অণ্ডকোষের স্বাস্থ্য নিয়ে পুরুষদের সচেতন হওয়া জরুরি 

ডা: মশিউর রহমান

নিয়মিত স্ব-পরীক্ষায় ধরা পড়তে পারে ক্যান্সারের মতো গুরুতর রোগ

পুরুষদের শরীরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অথচ সবচেয়ে অবহেলিত অঙ্গ হলো অণ্ডকোষ। অনেক পুরুষই অণ্ডকোষের স্বাস্থ্য সম্পর্কে পর্যাপ্ত সচেতন নন। ফলে অনেক ক্ষেত্রে ক্যান্সারসহ বিভিন্ন জটিল রোগ দেরিতে শনাক্ত হয়। নিয়মিত স্ব-পরীক্ষা এবং সামান্য সচেতনতাই অনেক বড় স্বাস্থ্যঝুঁকি এড়াতে সাহায্য করতে পারে।

অণ্ডকোষের ক্যান্সার তুলনামূলকভাবে কম হলেও এটি তরুণ পুরুষদের মধ্যে অন্যতম সাধারণ ক্যান্সার। তবে সময়মতো শনাক্ত করা গেলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই রোগটি সম্পূর্ণ নিরাময় করা সম্ভব।

অণ্ডকোষ পুরুষদের প্রজনন ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এর প্রধান দুটি কাজ হলো শুক্রাণু উৎপাদন এবং টেস্টোস্টেরন হরমোন নিঃসরণ।

টেস্টোস্টেরন পুরুষের শারীরিক গঠন, পেশি শক্তি, হাড়ের স্বাস্থ্য, যৌন আকাঙ্ক্ষা এবং মানসিক অবস্থার ওপর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে। অন্যদিকে, শুক্রাণু উৎপাদনের মাধ্যমে প্রজনন ক্ষমতা বজায় থাকে।

অণ্ডকোষের ভেতরে থাকা সূক্ষ্ম নালিকাগুলোতে প্রতিদিন কোটি কোটি শুক্রাণু তৈরি হয়। এই প্রক্রিয়া ঠিকভাবে চলার জন্য অণ্ডকোষের তাপমাত্রা শরীরের স্বাভাবিক তাপমাত্রার চেয়ে কিছুটা কম থাকা প্রয়োজন।

সাধারণত একজন পুরুষের দুটি অণ্ডকোষ থাকে। তবে জন্মগত কারণে কারও একটি অণ্ডকোষ নাও থাকতে পারে বা অণ্ডথলিতে নেমে না আসতে পারে।

দুটি অণ্ডকোষের আকার পুরোপুরি এক রকম না হলেও তা স্বাভাবিক। অনেক ক্ষেত্রে বাম অণ্ডকোষ ডানটির তুলনায় কিছুটা নিচে অবস্থান করে। এছাড়া অণ্ডকোষের পেছনে থাকা নরম নলাকার অংশ, যাকে এপিডিডাইমিস বলা হয়, অনেকেই ভুল করে টিউমার মনে করেন। তাই স্বাভাবিক গঠন সম্পর্কে ধারণা থাকা জরুরি।

প্রতিটি পুরুষের মাসে অন্তত একবার অণ্ডকোষ পরীক্ষা করা উচিত। গোসলের পর এ পরীক্ষা সবচেয়ে সহজ হয়, কারণ তখন অণ্ডথলির চামড়া শিথিল থাকে।

পরীক্ষার সময় অণ্ডকোষে কোনো শক্ত গুটি, অস্বাভাবিক ফোলা, আকারের পরিবর্তন বা অস্বাভাবিক অনুভূতি আছে কি না তা লক্ষ্য করতে হবে।

বিশেষজ্ঞরা কয়েকটি লক্ষণকে সতর্ক সংকেত হিসেবে বিবেচনা করেন।

এর মধ্যে রয়েছে—

  • অণ্ডকোষে শক্ত ও বেদনাহীন গুটি
  • অণ্ডকোষের আকার অস্বাভাবিকভাবে বড় হয়ে যাওয়া
  • ব্যথা বা স্পর্শে অস্বস্তি
  • একটি অণ্ডকোষের আকার হঠাৎ ছোট হয়ে যাওয়া
  • অণ্ডথলি বা কুঁচকির অংশে ফোলা

এসব লক্ষণের যে কোনোটি দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

চিকিৎসকদের তথ্য অনুযায়ী, ১৫ থেকে ৩৫ বছর বয়সী পুরুষদের মধ্যে টেস্টিকুলার ক্যান্সারের ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি।

যাদের জন্মের সময় অণ্ডকোষ অণ্ডথলিতে নেমে আসেনি, পরিবারে এ রোগের ইতিহাস রয়েছে অথবা আগে একবার ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়েছেন, তাদের ঝুঁকি বেশি হতে পারে।

তবে আশার কথা হলো, প্রাথমিক পর্যায়ে রোগটি শনাক্ত করা গেলে চিকিৎসার মাধ্যমে অধিকাংশ রোগী সুস্থ জীবনযাপন করতে পারেন।

অণ্ডকোষের স্বাস্থ্য রক্ষায় তাপমাত্রা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

দীর্ঘ সময় গরম পানিতে বসে থাকা, অতিরিক্ত সাউনা ব্যবহার, খুব টাইট অন্তর্বাস পরা এবং দীর্ঘক্ষণ কোলে ল্যাপটপ রেখে কাজ করার অভ্যাস কমানোর পরামর্শ দেন।

যৌনবাহিত বিভিন্ন সংক্রমণ অণ্ডকোষ ও এর আশপাশের অঙ্গগুলোকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। বিশেষ করে এপিডিডাইমিসে প্রদাহ হলে ব্যথা, ফোলা ও অস্বস্তি দেখা দিতে পারে।

নিরাপদ যৌন আচরণ এবং প্রয়োজন হলে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা এ ধরনের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে।

স্ব-পরীক্ষায় কোনো অস্বাভাবিকতা ধরা পড়লে এক সপ্তাহের মধ্যে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

তবে অণ্ডকোষে হঠাৎ তীব্র ব্যথা শুরু হলে তা জরুরি অবস্থা হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। এটি টেস্টিকুলার টর্সন হতে পারে, যেখানে অণ্ডকোষে রক্ত সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। দ্রুত চিকিৎসা না হলে অণ্ডকোষ স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

অণ্ডকোষের স্বাস্থ্য নিয়ে লজ্জা বা সংকোচের কোনো কারণ নেই। বরং নিয়মিত স্ব-পরীক্ষা, স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন এবং প্রয়োজন হলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়াই পুরুষদের সুস্থতা ও প্রজনন ক্ষমতা রক্ষার সবচেয়ে কার্যকর উপায়।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *