ট্রাম্পের রোষে ম্যাসির পতন

রিপাবলিকান দলে ভিন্নমতের জায়গা কি আরও সংকুচিত হলো?

যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য থমাস ম্যাসি—যিনি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প–এর অন্যতম প্রধান রিপাবলিকান সমালোচক হিসেবে পরিচিত ছিলেন—নিজ দলের প্রাইমারিতেই হেরে গেছেন। মঙ্গলবার (১৯শে মে) কেন্টাকির ৪র্থ কংগ্রেসনাল ডিস্ট্রিক্টের রিপাবলিকান প্রাইমারিতে ট্রাম্প–সমর্থিত প্রার্থী এড গ্যালরিন তাকে পরাজিত করেন।

গত কয়েক সপ্তাহে ট্রাম্প–সমর্থিত প্রার্থীদের ধারাবাহিক জয়ের মধ্যে এটি ছিল সবচেয়ে আলোচিত ফলাফলগুলোর একটি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ফলাফল আবারও দেখাল—জাতীয় পর্যায়ে ট্রাম্পকে ঘিরে বিতর্ক থাকলেও রিপাবলিকান প্রাইমারি ভোটারদের ওপর তার নিয়ন্ত্রণ এখনো অত্যন্ত শক্তিশালী।

২০১২ সাল থেকে কেন্টাকির ৪র্থ কংগ্রেসনাল ডিস্ট্রিক্টের প্রতিনিধি ছিলেন ম্যাসি। তিনি রিপাবলিকান পার্টির ভেতরে লিবার্টেরিয়ান–ঘরানার একজন ব্যতিক্রমী কণ্ঠস্বর হিসেবে পরিচিত ছিলেন। দলীয় অবস্থানের বাইরে গিয়ে ভোট দেওয়ার কারণে তিনি বহুবার আলোচনায় এসেছেন।

ট্রাম্পের সঙ্গে তার দ্বন্দ্বের শুরু ২০২০ সালে। সে সময় ২ ট্রিলিয়ন ডলারের কোভিড–১৯ সহায়তা প্যাকেজে রেকর্ডেড ভোট চেয়ে বসেন ম্যাসি। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে ট্রাম্প তাকে “থার্ড-রেট গ্র্যান্ডস্ট্যান্ডার” বলে আক্রমণ করেছিলেন।

সম্প্রতি ম্যাসি ট্রাম্পের বহুল আলোচিত “ওয়ান বিগ বিউটিফুল বিল”–এর বিরুদ্ধে ভোট দেওয়া মাত্র দুই রিপাবলিকানের একজন ছিলেন। তিনি ইরান যুদ্ধের সমালোচনা করেন এবং জেফ্রি এপস্টেইন–সংক্রান্ত নথি প্রকাশের দাবিতে আনা বিলের সহ–প্রস্তাবকও ছিলেন।

প্রাইমারির শেষ মুহূর্তে ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ম্যাসিকে “আমাদের দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে খারাপ কংগ্রেসম্যান”, “প্যাথেটিক লুজার” এবং “টোটাল ডিজাস্টার” বলে আক্রমণ করেন।

অন্যদিকে এড গ্যালরিন একজন ডেইরি ফার্মার ও অবসরপ্রাপ্ত নেভি সিল ক্যাপ্টেন। ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ সমর্থক হিসেবে তিনি প্রচারণা চালান এবং প্রকাশ্যে প্রেসিডেন্টের প্রতি পূর্ণ আনুগত্যের প্রতিশ্রুতি দেন।

বিজয় ভাষণে গ্যালরিন প্রথমেই ট্রাম্পকে ধন্যবাদ জানান। তিনি প্রেসিডেন্টের এজেন্ডা এগিয়ে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। তার বক্তব্য স্থায়ী হয় মাত্র পাঁচ মিনিট।

এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল মার্কিন ইতিহাসের সবচেয়ে ব্যয়বহুল হাউস প্রাইমারিগুলোর একটি। প্রচারণায় ৩ কোটি ২০ লাখ ডলারের বেশি অর্থ ব্যয় হয়েছে।

বিশেষ করে ম্যাসির বিরুদ্ধে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করে প্রো–ইসরায়েল গ্রুপগুলো। কারণ, তিনি যুক্তরাষ্ট্রের বিদেশি সহায়তা প্যাকেজের বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছিলেন। রিপাবলিকান জিউইশ কোয়ালিশন ভিক্টরি ফান্ডসহ একাধিক সংগঠন এই নির্বাচনে সক্রিয়ভাবে অর্থ ব্যয় করে।

পরাজয়ের ভাষণে ম্যাসি এ প্রসঙ্গে কটাক্ষ করে বলেন, “আমি আগেই বের হতাম। কিন্তু আমার প্রতিদ্বন্দ্বীকে ফোন করে পরাজয় স্বীকার করতে হয়েছে, আর তেল আবিবে এড গ্যালরিনকে খুঁজে পেতে কিছুটা সময় লেগে গেল।”

এনবিসি নিউজের প্রজেকশন অনুযায়ী, গ্যালরিন পেয়েছেন ৫৪ দশমিক ৯ শতাংশ ভোট। ম্যাসি পেয়েছেন ৪৫ দশমিক ১ শতাংশ।

