ঢাকার অ্যালায়ন্স ফ্রঁসেজে আয়োজিত হয়েছে ‘আনটোল্ড স্টোরি’ শীর্ষক সম্মিলিত চিত্রপ্রদর্শনী। প্রদর্শনীতে সাতজন নারী শিল্পীর কাজ স্থান পেয়েছে। ফারিহা জেবার কিউরেশনে আয়োজিত এই প্রদর্শনীতে উঠে এসেছে ব্যক্তিগত স্মৃতি, অনুভূতি, নীরবতা, নারীজীবন, প্রকৃতি ও সামাজিক বাস্তবতা ।
প্রদর্শনীটির বিশেষত্ব এর মাধ্যম নির্বাচনে। প্রচলিত ক্যানভাসের পাশাপাশি শিল্পীরা টেক্সটাইল, এমব্রয়ডারি, কাগজ ও মিশ্র মাধ্যম ব্যবহার করেছেন। সেলাই ও বুননের মতো ঐতিহ্যগতভাবে গৃহস্থালি কাজের সঙ্গে যুক্ত মাধ্যমকে এখানে সমকালীন শিল্পের ভাষায় উপস্থাপন করা হয়েছে।
প্রদর্শনীর কেন্দ্রীয় আকর্ষণ হলো দীর্ঘ ঝুলন্ত ট্যাপেস্ট্রি, যেখানে সাতজন শিল্পীর স্বতন্ত্র চিত্রকল্প ও সেলাই একাকার হয়েছে। সাদা কাপড়ের ওপর রঙিন সুতার এমব্রয়ডারিতে ফুটে উঠেছে নারীমূর্তি, হস্তচিহ্ন, প্রাণী, উদ্ভিদ, জলরাশি এবং সাংস্কৃতিক প্রতীক। রঙের ব্যবহারে কোমল প্যাস্টেল থেকে শুরু করে গাঢ় লাল-সবুজের বৈচিত্র্য দৃষ্টি কাড়ে। প্রতিটি প্যানেল স্বতন্ত্র হলেও সুতা ও রঙের মাধ্যমে তারা এক অদৃশ্য বন্ধনে আবদ্ধ। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা কীভাবে বৃহত্তর সামাজিক অভিজ্ঞতার অংশ হয়ে ওঠে, ট্যাপেস্ট্রিটি সেই ধারণাকে সামনে আনে।
প্রদর্শনীর আরেকটি শিল্পকর্মে কমলা ও মরিচা রঙের মানবাকৃতি এবং জালের মতো উপাদানের মাধ্যমে যোগাযোগের সংকট, নীরবতা ও অপেক্ষার অনুভূতি প্রকাশ করা হয়েছে। “I am waiting to hear you” এবং “কেন কথা বলছো না?”—এই প্রশ্নগুলো প্রদর্শনীর কেন্দ্রীয় থিমকে শক্তিশালী করে। এটি সেই সব গল্পের কথা বলে যা সমাজে, পরিবারে বা ব্যক্তিগত জীবনে অকথিত থেকে যায়। নারীদের অভিজ্ঞতা, আবেগ এবং সংগ্রামের যে সব গল্প প্রায়শই শোনা হয় না, এই প্রদর্শনী সেগুলোকে দৃশ্যমান করে।
প্রদর্শনীতে টেক্সটাইলের মাধ্যমে শহরের মানচিত্রের মতো একটি কাজও রয়েছে। ধূসর ও বাদামি টোনের এই কাজে পাখির চোখে দেখা নগরদৃশ্যের মতো বিন্যাস তৈরি করা হয়েছে। এর কেন্দ্রে রয়েছে সবুজ একটি প্রাকৃতিক পরিসর। কাজটি নগরায়ন ও প্রকৃতির সম্পর্কের পাশাপাশি স্থান ও স্মৃতির প্রশ্নও সামনে আনে।
অন্য একটি ইনস্টলেশনে তৈরি করা হয়েছে কক্ষের মতো পরিবেশ। সেখানে সাদা পর্দা, ল্যাপটপ, নোটবুক, কাপসহ নানা দৈনন্দিন বস্তু ব্যবহার করা হয়েছে। ব্যক্তিগত জীবনের সাধারণ উপকরণগুলো এখানে স্মৃতির উপাদানে পরিণত হয়েছে। ফলে ইনস্টলেশনটি এক ধরনের ব্যক্তিগত আর্কাইভের অনুভূতি তৈরি করে।
‘আনটোল্ড স্টোরি’র মূল ধারণার সঙ্গে এই কাজগুলোর একটি গুরুত্বপূর্ণ যোগসূত্র রয়েছে। মানুষের ব্যক্তিগত গল্প কখনোই পুরোপুরি ব্যক্তিগত থাকে না। পরিবার, সমাজ, সংস্কৃতি ও পারিপার্শ্বিকতার সঙ্গে তার সম্পর্ক তৈরি হয়। প্রদর্শনী সেই সম্পর্কের জায়গাটিই অনুসন্ধান করেছে।
বিশেষ করে নারীর অভিজ্ঞতা এখানে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। নারী শরীর, হাতের ছাপ, ফুল, পাখি, জল ও দৈনন্দিন জীবনের নানা প্রতীক বারবার ফিরে এসেছে। এগুলোকে শুধু সৌন্দর্যের উপাদান হিসেবে দেখলে প্রদর্শনীর অন্তর্নিহিত বক্তব্যের একটি অংশ বাদ পড়ে যায় বিশেষ করে হস্তচিহ্নের উপস্থাপনা নারীদের কর্ম, সৃজনশীলতা এবং প্রতিরোধের প্রতীক হিসেবে পড়া যেতে পারে।
