এসএমই উদ্যোক্তার ৭৭ শতাংশই ঋণের বাইরে, সমাধানে ডিজিটাল ঋণ প্রক্রিয়া সহজ করার তাগিদ

দেশের ক্ষুদ্র, কুটির, অতি ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের (সিএমএসএমই) বড় একটি অংশ এখনো প্রাতিষ্ঠানিক ঋণের বাইরে রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রযুক্তিনির্ভর ডিজিটাল ঋণ প্রক্রিয়া সহজ করা এবং বিকল্প ক্রেডিট মূল্যায়ন ব্যবস্থা চালু করা গেলে আরও বেশি উদ্যোক্তাকে অর্থায়নের আওতায় আনা সম্ভব হবে।

রাজধানীর একটি হোটেলে এসএমই ফাউন্ডেশন ও দি এশিয়া ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে আয়োজিত ‘ডিজিটাল পেমেন্ট সিস্টেম এবং ডিজিটাল ঋণ প্রক্রিয়াকরণের মাধ্যমে এসএমই ঋণ সহজীকরণ’ শীর্ষক সেমিনারে বক্তারা এসব কথা বলেন।

এসএমই ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আনোয়ার হোসেন চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর ড. মো. কবির আহমেদ। এছাড়া বক্তব্য দেন এসএমই ফাউন্ডেশনের পরিচালক পর্ষদের সদস্য খালিদ মাহমুদ খান, দি এশিয়া ফাউন্ডেশনের বিএসইএ প্রোগ্রামের টিম লিডার সারা এল. টেইলর এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালক শরাফত উল্লাহ খান। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন এসএমই ফাউন্ডেশনের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক ফারজানা খান।

সেমিনারে বক্তারা বলেন, প্রচলিত ঋণ ব্যবস্থার জটিলতা, দীর্ঘ প্রক্রিয়া এবং জামানতসংক্রান্ত বাধার কারণে বিপুলসংখ্যক ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা প্রয়োজনীয় অর্থায়ন থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। ডিজিটাল ঋণ প্রক্রিয়াকরণ এবং প্রযুক্তিনির্ভর মূল্যায়ন পদ্ধতি এই ব্যবধান কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

সভাপতির বক্তব্যে আনোয়ার হোসেন চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতকে আরও প্রতিযোগিতামূলক করতে প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন, ডিজিটাল ব্যবসা পরিচালনা, উদ্ভাবনী আর্থিক সেবা এবং দক্ষ মানবসম্পদের সমন্বিত উন্নয়ন প্রয়োজন। তিনি বলেন, সরকারের বিভিন্ন নীতি ও কর্মপরিকল্পনায় উদ্যোক্তাবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, শিল্পের আধুনিকায়ন এবং প্রযুক্তির ব্যবহার সম্প্রসারণের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

সেমিনারে উপস্থাপিত তথ্যে জানানো হয়, বাংলাদেশের অর্থনীতিতে সিএমএসএমই খাতের অবদান প্রায় ৩০ শতাংশ। তবে দেশের ১ কোটি ১৭ লাখের বেশি সিএমএসএমই উদ্যোক্তার মধ্যে সরাসরি ব্যাংক ঋণ পান মাত্র ৯ শতাংশ। ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে অর্থায়ন পান আরও প্রায় ১৪ শতাংশ উদ্যোক্তা। ফলে প্রায় ৭৭ শতাংশ উদ্যোক্তা এখনো কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ঋণের আওতায় আসতে পারেননি।

আলোচনায় উঠে আসে, নারী উদ্যোক্তা, নতুন উদ্যোক্তা এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা সবচেয়ে বেশি অর্থায়ন সংকটে পড়েন। পর্যাপ্ত জামানতের অভাব, ক্রেডিট হিস্ট্রি না থাকা, প্রয়োজনীয় নথিপত্রের সীমাবদ্ধতা এবং প্রচলিত ব্যাংকিং প্রক্রিয়ার জটিলতার কারণে তারা অনেক ক্ষেত্রেই ঋণ পান না। এতে সম্ভাবনাময় অনেক উদ্যোগও কাঙ্ক্ষিতভাবে বিকশিত হতে পারে না।

এই প্রেক্ষাপটে এসএমই ফাউন্ডেশন ও দি এশিয়া ফাউন্ডেশন যৌথভাবে একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। প্রকল্পটির লক্ষ্য হলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক বিকল্প ক্রেডিট স্কোরিং পদ্ধতির সম্ভাবনা যাচাই, প্রযুক্তিনির্ভর অর্থায়ন ব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক ও তথ্যভিত্তিক অর্থায়ন পরিবেশ গড়ে তোলা।

প্রকল্পের আওতায় আয়োজিত এ সেমিনারে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং ফিনটেক প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। আলোচনায় উদ্যোক্তা ও ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে তথ্য ও যোগাযোগের ব্যবধান কমানো, উদ্যোক্তাদের অর্থায়নের জন্য প্রস্তুত করা এবং বিকল্প ক্রেডিট মূল্যায়ন ব্যবস্থার ব্যবহার বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

বক্তারা আশা প্রকাশ করেন, ডিজিটাল ঋণ প্রক্রিয়া সহজীকরণ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক মূল্যায়ন এবং ফিনটেক সেবার সম্প্রসারণের মাধ্যমে ভবিষ্যতে আরও বেশি ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা প্রাতিষ্ঠানিক অর্থায়নের সুযোগ পাবেন। এর ফলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *