ভারতের আধুনিক ইতিহাসের সবচেয়ে বিশ্বস্ত প্রত্যক্ষদর্শী, প্রখ্যাত আলোকচিত্রী রঘু রায়ের প্রস্থানে ভারত হারাল তার দৃষ্টি। দিল্লির একটি বেসরকারি হাসপাতালে রবিবার (২৬শে জুলাই) তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। বয়স হয়েছিল ৮৩ বছর।
খবরটি নিশ্চিত করেছেন তার মেয়ে অবনী রায়। তিনি জানান, বাবা লিম্ফোমার চিকিৎসা নিচ্ছিলেন। পুত্র নিতিন রায়ের বক্তব্য, দুই বছর ধরে ক্যানসারের সঙ্গে লড়াই করছিলেন তিনি। প্রথমে প্রোস্টেট ক্যানসার, তারপর পেটে ছড়িয়ে পড়ে, সব কিছু জয় করেও শেষ পর্যন্ত ব্রেইনে ছড়িয়ে পড়া ক্যানসার ও বার্ধক্যজনিত সমস্যার কাছে হার মানতে হয় তাকে।
১৯৪২ সালে ব্রিটিশ ভারতের ঝং, পাঞ্জাবে (বর্তমানে পাকিস্তান) জন্মগ্রহণ করেন রঘু রায়। ১৯৬২ সালে বড় ভাই, আলোকচিত্রী এস পলের হাত ধরে শুরু হয় তার ক্যামেরার যাত্রা।
১৯৬৫ সালে তিনি যোগ দেন দ্য স্টেটসম্যান-এ। এই সময়েই তিনি ব্রিটিশ ব্যান্ড দ্য বিটলসের মহর্ষি মহেশ যোগীর আশ্রম পরিদর্শনের মুহূর্ত ক্যামেরাবন্দি করেন।
১৯৭৬ সালে স্টেটসম্যান ছেড়ে সাপ্তাহিক ম্যাগাজিন সানডে-তে যোগ দেন তিনি। ১৯৭৭ সালে ফরাসি আলোকচিত্রী অঁরি কার্তিয়ে-ব্রেসোঁ-এর মনোনয়নে তিনি বিশ্বখ্যাত ম্যাগনাম ফটোস-এর সদস্য পদ লাভ করেন।
১৯৮০ সালে সানডে ছেড়ে তিনি যোগ দেন ইন্ডিয়া টুডে-তে। সেখানে তিনি ছবি সম্পাদক ও আলোকচিত্রী হিসেবে কাজ করেন।
রঘু রায়ের ক্যামেরা যেন ভারতের বিবেক। তিনি কেবল ছবি তুলতেন না, তিনি সময়কে বন্দি করতেন।
ভোপাল গ্যাস দুর্ঘটনা (১৯৮৪): মানবসভ্যতার সবচেয়ে ভয়াবহ শিল্প দুর্ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন তিনি। পরে এক্সপোজার: আ কর্পোরেট ক্রাইম বইটি লিখে এই ট্র্যাজেডির দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব তুলে ধরেন।
বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ: তার এই কভারেজের জন্য ১৯৭২ সালে তিনি পদ্মশ্রী পুরস্কারে ভূষিত হন।
তার ক্যামেরায় ধরা পড়েছে দালাই লামার নির্মল ধার্মিকতা, মাদার তেরেসার অসীম করুণা, সত্যজিৎ রায়ের নীরব কথা, আর ইন্দিরা গান্ধীর ক্ষমতার আসনে বসে কাগজে সই করার মুহূর্ত—যেখানে তার সব পুরুষ মন্ত্রীরা, দাঁড়িয়ে আছেন পাশে।
আরও আছে সেই অমর ফ্রেম—একজন অন্ধ মুসলিম ভিক্ষুক এক মানসিকভাবে প্রতিবন্ধী হিন্দু মেয়ের কাঁধে ভর দিয়ে পথ চলছেন। আর একটিতে, চলন্ত ট্রেনের দরজায় ঝুঁকে থাকা এক চাওয়ালার ট্রে, কাপ ও সসার নিয়ে ভারসাম্য রক্ষার সংগ্রাম।
রঘু রায় ১৮টিরও বেশি বই প্রকাশ করেছেন ভারতের মানুষ, সংস্কৃতি ও শহর নিয়ে—যার মধ্যে রঘু রায়’স ইন্ডিয়া: রিফ্লেকশন্স ইন কালার এবং রিফ্লেকশন্স ইন ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট উল্লেখযোগ্য। তার কাজ প্রকাশিত হয়েছে টাইম, লাইফ, নিউইয়র্ক টাইমস, নিউজউইক এবং নিউ ইয়র্কার-এর মতো বিশ্বখ্যাত পত্রিকায়। ২০১৭ সালে তিনি লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট অ্যাওয়ার্ডও লাভ করেন।
কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খার্গে তাকে ভারতীয় আলোকচিত্রের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র হিসেবে বর্ণনা করেছেন, যার কাজ—বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধের কভারেজ থেকে জাতীয় নেতাদের প্রতিকৃতি—ভারতের দৃশ্যমান স্মৃতির অংশ হয়ে আছে।
সাবেক দিল্লি উপমুখ্যমন্ত্রী মনীশ সিসোদিয়া বলেছেন, রঘু রায় “ভারতের আত্মা” ধরে রেখেছেন—যুদ্ধক্ষেত্র থেকে দৈনন্দিন জীবন পর্যন্ত, তার ছবিগুলো সত্য ও ইতিহাসের চিরস্থায়ী রেকর্ড।
রঘু রায় একবার বলেছিলেন, “ভাষা সত্যকে ঢেকে রাখতে পারে। কিন্তু একটা ছবি কখনো মিথ্যা বলে না।” তার হাজারো ছবি—কখনো নীরব আশাবাদে, কখনো গভীর হতাশায়—ভারতকে বলেছে সত্যি কথা। আর সেই সত্য এখন চিরকালের জন্য বন্দি হয়ে আছে তার ফ্রেমে।