প্রদর্শনীর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো টেক্সটাইল ও এমব্রয়ডারির ব্যবহার। কাপড়, সুতা ও সেলাইকে সাধারণত ঘর সাজানো বা দৈনন্দিন ব্যবহারের কাজের উপকরণ হিসেবে দেখা হয়। এই প্রদর্শনীতে সেই পরিচিত মাধ্যমই শিল্পীদের ভাবনা ও অনুভূতি প্রকাশের ভাষা হয়ে উঠেছে। সেলাই করা প্রতিটি রেখা, রঙ ও নকশা এখানে শুধু সৌন্দর্য তৈরির জন্য নয়; বরং স্মৃতি, সম্পর্ক, আবেগ ও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা প্রকাশের অংশ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।
একই সাথে প্রদর্শনীটি বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী নকশিকাঁথা ও সূচিকর্মের সঙ্গে সমকালীন শিল্পচর্চার একটি সংযোগ তৈরি করে। পরিচিত কারিগরি পদ্ধতি নতুন বিষয় ও বিন্যাসের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। ফলে ঐতিহ্য এখানে অনুকরণের বিষয় না হয়ে নতুনভাবে ব্যবহারের উপাদান হয়েছে।
কিউরেশনের দিক থেকেও সম্মিলিত কাজটি গুরুত্বপূর্ণ। শিল্পীদের নিজস্ব কাজের বৈচিত্র্য বজায় রেখেও প্রদর্শনীতে একটি সামগ্রিক প্রবাহ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ঝুলন্ত ট্যাপেস্ট্রির মতো সম্মিলিত কাজ দর্শককে আলাদা আলাদা শিল্পীর পরিবর্তে একটি যৌথ অভিজ্ঞতার সামনে দাঁড় করায়।
‘আনটোল্ড স্টোরি’ নারীজীবন, নীরবতা, সামাজিক সম্পর্ক, নগরায়ন ও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে এটি বৃহত্তর সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। ব্যক্তিগত গল্পকে রাজনৈতিক বা সামাজিক বক্তব্যে রূপ দেওয়ার বদলে প্রদর্শনী অনেক ক্ষেত্রে দর্শকের নিজস্ব ব্যাখ্যার জায়গা তৈরি করেছে।
এই জায়গাটিই প্রদর্শনীর শক্তি। এখানে শিল্পীরা দর্শককে একটি নির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর জন্য চাপ দেননি। বরং স্মৃতি, নীরবতা ও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার নানা দৃশ্য সামনে রেখে প্রশ্ন করার সুযোগ তৈরি করেছেন।
‘আনটোল্ড স্টোরি’ তাই টেক্সটাইল এবং এমব্রয়ডারির মতো ঐতিহ্যবাহী মাধ্যমকে সমকালীন শিল্পের ভাষায় রূপান্তর করা, নারীদের দৈনন্দিন জীবন ও অভিজ্ঞতাকে শিল্পের কেন্দ্রে নিয়ে আসা, এবং অকথিত গল্পগুলোকে দৃশ্যমান করা—এই প্রদর্শনীকে বাংলাদেশের সমকালীন নারী শিল্পচর্চার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত করে।
তবে এই ধরনের আয়োজনের ধারাবাহিকতা, দীর্ঘমেয়াদী সংরক্ষণ এবং অধিকতর দর্শক পরিসরে পৌঁছানোর ব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। ভবিষ্যতে এই ধরনের সম্মিলিত নারী শিল্পচর্চার আরও আয়োজন আশা করা যায়, যা বাংলাদেশের শিল্পজগতকে আরও সমৃদ্ধ করবে।
প্রদর্শনীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য সম্ভবত এখানেই—সব গল্প শব্দে বলা হয় না। কিছু গল্প কাপড়ের ওপর সেলাই হয়ে থাকে। কিছু স্মৃতি রয়ে যায় রঙে, রেখায় কিংবা একটি হাতের ছাপে। ‘আনটোল্ড স্টোরি’ সেই নীরব গল্পগুলোকেই দৃশ্যমান করার চেষ্টা করেছে।