নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন, উদ্যোক্তা উন্নয়ন এবং বাংলাদেশ-জাপানের ব্যবসায়িক সহযোগিতা আরও জোরদার করার লক্ষ্যে রাজধানীর শেরাটন ঢাকার গ্র্যান্ড বলরুমে অনুষ্ঠিত হয়েছে জাপান–বাংলাদেশ বিজনেস উইমেন কনফারেন্স ২০২৬।
“এমপাওয়ারিং উইমেন ইন বিজনেস: ড্রাইভিং সাসটেইনেবল গ্রোথ ইন বাংলাদেশ থ্রু ‘গিভ টু গেইন’” প্রতিপাদ্যে অনুষ্ঠিত এই সম্মেলনের আয়োজন করে জাপান-বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (জেবিসিসিআই)। আয়োজনে সহযোগিতা করে জেট্রো ঢাকা এবং জাপানিজ কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি অ্যাসোসিয়েশন ইন ঢাকা (জেসিআইএডি)।
সম্মেলনে বাংলাদেশ ও জাপানের সরকারি প্রতিনিধি, কূটনীতিক, উন্নয়ন সহযোগী, ব্যবসায়ী, উদ্যোক্তা, বিনিয়োগকারী, শিক্ষাবিদ এবং বিভিন্ন পেশাজীবীরা অংশ নেন। আলোচনায় নারীর অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ, নেতৃত্বের বিকাশ, উদ্যোক্তা সৃষ্টি এবং দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের সুযোগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী আফরোজা খানম (রিতা), এমপি। তিনি বলেন, শিক্ষা, উদ্যোক্তা উন্নয়ন, নেতৃত্ব এবং সমান সুযোগ নিশ্চিত করা হলে নারীরা উদ্ভাবন, অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং জাতীয় উন্নয়নে আরও বড় ভূমিকা রাখতে পারবেন। তিনি বিমান পরিবহন ও পর্যটন খাতকে নারী উদ্যোক্তাদের জন্য সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র হিসেবেও উল্লেখ করেন।
বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশে জাপানের রাষ্ট্রদূত সাইদা শিনইচি। তিনি বাংলাদেশে নারীর উদ্যোক্তা উন্নয়ন, আর্থিক অন্তর্ভুক্তি, নেতৃত্ব বিকাশ এবং লিঙ্গসমতা প্রতিষ্ঠায় জাপানের সহযোগিতা অব্যাহত রাখার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন।
সম্মানিত অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন জাইকা বাংলাদেশ-এর প্রধান প্রতিনিধি তাকাহাশি জুনকো। তিনি বলেন, টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম ভিত্তি হলো নারীর ক্ষমতায়ন। নারী নেতৃত্বের অভিজ্ঞতা ও দৃষ্টিভঙ্গি বাংলাদেশ ও জাপান—উভয় দেশের অর্থনীতি এবং প্রতিষ্ঠানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
স্বাগত বক্তব্যে জেবিসিসিআইর সভাপতি তারেক রফি ভূঁইয়া (জুন) বলেন, নারীদের শুধু কর্মসংস্থানে নয়, মালিকানা, নির্বাহী নেতৃত্ব, ক্ষুদ্র উদ্যোগ থেকে বড় ব্যবসায় এবং স্থানীয় বাজার থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছে দেওয়ার জন্য সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। তিনি বলেন, “গিভ টু গেইন” ধারণা ব্যবসায়িক সুশাসন, কর্মসংস্থান এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক উন্নয়নে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।
সম্মেলনে মূল প্রবন্ধ, উদ্যোক্তার সফলতার গল্প এবং একটি উচ্চপর্যায়ের প্যানেল আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। প্যানেল আলোচনা সঞ্চালনা করেন জেবিসিসিআইর সেক্রেটারি জেনারেল মারিয়া হাওলাদার এফসিএ।
আলোচনায় নারীদের অর্থায়নের সুযোগ বৃদ্ধি, ডিজিটাল ও পেশাগত দক্ষতা উন্নয়ন, করপোরেট প্রতিষ্ঠানের ক্রয় ব্যবস্থায় নারী উদ্যোক্তাদের অংশগ্রহণ, নিরাপদ কর্মপরিবেশ, আনুষ্ঠানিক ব্যবসায়িক নেটওয়ার্ক, নির্বাহী নেতৃত্ব, পরিচালনা পর্ষদে প্রতিনিধিত্ব এবং জাপানসহ বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে নারী-নেতৃত্বাধীন প্রতিষ্ঠানের সংযুক্তির বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়।
সম্মেলন থেকে ২০৩০ সাল পর্যন্ত একটি জাতীয় নারী অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন রোডম্যাপ প্রণয়নের প্রস্তাব দেওয়া হয়। পাশাপাশি নারী উদ্যোক্তাদের জন্য প্রবৃদ্ধিমুখী অর্থায়ন ও ঋণ গ্যারান্টি সম্প্রসারণ, করপোরেট ক্রয়ে নারী-মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের জন্য সুযোগ বৃদ্ধি, নির্বাহী ব্যবস্থাপনা ও পরিচালনা পর্ষদে নারীর প্রতিনিধিত্ব বাড়ানো এবং বাংলাদেশ-জাপান উইমেন এন্টারপ্রেনার্স অ্যাক্সেলারেটর প্রতিষ্ঠার সুপারিশ করা হয়।
এছাড়া জেবিসিসিআই “বাংলাদেশ-জাপান উইমেন ইন বিজনেস প্ল্যাটফর্ম“ গঠনের প্রস্তাব দেয়। এই প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে মেন্টরিং, ব্যবসায়িক সংযোগ, সক্ষমতা বৃদ্ধি, প্রযুক্তি গ্রহণ, রপ্তানির প্রস্তুতি এবং জাপানি করপোরেট নেটওয়ার্কে প্রবেশের সুযোগ তৈরির পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়।
অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ-জাপান বন্ধুত্ব ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক জোরদারে আজীবন অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে প্রয়াত কাজুকো ভূঁইয়া সেনসেই-এর মৃত্যুবার্ষিকীর দশম বছরে তাঁর প্রতি বিশেষ শ্রদ্ধা জানানো হয়।
সম্মেলনের সমাপনীতে নারী-মালিকানাধীন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে করপোরেট সরবরাহ ব্যবস্থায় আরও বেশি অন্তর্ভুক্ত করা, অর্থায়নের সুযোগ সম্প্রসারণ, উচ্চপর্যায়ের নেতৃত্বে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ানো এবং আরও বেশি নারী উদ্যোক্তাকে জাপান ও আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে যুক্ত করতে কার্যকর ও পরিমাপযোগ্য উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়।