বিলিয়নিয়ার পরিবারের মেয়ে, গ্র্যান্ড স্ল্যামের স্বপ্ন নিজের লড়াইয়ে

ইউএস ওপেনের সেমিফাইনালে জেসিকা পেগুলো

বাবা বিলিয়নিয়ার। পরিবারের মালিকানায় এনএফএলের বাফেলো বিলস ও এনএইচএলের বাফেলো সেবার্স। অথচ টেনিস কোর্টে জেসিকা পেগুলোর পরিচয় তিনি নিজেই তৈরি করেছেন।

৩২ বছর বয়সী এই মার্কিন টেনিস তারকা এখন বিশ্বের তিন নম্বর খেলোয়াড়। যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষস্থানীয় নারী খেলোয়াড়ও তিনি। আর ২০২৬ ইউএস ওপেনে এসে দাঁড়িয়েছেন আরও একবার ইতিহাসের সামনে। প্রথম গ্র্যান্ড স্ল্যাম শিরোপার জন্য লড়ছেন তিনি।

পেগুলোর গল্প তাই শুধু টেনিসের নয়। এটি সুযোগ, অর্থ, পরিশ্রম এবং নিজের পরিচয় তৈরির গল্প।

পেগুলোর বাবা টেরি পেগুলো যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম ধনী ক্রীড়া প্রতিষ্ঠানের মালিক। ফোর্বসের হিসাবে ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তার সম্পদের পরিমাণ প্রায় ১১.৮ বিলিয়ন ডলার। তেল ও গ্যাস ব্যবসা থেকেই তার মূল সম্পদের ভিত্তি তৈরি হয়।

১৯৮৩ সালে টেরি পেগুলো প্রতিষ্ঠা করেন ইস্ট রিসোর্সেস। ২০১০ সালে কোম্পানিটির বড় অংশ রয়্যাল ডাচ শেলের কাছে ৪.৭ বিলিয়ন ডলারে বিক্রি করেন তিনি। এরপর ক্রীড়া ব্যবসায় প্রবেশ করেন।

২০১১ সালে ১৮৯ মিলিয়ন ডলারে বাফেলো সেবার্স কিনে নেন পেগুলো। তিন বছর পর ১.৪ বিলিয়ন ডলারে বাফেলো বিলসের মালিকানা নেন। সেই দৌড়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প ও জন বন জোভির নেতৃত্বাধীন একটি গ্রুপকেও পেছনে ফেলেছিলেন তিনি।

এই পরিবারের উত্তরাধিকারী জেসিকা। কিন্তু টেনিস কোর্টে তার সাফল্যকে শুধু পারিবারিক সম্পদের ফল হিসেবে দেখার সুযোগও নেই।

জেসিকা পেগুলো এখন পর্যন্ত ১১টি ডব্লিউটিএ একক শিরোপা জিতেছেন। ২০২৬ সালে তার শিরোপা দুটি—দুবাই ও চার্লসটন। চার্লসটনে তিনি টানা দ্বিতীয়বার চ্যাম্পিয়ন হয়েছেন।

চার্লসটন ওপেনে তার পথটিও সহজ ছিল না। প্রথম তিন ম্যাচেই সেট হারিয়েছিলেন। এরপর টানা চারটি তিন সেটের ম্যাচ জিতে ফাইনালে ওঠেন। ফাইনালে ইউলিয়া স্টারোদুবৎসেভাকে ৬-২, ৬-২ গেমে হারিয়ে শিরোপা ধরে রাখেন।

টেনিস থেকে পেগুলোর ক্যারিয়ার পুরস্কারের অর্থও ২৬ মিলিয়ন ডলারের বেশি। আগস্টের শেষ দিকে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, তার ক্যারিয়ার প্রাইজমানি ছিল ২৬.১৫ মিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি।

২০২৫ সালে ফোর্বসের হিসাবে তিনি বিশ্বের দশম সর্বোচ্চ উপার্জনকারী নারী ক্রীড়াবিদ ছিলেন। সে বছর তার মোট আয় ছিল ১২.৩ মিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে ৫.৩ মিলিয়ন ডলার এসেছিল কোর্টের পারফরম্যান্স থেকে। বাকি ৭ মিলিয়ন ডলার ছিল বিজ্ঞাপন ও অন্যান্য বাণিজ্যিক আয়।

২০২৬ ইউএস ওপেনে পেগুলোর শুরুটা ছিল দারুণ। প্রথম রাউন্ডে রোমানিয়ার এলেনা-গ্যাব্রিয়েলা রুসেকে ৬-৩, ৬-২ গেমে হারান। দ্বিতীয় রাউন্ডে সাবেক অস্ট্রেলিয়ান ওপেন চ্যাম্পিয়ন সোফিয়া কেনিনকে হারান ৬-৩, ৬-১ ব্যবধানে।

এরপর লেইলা ফার্নান্দেজকে হারিয়ে চতুর্থ রাউন্ডে ওঠেন। কোয়ার্টার ফাইনালে হারান রোমানিয়ার সোরানা ক্রিস্তেয়াকে ৬-৩, ৬-৪ গেমে।

শেষ আটের পর বাধা ছিলেন আরেক মার্কিন খেলোয়াড় এমা নাভারো। প্রথম সেটে ৩-৬ ব্যবধানে হেরে যান পেগুলো। কিন্তু সেখান থেকে ম্যাচ ঘুরিয়ে দেন। পরের দুই সেট ৬-৪, ৬-৩ জিতে টানা তৃতীয়বার ইউএস ওপেনের সেমিফাইনালে জায়গা করে নেন। এটি ২০২৬ সালে তার ৫০তম জয়ও।