গ্যালরিনের জয়ের মূল ভিত্তি ছিল বুন, কেন্টন, ক্যাম্পবেল ও ওল্ডহাম কাউন্টিতে শক্ত অবস্থান। ম্যাসি নিজের ঘাঁটি লুইস কাউন্টিতে এগিয়ে থাকলেও ২০২২ সালের তুলনায় সেখানে তার ব্যবধান উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।

ম্যাসির পরাজয়ের পর ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন,“সে একজন খারাপ লোক ছিল। সে হারারই যোগ্য।”

ট্রাম্পের মুখপাত্র স্টিভেন চেউং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লেখেন, “প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এবং তার রাজনৈতিক ক্ষমতা নিয়ে কখনোই সন্দেহ করবেন না।”

ট্রাম্পের ২০২৪ সালের সহ–ক্যাম্পেইন ম্যানেজার ক্রিস লাসিভিটা ম্যাসিকে ট্যাগ করে ট্রাম্পের মধ্যমা প্রদর্শনের একটি ছবি পোস্ট করেন।

প্রাইমারির আগের দিন ট্রাম্প প্রশাসনের প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথ–কে গ্যালরিনের পক্ষে প্রচারণায় পাঠানো হয়। পর্যবেক্ষকদের মতে, এটি প্রতিরক্ষা বিভাগকে দলীয় রাজনীতি থেকে দূরে রাখার দীর্ঘদিনের নীতির একটি ব্যতিক্রমী ঘটনা।

পরাজয়ের পর ম্যাসি ২০ মিনিটের বেশি সময় ধরে বক্তব্য দেন—যা পরাজিত প্রার্থীদের ক্ষেত্রে খুবই অস্বাভাবিক। বক্তব্যে তিনি এপস্টেইন ফাইলস, ইরান যুদ্ধ, দ্বিদলীয় রাজনীতি এবং নির্বাচনী ব্যয়ের প্রসঙ্গ তোলেন। শেষে রসিকতা করে বলেন, “আমার এখন একটা মেডিকেল মার্গারিটা দরকার।”

কংগ্রেসে ট্রাম্পের প্রতি অন্ধ আনুগত্যের সমালোচনা করে ম্যাসি বলেন, “আইনসভা যদি সব সময় প্রেসিডেন্টের সঙ্গে ভোট দেয়, তাহলে আমাদের একজন রাজা আছে। কিন্তু যদি আইনপ্রণেতারা সংবিধান অনুসরণ করেন, তাহলে আমাদের একটি প্রজাতন্ত্র আছে।”

তার সমর্থকেরা তখন “নো মোর ওয়ারস!” এবং “আমেরিকা ফার্স্ট!” স্লোগান দিচ্ছিলেন। ম্যাসি ২০২৮ সালে আবার নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করারও ইঙ্গিত দেন।

ম্যাসির এই পরাজয় সাম্প্রতিক একটি বড় রাজনৈতিক ধারার অংশ। এর আগে লুইজিয়ানার সিনেটর বিল ক্যাসিডি—যিনি ট্রাম্পের দ্বিতীয় অভিশংসনের পক্ষে ভোট দিয়েছিলেন—নিজ প্রাইমারিতে পরাজিত হন। একইভাবে ইন্ডিয়ানার কয়েকজন স্টেট সিনেটরও ট্রাম্পের রিডিস্ট্রিক্টিং পরিকল্পনার বিরোধিতা করে নির্বাচনে হেরে যান।

বিশ্লেষকদের মতে, এসব ফলাফল দেখাচ্ছে—জাতীয় জনপ্রিয়তায় ওঠানামা থাকলেও রিপাবলিকান প্রাইমারির ভেতরে ট্রাম্পের প্রভাব এখনো নির্ধারক শক্তি হিসেবে কাজ করছে। ম্যাসির মতো আটবারের নির্বাচিত একজন কংগ্রেসম্যানও সেই ঢেউ সামাল দিতে পারেননি।

ক্রেস্টউডের বাসিন্দা জর্জ শেরজার, যিনি আগে ম্যাসির সমর্থক ছিলেন, এবার গ্যালরিনকে ভোট দিয়েছেন। তার ভাষায়, “তার কিছু ভোট আমার কাছে কোনো অর্থই করত না।”

অন্যদিকে ম্যাসির সমর্থক জেনিন থমাস বলেন, “তিনি ট্রাম্পের মতোই কিছু প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন এবং সেগুলো ধরে রেখেছিলেন। দুর্ভাগ্যজনকভাবে তিনি তার জন্য শাস্তি পেয়েছেন।”

আগামী নভেম্বরে গ্যালরিন সাধারণ নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী মেলিসা স্ট্রেঞ্জ–এর মুখোমুখি হবেন। তবে গভীরভাবে রিপাবলিকান–অধ্যুষিত এই জেলায় তার জয় প্রায় নিশ্চিত বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

ম্যাসির পতন রিপাবলিকান পার্টির ভেতরে ট্রাম্প–বিরোধী কণ্ঠগুলোর জন্য একটি স্পষ্ট সতর্কবার্তা হিসেবেই দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে যারা ইরান যুদ্ধের বিরোধিতা করেছেন বা এপস্টেইন ফাইলস নিয়ে প্রশাসনের অবস্থানের সমালোচনা করেছেন, তাদের জন্য এই ফলাফল নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার ইঙ্গিত বহন করছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *