বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে নতুন অধ্যায় শুরু হতে যাচ্ছে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র চালুর মধ্য দিয়ে। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর এই প্রকল্প এখন উৎপাদনের দ্বারপ্রান্তে। একে ঘিরে যেমন আশা তৈরি হয়েছে, তেমনি রাজনৈতিক বিতর্কও তীব্র হয়েছে।
পরমাণু শক্তি মূলত দুইভাবে উৎপন্ন হয়—নিউক্লিয়ার ফিশন ও ফিউশন। ফিশন প্রক্রিয়ায় একটি ভারী অস্থিতিশীল পরমাণু ভেঙে ছোট পরমাণুতে পরিণত হয়। এই ভাঙনের সময় শক্তি নির্গত হয়। অন্যদিকে ফিউশন প্রক্রিয়ায় দুটি হালকা পরমাণু একত্রিত হয়ে ভারী পরমাণু তৈরি করে। এখানেও শক্তি উৎপন্ন হয়। উভয় ক্ষেত্রেই সামান্য ভর শক্তিতে রূপান্তরিত হয়। এই ধারণা ব্যাখ্যা করেছিলেন আলবার্ট আইনস্টাইন তাঁর বিখ্যাত সমীকরণ E=mc² এর মাধ্যমে। এই সমীকরণ দেখায়, অল্প ভর থেকেও বিপুল শক্তি পাওয়া সম্ভব।
বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন দীর্ঘদিন ধরে আমদানিকৃত জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়লে দেশের ওপর চাপ পড়ে। সাম্প্রতিক বৈশ্বিক অস্থিরতায় এই সংকট আরও প্রকট হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে রূপপুর প্রকল্পকে বড় সমাধান হিসেবে দেখা হচ্ছে। একটি ইউনিট চালু হলে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ জ্বালানি তেল সাশ্রয় হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এতে বিদ্যুৎ খাতে স্থিতিশীলতা বাড়বে।
বাংলাদেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ঘিরে জনমনে যেমন আগ্রহ, তেমনি রয়েছে নানা প্রশ্ন—বিশেষ করে নিরাপত্তা নিয়ে। এই প্রকল্পে যে রিয়্যাক্টর প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে, তা হলো রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক সংস্থা রোসাটম-এর তৈরি জেনারেশন-3+ ডিজাইনের VVER-1200। এটি বর্তমানে রাশিয়ার সবচেয়ে উন্নত ও নিরাপদ রিয়্যাক্টর প্রযুক্তিগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত।
রূপপুরে বসানো হচ্ছে এই ধরনের দুটি ইউনিট, প্রতিটির ক্ষমতা ১,২০০ মেগাওয়াট। ফলে মোট উৎপাদন ক্ষমতা দাঁড়াবে ২,৪০০ মেগাওয়াট—যা দেশের বিদ্যুৎ ঘাটতি কমাতে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। প্রতিটি ইউনিট প্রায় ৬০ বছর পর্যন্ত চালানোর উপযোগী, এবং প্রয়োজন হলে আরও ২০ বছর বাড়ানো সম্ভব। এছাড়া রিয়্যাক্টরগুলো প্রায় ১৮ মাস পর্যন্ত রিফুয়েলিং ছাড়াই চলতে সক্ষম।
VVER-1200 এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছে যাতে এটি বড় ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগও সহ্য করতে পারে। প্রায় ৯ মাত্রার ভূমিকম্প, ঘণ্টায় ২১৬ কিলোমিটার গতির ঘূর্ণিঝড় বা টর্নেডো, এমনকি ১০ মিটার উচ্চতার ঢেউ—এসব পরিস্থিতি মাথায় রেখে এর কাঠামো তৈরি করা হয়েছে। এমনকি বিমান দুর্ঘটনার মতো বিরল ঘটনাও বিবেচনায় রাখা হয়েছে।
পারমাণবিক বিদ্যুৎ নিয়ে আলোচনা হলেই অনেকের মনে ফিরে আসে চেরনোবিল দুর্ঘটনা-এর কথা। ১৯৮৬ সালের সেই দুর্ঘটনার পেছনে ছিল তৎকালীন RBMK রিয়্যাক্টর ডিজাইনের গুরুতর ত্রুটি। জরুরি শাটডাউন (AZ-5) চালু করার পরও রিয়্যাক্টর বন্ধ না হয়ে উল্টো বিস্ফোরণ ঘটে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, VVER-1200-এর সঙ্গে সেই পুরনো প্রযুক্তির মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। আধুনিক এই রিয়্যাক্টরে বহুস্তর নিরাপত্তা ব্যবস্থা যুক্ত করা হয়েছে, যা একক কোনো ত্রুটিকে বড় দুর্ঘটনায় রূপ নিতে দেয় না।
VVER-1200 রিয়্যাক্টরে অ্যাক্টিভ (সক্রিয়) ও প্যাসিভ (স্বয়ংক্রিয়) মিলিয়ে চার স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা রয়েছে।
১. অ্যাক্টিভ সেফটি সিস্টেম:
যদি রিয়্যাক্টরে কোনো সমস্যা হয়, তখন ইমারজেন্সি বোরন ইনজেকশন সিস্টেম (EBIS) চালু হয়। এতে বোরনযুক্ত পানি রিয়্যাক্টরে ঢুকিয়ে নিউট্রন শোষণ করা হয়, ফলে চেইন রিয়্যাকশন বন্ধ হয়ে যায়।
২. প্যাসিভ সেফটি—প্রথম স্তর (HA-1):
রিয়্যাক্টরের চাপ কমে গেলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে পানি প্রবেশ করিয়ে তাপ নিয়ন্ত্রণ করে।
৩. প্যাসিভ সেফটি—দ্বিতীয় স্তর (HA-2):
দীর্ঘ সময় ধরে নিয়ন্ত্রিতভাবে পানি সরবরাহ করে, প্রায় ২৪ ঘণ্টা পর্যন্ত কুলিং বজায় রাখতে পারে।
৪. প্যাসিভ সেফটি—তৃতীয় স্তর (HA-3):
সবশেষ ব্যাকআপ হিসেবে কাজ করে। বিদ্যুৎ না থাকলেও প্রায় ৭২ ঘণ্টা পর্যন্ত কুলিং চালু রাখতে সক্ষম।
এই প্যাসিভ সিস্টেমগুলোর বড় বৈশিষ্ট্য হলো—এগুলো চালাতে মানুষের হস্তক্ষেপ বা বিদ্যুৎ প্রয়োজন হয় না।
সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি—যেমন রিয়্যাক্টরের কোর গলে যাওয়া—মোকাবিলায় রয়েছে “কোর মেল্ট ট্র্যাপ”। প্রায় ১৪৪ টনের এই স্টিল কাঠামো গলিত পদার্থকে আটকে রাখে, যাতে তা বাইরে ছড়িয়ে না পড়ে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, VVER-1200 এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছে যাতে একাধিক ব্যর্থতার পরও রিয়্যাক্টর নিরাপদ থাকে। অর্থাৎ একটি সিস্টেম ব্যর্থ হলেও অন্যটি কাজ করবে।
তবে প্রযুক্তি যত উন্নতই হোক, শেষ পর্যন্ত নিরাপত্তা অনেকটাই নির্ভর করে দক্ষ পরিচালনা ও নিয়মিত তদারকির ওপর। সঠিক প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত জনবল ও কঠোর নিরাপত্তা মান বজায় রাখা গেলে, রূপপুর প্রকল্প আগামী কয়েক দশক বাংলাদেশকে স্থিতিশীল বিদ্যুৎ সরবরাহ দিতে পারবে।
বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে এটি শুধু একটি প্রকল্প নয়—বরং প্রযুক্তিগত সক্ষমতার নতুন এক পরীক্ষা।