সক্ষমতা।

তবে এসব সম্ভাবনাকে বাস্তব অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত করতে হলে আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রক অনুমোদন, উৎপাদনের ধারাবাহিক মান, ক্লিনিক্যাল গবেষণা এবং বৈশ্বিক বাজারে প্রবেশ—এই চার ক্ষেত্রেই ইরানকে আরও এগোতে হবে। জান্ডোরিয়াহ-এর ইউরোপীয় অনুমোদন সেই দীর্ঘ পথের একটি গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু মাত্র প্রথম দিকের, মাইলফলক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *