সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ইন্টার্ন চিকিৎসকদের সঙ্গে প্রায় দেড় ঘণ্টা বৈঠক করেছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুল এবং বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। বৈঠকে চিকিৎসকদের কর্মস্থলের নিরাপত্তা, সুরক্ষা আইন, মিডিয়া ট্রায়াল, ইন্টার্ন ভাতা এবং স্বাস্থ্য খাতের জনবল সংকটসহ বিভিন্ন বিষয় উঠে আসে।
শুক্রবার (৪ঠা সেপ্টেম্বর) সকাল ৯টার দিকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে নিয়ে দুই মন্ত্রী হাসপাতাল পরিদর্শনে যান। মন্ত্রীদের অভ্যর্থনা জানানোর পর ইন্টার্ন ডক্টর অ্যাসোসিয়েশন (আইডিএ) চিকিৎসকদের সমস্যা ও দাবিগুলো নিয়ে আলোচনার প্রস্তাব দেয়। প্রথমে হাসপাতাল পরিদর্শন শেষে বৈঠকের কথা থাকলেও পরিস্থিতি বিবেচনায় পরিদর্শনের আগেই আলোচনা শুরু হয়।
পরে মেডিকেল কলেজের কনফারেন্স রুমে মন্ত্রীদ্বয়, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা এবং ইন্টার্ন চিকিৎসকদের অংশগ্রহণে রুদ্ধদ্বার বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
বৈঠকের শুরুতে আইডিএ-এর সহ-সাধারণ সম্পাদক ডা. রাকিন হান্না আনান চিকিৎসকদের কর্মপরিবেশ ও নিরাপত্তাহীনতার বিষয়টি তুলে ধরেন। সাম্প্রতিক সময়ে চিকিৎসকদের শারীরিক ও মানসিকভাবে লাঞ্ছিত হওয়ার ঘটনাগুলোও তিনি উল্লেখ করেন। এ সময় তিনি বগুড়ার সাম্প্রতিক ঘটনার প্রসঙ্গও তুলে ধরেন।
ডা. রাকিন বলেন, সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থা নানা সীমাবদ্ধতায় থাকলেও সরকারি হাসপাতালে কর্মরত চিকিৎসকরা প্রতিকূলতার মধ্যেও দায়িত্ব পালন করছেন। প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক রোগীকে দীর্ঘ কর্মঘণ্টার মধ্যে সেবা দিতে হচ্ছে তাদের।
তার ভাষ্য, স্বাস্থ্যব্যবস্থার দুর্বলতা সামাল দিতে সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসকরাই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। কিন্তু দায়িত্ব পালনের সময় তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত হচ্ছে না। শারীরিক ও মানসিক হয়রানির আশঙ্কা নিয়েই অনেক চিকিৎসককে কাজ করতে হচ্ছে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রীর উদ্দেশে তিনি বলেন, “স্যার, আমরা হিরো হতে চাই না। আমরা শুধু এতটুকু চাই—আমাদের পাশে কেউ থাকুক।”
তিনি আরও বলেন, চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীরা স্বাস্থ্যব্যবস্থার অন্যতম চালিকাশক্তি। তাদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত না হলে স্বাস্থ্য খাতের টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়।
বৈঠকে আইডিএ সভাপতি ডা. মিসবাহ চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে তথাকথিত মিডিয়া ট্রায়ালের বিষয়টি তুলে ধরেন। তার অভিযোগ, হাসপাতাল পরিদর্শনে এসে বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা অনেক সময় স্বাস্থ্যব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার দায় চিকিৎসকদের ওপর চাপিয়ে দেন।
তিনি বলেন, রোগী বা স্বজনদের কোনো অভিযোগ উঠলে অনেক ক্ষেত্রে তা যাচাই না করেই গণমাধ্যমে প্রচার করা হয়। এতে চিকিৎসকদের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একই সঙ্গে চিকিৎসক ও রোগীর মধ্যে আস্থার সংকটও বাড়ে।
ডা. মিসবাহর মতে, চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে সত্যতা যাচাই করা উচিত। অভিযোগের ভিত্তিতে তাৎক্ষণিক প্রচারণার বদলে বিষয়গুলো পেশাদারভাবে মোকাবিলা করা প্রয়োজন।
বৈঠকে ইন্টার্ন চিকিৎসকদের পক্ষ থেকে ছয় দফা দাবি তুলে ধরা হয়। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে—
- চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য সুরক্ষা আইন বাস্তবায়ন;
- হাসপাতাল ও কর্মস্থলে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা;
- নতুন জাতীয় পে-স্কেলের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ইন্টার্ন চিকিৎসকদের ভাতা নির্ধারণ;
- বেসরকারি চিকিৎসকদের বেতন কাঠামো ও পেশাগত অগ্রগতির বিষয় বিবেচনা;
- চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে অভিযোগের ক্ষেত্রে যথাযথ তদন্ত ও পেশাদার প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা;
- স্বাস্থ্য খাতে জনবল ও কর্মপরিবেশের উন্নয়ন।
ইন্টার্ন চিকিৎসকদের বক্তব্যের পর স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন চিকিৎসকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। করোনা মহামারি, বন্যা ও বিভিন্ন দুর্যোগসহ প্রতিকূল পরিস্থিতিতে চিকিৎসকদের দায়িত্ব পালনের কথা উল্লেখ করেন তিনি।
মন্ত্রী বলেন, বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা থাকলেও বাংলাদেশের চিকিৎসকরা দক্ষতার সঙ্গে চিকিৎসাসেবা দিয়ে যাচ্ছেন। সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যেও তারা অনেক ক্ষেত্রে অত্যন্ত ভালো কাজ করছেন। কিন্তু তাদের কাজ ও দক্ষতা যথাযথভাবে সামনে আসছে না বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
চিকিৎসকদের নিরাপত্তা প্রসঙ্গে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, বিভাগীয় পর্যায়ের হাসপাতালগুলোতে প্রায় ৩০০ জন আনসার সদস্য মোতায়েনের ব্যবস্থা করা হবে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ব্যাটালিয়ন আনসার সদস্য থাকবে।
হাসপাতালগুলোতে পুলিশ বক্স নির্মাণ এবং সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়ার কথাও জানান তিনি। চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের নিরাপত্তা জোরদারে হাসপাতালগুলোর সামগ্রিক নিরাপত্তাব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করার আশ্বাস দেন মন্ত্রী।
চিকিৎসকদের দীর্ঘদিনের দাবি সুরক্ষা আইন নিয়েও বৈঠকে আশ্বাস দেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। তিনি জানান, আগামী কয়েক মাসের মধ্যে জাতীয় সংসদে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের সুরক্ষা বিল উত্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
কর্মস্থলে চিকিৎসক বা স্বাস্থ্যকর্মীদের ওপর হামলা হলে দ্রুত আসামি গ্রেপ্তার এবং তাদের বিচারের আওতায় আনার বিষয়েও তিনি আশ্বাস দেন।
ইন্টার্ন চিকিৎসকদের ভাতা নিয়েও ইতিবাচক অবস্থানের কথা জানান মন্ত্রী। নতুন জাতীয় পে-স্কেলের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ভাতা নির্ধারণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন তিনি।
বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরও চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে মিডিয়া ট্রায়ালের প্রসঙ্গ গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেন। তিনি বলেন, যাচাইহীন প্রচারণার মাধ্যমে চিকিৎসকদের প্রতি রোগীদের অনাস্থা তৈরি হতে পারে। এর পেছনে বিভিন্ন পক্ষের স্বার্থও থাকতে পারে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
তার মতে, চিকিৎসক ও চিকিৎসাব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা নষ্ট হলে এর সুযোগ অন্য কোনো পক্ষ নিতে পারে। তাই যাচাই ছাড়া কোনো অভিযোগ প্রচার করে চিকিৎসকদের প্রতি মানুষের আস্থা ক্ষুণ্ন করা উচিত নয়।
চিকিৎসকদের সীমাবদ্ধতার মধ্যেও সেবা দেওয়ার জন্য তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন বাণিজ্যমন্ত্রী। একই সঙ্গে স্বাস্থ্য খাতের বিদ্যমান অসঙ্গতি দূর করার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
বাণিজ্যমন্ত্রী জানান, উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোকে ১৫১ শয্যায় উন্নীত করার পরিকল্পনা ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের পরিবর্তে একসঙ্গে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
স্বাস্থ্য খাতের জনবল সংকট মোকাবিলায় প্রায় ৫ হাজার চিকিৎসক নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।
বৈঠকের শেষ পর্যায়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, জনবল বৃদ্ধি, হাসপাতালের নিরাপত্তা জোরদার, অবকাঠামো উন্নয়নসহ বিভিন্ন উদ্যোগ বাস্তবায়নের মাধ্যমে আগামী এক বছরের মধ্যে দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থায় দৃশ্যমান পরিবর্তন আনার লক্ষ্য রয়েছে।
চিকিৎসকদের বক্তব্য শোনার পর সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন দুই মন্ত্রী।