মানুষটিকে দেখ: যেখানে অক্ষমতা নয়, জয় হয় মানুষের আত্মার

৩০ এপ্রিল, বৃহস্পতিবার । রাজধানীর যমুনা ব্লকবাস্টার সিনেপ্লেক্সে আজ যেন একটু অন্যরকম নিস্তব্ধতা। কারণটা আর কিছু নয়, সেন্টার ফর দ্য রিহ্যাবিলিটেশন অব দ্য প্যারালাইজড (সিআরপি)-এর অর্থায়নে নির্মিত চলচ্চিত্র ‘মানুষটিকে দেখ (See The Person)’-এর প্রিমিয়ার শো।

জীবন বড় অদ্ভুত। আমরা চোখের সামনে কত কী দেখি, অথচ কত কিছু আমাদের অদেখাই থেকে যায়। বিশেষ করে যাদের শরীরটা একটু ভিন্ন, যাদের চলার গতি আমাদের মতো দ্রুত নয়—তাদের আমরা প্রায়ই দেখি কিন্তু ‘দেখি না’। এই না দেখার দেয়াল ভাঙার এক অনন্য প্রচেষ্টা এই চলচ্চিত্র।

ব্রিটিশ লেখক ও নির্মাতা এলসপেথ ওয়েলডির চিত্রনাট্যে এই সিনেমাটি কেবল বিনোদনের জন্য নয়, বরং এক টুকরো আয়নার মতো। আয়নাটা ধরা হয়েছে আমাদের সমাজের দিকে। গল্পের কেন্দ্রে ফরিদা আহমেদ নামের এক তরুণী, যে সেরিব্রাল পালসির সাথে লড়াই করছে। ফরিদার চরিত্রে রাশনা শারমিন কেমির অভিনয় দেখলে মনে হবে, মানুষের ইচ্ছাশক্তি আসলে কত অজেয় হতে পারে। সমাজের তাচ্ছিল্য আর অবহেলার কাঁটা ডিঙিয়ে সে যখন এগিয়ে চলে, তখন পাশে এসে দাঁড়ায় ফিরোজ মাহমুদ—পথশিশুদের নিয়ে কাজ করা এক স্বপ্নবাজ মানুষ। তাদের এই সম্পর্কের টানাপোড়েন আর সামাজিক বাস্তবতার দেয়ালগুলো যেন আমাদেরই চেনা কোনো গল্পের কথা মনে করিয়ে দেয়।

সিনেমাটি কোনো বাণিজ্যিক মশলায় তৈরি নয়, এটি একটি বক্তব্যধর্মী কাজ। আর এই কাজটিকে রূপ দিতে যারা সামনে থেকে কাজ করেছেন, তাদের মধ্যে তারিক আনাম খান, মামুনুর রশীদ, গাজী রাকায়েত, শতাব্দী ওয়াদুদ, মিলি বাশার, কাজী নওশাবা ও লারা লোটাসের মতো অভিনয়শিল্পীদের উপস্থিতি ছবিটিকে এক অন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। বিশেষ করে সিআরপি’র প্রতিষ্ঠাতা ভ্যালেরি এ. টেইলরের উপস্থিতি অনুষ্ঠানটিকে এক ধরনের পবিত্রতা দিয়েছে।

নির্মাতা গাজী রাকায়েত এর আগেও ‘মৃত্তিকা মায়া’ আর ‘গোর’-এর মতো চলচ্চিত্রের মাধ্যমে প্রমাণ করেছেন, তিনি গল্প বলাটা ভালো বোঝেন। নিজের তৃতীয় এই চলচ্চিত্রটি নিয়ে তিনি আশাবাদী। তার কণ্ঠে এক ধরনের তৃপ্তি ছিল—মানুষ কি কখনো নিজেকে পুরোপুরি চিনতে পারে? এই সিনেমার মাধ্যমে হয়তো দর্শকরা নিজেদের অন্যভাবে চিনতে পারবেন।

প্রযোজক হুমায়ূন ফরিদের আন্তরিকতায় আর পুরো টিমের পরিশ্রমে সিনেমাটি শুধু সেন্সর ছাড়পত্রই পায়নি, ট্রেলার প্রকাশের পর থেকেই দর্শকের মনে কৌতূহল তৈরি করেছে। উত্তম গুহের শিল্প নির্দেশনা, রাজীবুলের সিনেমাটোগ্রাফি আর সৈয়দ সাবাব আলী  আরজুর আবহসংগীত মিলে সিনেমাটি যেন একটি আস্ত স্বপ্ন বুনন।

সকাল সাড়ে দশটায় ‘মিট দ্য প্রেস’-এর আয়োজন ছিল, সেখানেও ছিল একরাশ আন্তরিকতা। সমাজের কুসংস্কার দূর করে গণসচেতনতা তৈরির যে কঠিন ব্রত সিআরপি নিয়েছে, তা এই চলচ্চিত্রের মধ্য দিয়ে মানুষের হৃদয়ে পৌঁছাবে—এমনটাই প্রত্যাশা।

সবশেষে একটা কথা না বললেই নয়, আমরা কি আসলেই মানুষটিকে দেখি? নাকি শুধু তার শারীরিক সীমাবদ্ধতা দেখি? ‘মানুষটিকে দেখ’ সিনেমাটি আমাদের সেই প্রশ্নটিই করে। প্রিমিয়ার শেষে যখন দর্শক হল থেকে বেরিয়ে আসছিলেন, তাদের চোখেমুখে ছিল এক ধরনের গভীরতা। হয়তো সিনেমাটি শেষ হয়েও শেষ হয়নি, দর্শকের মনের ভেতর কোনো এক কোণে তা সুরের মতো বেজে চলেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *