আফগানিস্তানে শ্রমশক্তিতে নারীর অংশগ্রহণ ৫.১ শতাংশ

আফগানিস্তানে কর্মরত আফগান নারীদের দৃশ্য

তালেবান ক্ষমতায় ফেরার পাঁচ বছর পর আফগানিস্তানের শ্রমবাজারে নারী-পুরুষের বৈষম্য আরও গভীর হয়েছে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) বলছে, ২০২৬ সালে দেশটির নারীদের শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণের হার নেমে এসেছে মাত্র ৫.১ শতাংশে। এই হার বিশ্বে দ্বিতীয় সর্বনিম্ন। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে নারীদের বাদ পড়ার ব্যাপকতাই এই পতনের প্রধান বৈশিষ্ট্য।

আইএলও-এর ১৮শে আগস্ট প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২২ সালের নিম্ন অবস্থান থেকে আফগানিস্তানে মোট কর্মসংস্থান কিছুটা ঘুরে দাঁড়িয়েছে। ২০২৬ সালে মোট কর্মসংস্থান প্রায় ৮৫ লাখে পৌঁছানোর অনুমান করা হয়েছে। ২০২২ সালের তুলনায় এটি ১৪ শতাংশ বেশি। কিন্তু এই প্রবৃদ্ধির প্রায় পুরোটা হয়েছে পুরুষদের কর্মসংস্থানে। ২০২০ সালের তুলনায় ২০২৬ সালে পুরুষের কর্মসংস্থান প্রায় ২২ শতাংশ বেশি। বিপরীতে নারীদের কর্মসংস্থান ২০২২ সালে ২০২০ সালের এক-তৃতীয়াংশেরও নিচে নেমে যায় এবং এরপরও উল্লেখযোগ্য পুনরুদ্ধার হয়নি।

২০২১ সালের আগস্টে তালেবান ক্ষমতা দখলের পর আফগান নারীদের শিক্ষা, চাকরি ও জনজীবনে অংশগ্রহণের সুযোগ ধারাবাহিকভাবে সংকুচিত হয়েছে। আইএলও-এর বিশ্লেষণে এই পরিবর্তনের ফল হিসেবে শ্রমবাজারে পুরুষের ওপর নির্ভরতা বাড়ার কথা বলা হয়েছে।

নারীদের কর্মসংস্থানের ওপর বিধিনিষেধের পাশাপাশি শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হওয়ার বিষয়টিও ভবিষ্যৎ শ্রমবাজারের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করছে। জাতিসংঘের নারী বিষয়ক সংস্থা ইউএন উমেন -এর ২০২৪ সালের জেন্ডার ইনডেক্স অনুযায়ী, আফগানিস্তানে প্রায় ১০ জনে ৮ জন তরুণী শিক্ষা, কর্মসংস্থান বা প্রশিক্ষণের বাইরে। তরুণ পুরুষদের ক্ষেত্রে এই হার প্রায় চার ভাগের এক ভাগ।

ইউএন উমেন-এর তথ্য বলছে, ২০২৪ সালে আফগান নারীদের শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণ ছিল ২৪ শতাংশ। পুরুষদের ক্ষেত্রে তা ছিল ৮৯ শতাংশ। পরবর্তী সময়ে পরিস্থিতির আরও অবনতির প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে আইএলও-এর ২০২৬ সালের মডেলভিত্তিক হিসাবে। সেখানে নারীদের শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণ ৫.১ শতাংশে নেমে এসেছে।

নারীদের শ্রমবাজার থেকে বাদ পড়ার প্রভাব কেবল চাকরির সুযোগ হারানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। অর্থ উপার্জন, ব্যাংকিং এবং আর্থিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রেও বড় ব্যবধান তৈরি হয়েছে।

ইউএন উমেন-এর ২০২৪ সালের জেন্ডার ইনডেক্স অনুযায়ী, মাত্র ৬.৮ শতাংশ আফগান নারী ব্যক্তিগত বা যৌথ ব্যাংক হিসাবের মালিক ছিলেন অথবা মোবাইল মানি সেবা ব্যবহার করেছিলেন। পুরুষদের ক্ষেত্রে এই হার ছিল ২০.১ শতাংশ।

নারীরা কাজ করলেও তার বড় অংশ অনানুষ্ঠানিক ও অনিরাপদ। বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায় কার্পেট বোনা, সূচিকর্ম, সেলাই, গৃহস্থালি কাজ এবং ছোট পরিসরের কৃষিকাজ নারীদের আয়ের গুরুত্বপূর্ণ উৎস। কিন্তু এসব কাজ থেকে পাওয়া অর্থের ওপরও নারীদের নিয়ন্ত্রণ সীমিত। ইউএন উমেন-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে গ্রামীণ এলাকায় মাত্র ৫ শতাংশ কর্মজীবী নারী তাদের উপার্জনের অর্থ কীভাবে ব্যয় হবে, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারতেন। শহরাঞ্চলে এই হার ছিল ১৪ শতাংশ। পুরুষদের ক্ষেত্রে উভয় এলাকাতেই হার ছিল ৬১ শতাংশ।

তালেবান শাসনে নারীদের অর্থনৈতিক অংশগ্রহণের সুযোগ সংকুচিত হওয়ার সঙ্গে শিক্ষা ও চলাচলের ওপর বিধিনিষেধও যুক্ত হয়েছে।

মাধ্যমিক শিক্ষায় মেয়েদের প্রবেশ বন্ধ রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়েও নারীদের পড়াশোনা নিষিদ্ধ। পাশাপাশি এনজিও ও জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থায় নারী কর্মীদের কাজ করার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে।

ইউএন উমেন বলছে, ২০২১ সালের পর নারীদের অধিকার সীমিত করে দেওয়া কোনো গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনাই প্রত্যাহার করা হয়নি। বরং সময়ের সঙ্গে এসব বিধিনিষেধ আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে। ২০২৪ সালের তথাকথিত ‘ভার্চু এন্ড ভাইস’ আইনও নারীদের জনজীবনে অংশগ্রহণ আরও সংকুচিত করেছে।

এর ফলে কর্মসংস্থানের সুযোগের পাশাপাশি নারী উদ্যোক্তাদের ব্যবসা পরিচালনা, বাজারে প্রবেশ এবং আর্থিক সেবা পাওয়ার পথও সংকুচিত হয়েছে।

নারীদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে বাদ দেওয়ার মূল্য শুধু নারীরাই দিচ্ছেন না। এর প্রভাব পড়ছে পুরো অর্থনীতিতে।

ইউএন উমেন-এর হিসাব অনুযায়ী, নারীদের সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে বাদ দেওয়ার কারণে ২০২৪ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে আফগান অর্থনীতি আনুমানিক ৯২০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার হারাতে পারে।

এ ক্ষতির সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি মানবসম্পদ সংকটও যুক্ত হচ্ছে। আজ যে মেয়েরা স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতে পারছে না, কয়েক বছর পর তারাই শিক্ষক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, গবেষক বা উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ হারাবে।

বিশেষজ্ঞদের জন্য এ কারণে বর্তমান শ্রমবাজারের সংকট শুধু কর্মসংস্থানের পরিসংখ্যান নয়। এটি আফগানিস্তানের ভবিষ্যৎ দক্ষ শ্রমশক্তি তৈরির সক্ষমতার সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত।

এর সঙ্গে নতুন চাপ তৈরি করেছে প্রতিবেশী দেশগুলো থেকে আফগানদের ফিরে আসা। ইউএনএইচসিআর-এর ২০২৬ সালের জুনের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৬ সালের মে পর্যন্ত ইরান ও পাকিস্তান থেকে ৬০ লাখের বেশি আফগান দেশে ফিরেছেন। ২০২৬ সালের প্রথম পাঁচ মাসেই ফিরেছেন প্রায় ৭ লাখ ৫৪ হাজার মানুষ।

এই বিপুলসংখ্যক মানুষের ফিরে আসা এমন এক শ্রমবাজারে চাপ বাড়াচ্ছে, যেখানে আগে থেকেই দারিদ্র্য, বেকারত্ব ও অনানুষ্ঠানিক কর্মসংস্থান বড় সমস্যা।

নারী ও মেয়েদের ঝুঁকি আরও বেশি। ইউএনএইচসিআর বলছে, ফিরে আসা নারী, শিশু, বয়স্ক এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা সুরক্ষা ঝুঁকির মুখে রয়েছেন। নারীদের ওপর বিদ্যমান চলাচল ও কর্মসংস্থানসংক্রান্ত বিধিনিষেধ এই ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।

তবে আফগান নারীরা পুরোপুরি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে অদৃশ্য হয়ে যাননি। অনেক নারী বাড়িভিত্তিক ব্যবসা, কারুশিল্প, সেলাই ও অন্যান্য ক্ষুদ্র উদ্যোগের মাধ্যমে আয় করার চেষ্টা করছেন।

আইএলও-এর ২০২৬ সালের একটি পৃথক গবেষণাতেও দেখা গেছে, উপযুক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা, স্থানীয় পর্যায়ে সম্পৃক্ততা, নারীবান্ধব কর্মপরিবেশ এবং উদ্যোক্তা সহায়তা থাকলে কঠোর বিধিনিষেধের মধ্যেও নারীদের কর্মসংস্থানে যুক্ত করা সম্ভব।

অর্থাৎ সমস্যা শুধু নারীদের কাজ করার আগ্রহের অভাব নয়। বড় বাধা হলো কাজের সুযোগ, চলাচল, নিরাপত্তা, শিক্ষা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তার ওপর ধারাবাহিক বিধিনিষেধ।

আফগানিস্তানের বর্তমান শ্রমবাজারের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো নারী ও পুরুষের মধ্যে ব্যবধানের দ্রুত বিস্তার।

একদিকে ২০২৬ সালে পুরুষের কর্মসংস্থান ২০২০ সালের তুলনায় প্রায় ২২ শতাংশ বেড়েছে। অন্যদিকে নারীদের কর্মসংস্থান ২০২২ সালে ২০২০ সালের এক-তৃতীয়াংশের নিচে নেমে যায়। এরপরও তা উল্লেখযোগ্যভাবে ঘুরে দাঁড়ায়নি। একই সময়ে নারীদের শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণের হার ৫.১ শতাংশে নেমে এসেছে।

এই পরিস্থিতিকে শুধু নারী অধিকার সংকট হিসেবে দেখলে চিত্রটি অসম্পূর্ণ থেকে যায়। এটি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, মানবসম্পদ, পরিবারভিত্তিক আয় এবং ভবিষ্যৎ শ্রমবাজারের সংকটও।

ইউএন উমেন-এর হিসাবে, প্রায় ৮০ শতাংশ তরুণ আফগান নারী বর্তমানে শিক্ষা, কর্মসংস্থান বা প্রশিক্ষণের বাইরে। তাদের একটি বড় অংশ যদি দীর্ঘ সময় দক্ষতা অর্জনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত থাকে, তাহলে ভবিষ্যতে তাদের শ্রমবাজারে ফিরিয়ে আনা আরও কঠিন হবে।

তাই আইএলও-এর ৫.১ শতাংশের পরিসংখ্যানটি শুধু একটি সংখ্যা নয়। এটি আফগানিস্তানের শ্রমবাজারের গভীর পরিবর্তনের একটি সংকেত। দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠীকে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের বাইরে রেখে কর্মসংস্থান বাড়লেও তা টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে রূপ নেবে কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *