বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম শক্তিধর দেশ ইংল্যান্ড। বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ফুটবল লিগের আবাসও দেশটি। কিন্তু জাতীয় দলের সাফল্যের খাতা তুলনামূলকভাবে ফাঁকা। ১৯৬৬ সালে বিশ্বকাপ জয়ের পর আর কোনো বড় আন্তর্জাতিক শিরোপা জিততে পারেনি ইংল্যান্ড।
গত কয়েক দশকে ইংল্যান্ডের হয়ে খেলেছেন বিশ্বের সেরা অনেক ফুটবলার। গ্যারি লিনেকার, ডেভিড বেকহ্যাম, পল স্কোলস, মাইকেল ওয়েন, জন টেরি, রিও ফার্দিনান্দ, অ্যাশলি কোল ও ওয়েইন রুনির মতো তারকারা জাতীয় দলের জার্সি গায়ে মাঠে নেমেছেন। তবুও বড় টুর্নামেন্টের নকআউট পর্বে বারবার হতাশা সঙ্গী হয়েছে ইংল্যান্ডের।
বিশেষ করে ইউরো ২০২০-এর ফাইনাল এখনো ইংলিশ সমর্থকদের মনে দুঃখের স্মৃতি হয়ে আছে। ইতালির বিপক্ষে টাইব্রেকারে পরাজয়ের ফলে আরেকটি বড় শিরোপা হাতছাড়া হয় তাদের।
তবে বর্তমান ইংল্যান্ড দলকে ঘিরে আবারও আশার আলো দেখছেন সমর্থকরা। দলটির আক্রমণভাগে আছেন অধিনায়ক হ্যারি কেইন। বিশ্বের অন্যতম সেরা স্ট্রাইকার হিসেবে বিবেচিত এই ফুটবলার গোল করার অসাধারণ দক্ষতার জন্য পরিচিত। ছোট বক্সে তার উপস্থিতি সবসময়ই প্রতিপক্ষের জন্য বড় হুমকি।
ডান প্রান্তে আছেন সৃজনশীল উইঙ্গার বুকায়ো সাকা। মিডফিল্ডে রয়েছেন ডেকলান রাইস ও জুড বেলিংহাম। রাইস যেমন খেলার গতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন, তেমনি বেলিংহাম আক্রমণ ও রক্ষণ—দুই বিভাগেই সমান কার্যকর। মাঠের প্রায় সব জায়গাতেই তার প্রভাব দেখা যায়।
বিশ্লেষকদের মতে, কাগজে-কলমে ইংল্যান্ডের মিডফিল্ড বিশ্বসেরাদের মধ্যে অন্যতম। একই সঙ্গে আক্রমণভাগেও রয়েছে প্রচুর গোল করার সামর্থ্য। সাম্প্রতিক মৌসুমে ইংলিশ ফরোয়ার্ডদের ক্লাব পর্যায়ের পারফরম্যান্সও ছিল চোখে পড়ার মতো।
তবে উদ্বেগের জায়গাও রয়েছে। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন রক্ষণভাগ নিয়ে। মার্ক গুইহি আন্তর্জাতিক বড় মঞ্চে এখনো পুরোপুরি পরীক্ষিত নন। জন স্টোনস অভিজ্ঞ হলেও তার ক্যারিয়ারের সেরা সময় পেছনে ফেলে এসেছেন। ফলে শক্তিশালী আক্রমণভাগের দলগুলোর বিপক্ষে ইংল্যান্ডের ডিফেন্স চাপে পড়তে পারে।
আধুনিক ফুটবলে অফসাইড ট্র্যাপ গুরুত্বপূর্ণ কৌশল। কিন্তু ইংল্যান্ডের বর্তমান রক্ষণভাগে সেই সমন্বয় নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। হাই-লাইন ডিফেন্স খেলতে গেলে সামান্য ভুলেও বড় মূল্য দিতে হতে পারে।
গোলরক্ষক পজিশন নিয়েও আলোচনা আছে। জর্ডান পিকফোর্ড দীর্ঘদিন ধরে ইংল্যান্ডের এক নম্বর গোলরক্ষক। তবে তার কিছু ভুল সিদ্ধান্ত ও অনিয়মিত পারফরম্যান্স নিয়ে সমালোচনা রয়েছে। বিকল্প হিসেবে ডিন হেন্ডারসনের নামও আলোচনায় এসেছে। উচ্চতা ও দ্রুত প্রতিক্রিয়ার কারণে তাকে সম্ভাবনাময় মনে করেন অনেকে।
এবারের ইংল্যান্ড দলের সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে কোচিং বেঞ্চে। প্রথমবারের মতো একজন জার্মান কোচের হাতে দায়িত্ব দিয়েছে ইংল্যান্ড। সাবেক চেলসি, প্যারিস সেন্ট-জার্মেইন ও বরুসিয়া ডর্টমুন্ড কোচ টমাস টুখেল এখন জাতীয় দলের প্রধান কোচ।
টুখেল আক্রমণাত্মক ও উচ্চগতির ফুটবলের সমর্থক। তার দল সাধারণত উচ্চ প্রেসিং, দ্রুত আক্রমণ এবং হাই-লাইন ডিফেন্সে বিশ্বাস করে। এমন কৌশল বাস্তবায়নে শারীরিকভাবে শক্তিশালী ও পরিশ্রমী ফুটবলার প্রয়োজন হয়।
দলে আইভান টনির অন্তর্ভুক্তি অনেকের কাছেই সেই কৌশলের ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে। অন্যদিকে কোল পালমার ও ফিল ফোডেনের অনুপস্থিতি আলোচনার জন্ম দিয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে ইংল্যান্ডের সবচেয়ে সৃজনশীল খেলোয়াড়দের মধ্যে ছিলেন তারা। তবে টুখেল সম্ভবত শারীরিক সক্ষমতা ও বর্তমান ফর্মকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন।
ফলে ধারণা করা হচ্ছে, এবার ইংল্যান্ড নান্দনিক ফুটবলের চেয়ে ফলনির্ভর ফুটবলে বেশি মনোযোগ দেবে। সৃজনশীলতার বদলে গতি, শক্তি ও কার্যকারিতাকে অগ্রাধিকার দিতে পারেন টুখেল।
সব মিলিয়ে ইংল্যান্ডের সামনে সুযোগ রয়েছে দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটানোর। তবে সেই স্বপ্ন পূরণ করতে হলে আক্রমণভাগের শক্তিকে কাজে লাগানোর পাশাপাশি রক্ষণভাগের দুর্বলতাও কাটিয়ে উঠতে হবে। প্রায় ছয় দশকের শিরোপাখরা শেষ করার চাপ এবারও ইংল্যান্ডের কাঁধে। এখন দেখার বিষয়, টমাস টুখেলের অধীনে তারা ইতিহাসের নতুন অধ্যায় লিখতে পারে কি না।