সেমিফাইনালে পেগুলোর প্রতিপক্ষ আরিনা সাবালেঙ্কা। ম্যাচটি যেন পুরোনো এক গল্পের নতুন অধ্যায়।

২০২৪ ইউএস ওপেনের ফাইনালে এই সাবালেঙ্কার কাছেই হেরেছিলেন পেগুলো। ২০২৫ সালে একই টুর্নামেন্টের সেমিফাইনালেও সাবালেঙ্কার কাছে পরাজিত হন। এবার তৃতীয় বছর টানা নিউইয়র্কে একই মঞ্চে মুখোমুখি হচ্ছেন তারা।

আগের মুখোমুখি লড়াইয়ে সাবালেঙ্কা এগিয়ে ৯-৪ ব্যবধানে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে পেগুলোও আত্মবিশ্বাসী। ২০২৬ সালে তিনি পাঁচটি ফাইনালে উঠেছেন।

বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর আর্থার অ্যাশ স্টেডিয়ামে স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৭টায় শুরু হওয়ার কথা এই সেমিফাইনাল। জিতলে পেগুলো আবার ইউএস ওপেনের ফাইনালে উঠবেন। আর সেখানেই থাকবে প্রথম গ্র্যান্ড স্ল্যাম জয়ের সবচেয়ে বড় সুযোগ।

পেগুলোর ক্যারিয়ারের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিকগুলোর একটি তার বয়স ও সময়ের হিসাব।

তিনি ২৪শে ফেব্রুয়ারি ১৯৯৪ সালে নিউইয়র্কের বাফেলোতে জন্মগ্রহণ করেন। সাত বছর বয়সে টেনিস শুরু করেন। পরে পরিবার ফ্লোরিডার বোকা র‌্যাটনে চলে যায়। সেখানে তিনি পেশাদার টেনিসের জন্য নিজেকে তৈরি করতে থাকেন।

টেনিসের বড় মঞ্চে তার উত্থানও খুব দ্রুত হয়নি। ২০২১ অস্ট্রেলিয়ান ওপেনে প্রথমবার গ্র্যান্ড স্ল্যামের কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠেন। দীর্ঘদিন বড় টুর্নামেন্টে কোয়ার্টার ফাইনাল থেকেই বিদায় নিতে হয়েছে তাকে।

সেই চিত্র বদলায় ২০২৪ ইউএস ওপেনে। প্রথমবার কোনো গ্র্যান্ড স্ল্যামের ফাইনালে ওঠেন পেগুলো। তবে সাবালেঙ্কার কাছে হেরে শিরোপা অধরাই থেকে যায়।

২০২৫ ইউএস ওপেনেও সেমিফাইনালে ওঠেন। ২০২৬ অস্ট্রেলিয়ান ওপেনেও পৌঁছান শেষ চারে। অর্থাৎ বড় মঞ্চে ধারাবাহিকভাবে শেষের লড়াইয়ে জায়গা করে নেওয়ার ক্ষমতা তিনি এরই মধ্যে দেখিয়েছেন।

পেগুলোর সবচেয়ে বড় বিতর্কও এখানেই। তার পারিবারিক সম্পদ নিয়ে টেনিস দুনিয়ায় আলোচনা দীর্ঘদিনের। সমালোচকদের যুক্তি, বিপুল অর্থ তাকে এমন সুযোগ দিয়েছে যা অন্য অনেক খেলোয়াড় পাননি। পেগুলোও এই সুবিধার বিষয়টি অস্বীকার করেন না। কিন্তু তার বক্তব্যের জায়গাটা আলাদা। তার কাছে সুযোগ পাওয়া এবং ম্যাচ জিতে নেওয়া এক বিষয় নয়।

২০২৬ সালের এক প্রতিবেদনে পেগুলো বলেছেন, তিনি জানেন যে তিনি অনেক সুযোগ-সুবিধা নিয়ে বড় হয়েছেন। তবে সেই সুযোগ নষ্ট করতে চাননি।

টেনিসের বাস্তবতাও তার পক্ষে কথা বলে। কোর্টে অর্থ দিয়ে সরাসরি জয় কেনা যায় না। সার্ভ, রিটার্ন, ফিটনেস, মানসিক দৃঢ়তা এবং প্রতিপক্ষের চাপ সামলানোর ক্ষমতা—সবকিছুর পরীক্ষা হয় একা একজন খেলোয়াড়ের।

পেগুলোর ক্যারিয়ারের গল্পের মূল্য এখানেই। তিনি এমন একটি পরিবার থেকে এসেছেন, যেখানে অর্থের অভাব ছিল না। কিন্তু বিশ্ব টেনিসের শীর্ষ তিনে ওঠা এবং একের পর এক গ্র্যান্ড স্ল্যামের শেষ পর্যায়ে পৌঁছানো কেবল উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া যায়নি।

পেগুলোর ক্যারিয়ারে এখন ১১টি একক শিরোপা। চারটি ডব্লিউটিএ ১০০০ শিরোপাও রয়েছে। তিনি একসময় ডাবলস র‍্যাঙ্কিংয়ে বিশ্বের এক নম্বরেও উঠেছিলেন। তবু তার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় ঘাটতি একটি গ্র্যান্ড স্ল্যাম শিরোপা।

৩২ বছর বয়সে সেই অপেক্ষার শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে তিনি। সামনে সাবালেঙ্কা। তাকে হারাতে পারলে ফাইনাল। আর ফাইনাল জিততে পারলে বদলে যাবে পুরো গল্প।

তখন তাকে আর শুধু ‘বিলিয়নিয়ারের মেয়ে’ বলে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার প্রয়োজন হবে না। পরিচয়টা হবে আরও সহজ—জেসিকা পেগুলো, একজন গ্র্যান্ড স্ল্যাম চ্যাম্পিয়ন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *