ঢাকার রাস্তা কার—হকার, নাকি জনগণের?

ঢাকার যানজট নতুন কোনো সমস্যা নয়। তবে সাম্প্রতিক কিছু সিদ্ধান্ত পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে—এমন অভিযোগ উঠছে নগর বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে। বিশেষ করে সড়কে হকার বসানো ও নিয়ন্ত্রণ নীতির প্রশ্নে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।

সাম্প্রতিক সময়ে রাজধানীতে হকার উচ্ছেদে অভিযান চালানো হয়। এতে কিছুটা স্বস্তি ফেরে পথচারী ও চালকদের মধ্যে। ফুটপাত আংশিকভাবে খালি হয়। কিছু এলাকায় যান চলাচলও স্বাভাবিক হতে শুরু করে। তবে এই অভিযান বেশিদিন স্থায়ী হয়নি।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন পরে উল্টো পথে হাঁটে। সড়কে সাদা দাগ টেনে হকারদের জন্য নির্দিষ্ট স্থান চিহ্নিত করার উদ্যোগ নেয়। বলা হচ্ছে, এতে শৃঙ্খলা ফিরবে। হকাররাও নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে ব্যবসা করবেন। তবে এই উদ্যোগ ঘিরে একাধিক প্রশ্ন উঠেছে।

প্রথম প্রশ্নটি আইনি। নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, রাস্তা ও ফুটপাত মূলত যান ও পথচারীদের চলাচলের জন্য নির্ধারিত। এটি জনসাধারণের সম্পদ। সেই জায়গা কোনো গোষ্ঠীর মধ্যে বণ্টন করা আইনগতভাবে কতটা বৈধ—তা প্রশ্নসাপেক্ষ। স্থানীয় সরকার আইন ও সড়ক ব্যবস্থাপনা নীতিতে এমন অনুমতির স্পষ্ট ভিত্তি নেই বলে অনেকেই মনে করেন।

দ্বিতীয়ত, অবৈধ দখলকে আংশিক বৈধতা দেওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে ফুটপাত দখল করে ব্যবসা করা একটি বাস্তবতা। কিন্তু এটিকে স্বীকৃতি দিলে ভবিষ্যতে আরও মানুষ একই পথে আসতে পারে। এতে শহরের অন্যান্য সড়কও দখলের ঝুঁকিতে পড়বে।

তৃতীয়ত, বাস্তবায়ন সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন আছে। রাজধানীতে বহু বৈধ দোকানও নিয়ম ভেঙে ফুটপাত দখল করে। অনেক ক্ষেত্রে সড়কের অংশও ব্যবহার করা হয়। সেখানে হকারদের নির্দিষ্ট লাইনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা কতটা সম্ভব—তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন বিশ্লেষকরা।

যানজটের আরেকটি বড় কারণ হিসেবে ব্যাটারিচালিত রিকশার প্রসঙ্গও এসেছে। প্রধান সড়কে এসব যান চলাচল নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিকল্পনাহীনভাবে এসব যান চললে সড়কের গতি কমে যায়। এতে জট আরও বাড়ে।

পরিবহন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঢাকার সমস্যা বিচ্ছিন্ন নয়। এটি সমন্বিত নগর ব্যবস্থাপনার ঘাটতির ফল। ফুটপাত দখল, অবৈধ পার্কিং, নিয়ন্ত্রণহীন গণপরিবহন—সব মিলিয়ে একটি জটিল চিত্র তৈরি হয়েছে। একক কোনো পদক্ষেপ দিয়ে এর সমাধান সম্ভব নয়।

তারা পরামর্শ দিচ্ছেন, হকারদের জন্য বিকল্প অনেকগুলো মার্কেট ইতোমধ্যেই তৈরি করা হয়েছে। বেশীরভাগ হকাররা নিজেদের বরাদ্দপ্রাপ্ত দোকান ভাড়া দিয়ে আবার ফুটপাত দখলে নিয়ে বসে পড়েছে। তাদের নির্দিষ্ট মার্কেটে  তুলতে হবে। একই সঙ্গে কঠোরভাবে ফুটপাত ও সড়ক দখলমুক্ত রাখতে হবে। আইন প্রয়োগে ধারাবাহিকতা জরুরি।

ঢাকার নাগরিকরা এখন কার্যকর সমাধান চান। নীতির দোলাচল নয়, বাস্তব পদক্ষেপ দেখতে চান তারা। এখন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময়—রাস্তা কি জনগণের চলাচলের জন্য থাকবে, নাকি ধীরে ধীরে দখলের সংস্কৃতি স্বীকৃতি পাবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *