ফেরদৌসির শাহনামা: এক মহাকাব্য, যে আজও আগলে রেখেছে ইরানের পরিচয়

ফারসি কবি আবুল কাসেম ফেরদৌসি ও তাঁর মহাকাব্য শাহনামা

ইরানের জাতীয় পরিচয়, ফারসি ভাষা ও সাংস্কৃতিক ঐক্য রক্ষায় কবি আবুল কাসেম ফেরদৌসির মহাকাব্য শাহনামা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এই গ্রন্থকে বিদেশি ভাষার প্রভাব মোকাবিলায় ফারসি শব্দের এক অপরাজেয় বাহিনী হিসেবে বর্ণনা করেছেন ইরানের ফারসি ভাষা ও সাহিত্যের বিশিষ্ট অধ্যাপক এবং শাহনামা গবেষক সাইয়েদ জালালউদ্দিন কাজাজী। তাঁর মতে, ফেরদৌসির নির্মিত এই সাহিত্যিক শক্তিকে কখনো ধ্বংস করা সম্ভব নয়।

কাজাজী বলেন, ফেরদৌসি ইরানকে কীভাবে সেবা করেছেন, তা বুঝতে হলে দেশটির প্রাচীন ইতিহাস ও শাসনব্যবস্থার দিকে ফিরে তাকাতে হবে। তাঁর মতে, আখেমেনীয়, পার্থীয় ও সাসানীয় শাসনামলে ইরান তিনটি গুরুত্বপূর্ণ সাম্রাজ্যিক যুগ অতিক্রম করেছে। এসব শাসনামলে দেশটির বিস্তার ও রাজনৈতিক শক্তি বৃদ্ধি পেয়েছিল।

তিনি বলেন, আখেমেনীয় সাম্রাজ্যের বিস্তারে বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ ছিল। পার্থীয়রাও বিস্তৃত সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিল। তবে সাসানীয় শাসনামলে কেন্দ্রীভূত শাসনব্যবস্থা ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের কারণে ইরানের অভ্যন্তরীণ ঐক্য দুর্বল হয়ে পড়ে বলে তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে। পরবর্তী সময়ে যুদ্ধ, সংঘাত ও রাজনৈতিক অস্থিরতা দেশটিকে বিপর্যস্ত করে।

এই পরিস্থিতিতে ফেরদৌসির অবদানকে ব্যতিক্রমী হিসেবে দেখেন কাজাজী। তাঁর ভাষ্য, ফেরদৌসির হাতে প্রচলিত অর্থে কোনো সেনাবাহিনী, বিপুল সম্পদ কিংবা সামরিক শক্তি ছিল না। কিন্তু তিনি শাহনামার মাধ্যমে এমন এক সাংস্কৃতিক শক্তি গড়ে তোলেন, যা ইরানিদের মধ্যে ঐতিহাসিক স্মৃতি ও জাতীয় পরিচয়ের বন্ধন দৃঢ় করে।

কাজাজী বলেন, শাহনামার প্রতিটি ইরানি যোদ্ধা যেন এই সাংস্কৃতিক বাহিনীর একজন সৈনিক। আর এর সেনাপতি ফেরদৌসি নিজেই। তাঁর মতে, এই সাহিত্যিক শক্তি আজও সক্রিয়। ফারসি ভাষা ইরানের বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী ও ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে একটি অভিন্ন বন্ধন হিসেবে কাজ করছে।

শাহনামার নাট্যসম্ভাবনার কথাও তুলে ধরেন এই গবেষক। তিনি বলেন, গ্রন্থটির প্রতিটি কাহিনিকে নাট্যরূপ দেওয়ার মতো উপাদান রয়েছে। দক্ষ নাট্যকার ও পরিচালকেরা মূল কাহিনিতে পরিবর্তন না এনেও এগুলোকে মঞ্চনাটকে রূপ দিতে পারেন।

ইরানের পরিকল্পনা ও বাজেট সংস্থার জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা আব্দুল হামিদ জিয়াঈ বলেন, শাহনামা কেবল প্রাচীন কাহিনি ও রাজাদের ইতিহাসের গ্রন্থ নয়। এটি চিন্তা, দর্শন ও প্রজ্ঞারও এক সমৃদ্ধ ভান্ডার। তাঁর মতে, এই মহাকাব্য ইরানের বিভিন্ন প্রদেশের মানুষের মধ্যে ঐক্য গড়ে তোলার গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হতে পারে।

জিয়াঈ বলেন, শাহনামাকে শুধু অতীতের বর্ণনা হিসেবে পড়লে এর প্রকৃত তাৎপর্য উপলব্ধি করা সম্ভব নয়। বরং সমকালীন সমাজের সমস্যা ও প্রয়োজনের আলোকে গ্রন্থটির পুনঃপাঠ ও ব্যাখ্যা জরুরি। এর মাধ্যমে প্রাচীন কাহিনির ভেতর থেকে বর্তমান সময়ের উপযোগী চিন্তা ও প্রজ্ঞা আহরণ করা যেতে পারে।

তিনি বলেন, শাহনামা এমন একটি গ্রন্থ, যা নতুন নতুন প্রশ্নের মুখোমুখি হওয়ার সুযোগ দেয়। এর উত্তর খুঁজতে পাঠককে গ্রন্থটির গভীরে প্রবেশ করতে হয়। সাংস্কৃতিক স্থবিরতা কাটিয়ে উঠতেও এই পাঠ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

জিয়াঈর মতে, শাহনামার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো মানবজীবনের মর্যাদা। তিনি বলেন, বিশ্বাস ও মতাদর্শের নামে যখন মানুষের জীবনকে অবমূল্যায়ন করা হয়, তখন ফেরদৌসির মানবিক দর্শন নতুন করে প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। মানুষের জীবন ও প্রজ্ঞাকে গুরুত্ব দেওয়ার যে আকাঙ্ক্ষা এই মহাকাব্যে প্রতিফলিত হয়েছে, তা বর্তমান সমাজের জন্যও তাৎপর্যপূর্ণ।

তিনি আরও বলেন, শাহনামার প্রজ্ঞা স্বেচ্ছাচারী ক্ষমতার ধারণার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। মহাকাব্যের বীর রোস্তম কোনো ক্ষমতাকেন্দ্রের কাছে সহজে মাথা নত করেন না। জিয়াঈর ব্যাখ্যায়, এই চরিত্রের মধ্য দিয়ে স্বাধীন চিন্তা ও আত্মমর্যাদার একটি দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ পেয়েছে।

ফেরদৌসির কাব্যের সূচনায় প্রজ্ঞার গুরুত্বের কথাও তুলে ধরেন তিনি। তাঁর মতে, শাহনামাকে প্রজ্ঞার গ্রন্থ হিসেবে পাঠ করা উচিত। এতে নিহিত দার্শনিক ভাবনা অনুধাবন করতে পারলে সাহিত্যটি সমকালীন মানুষের জীবন ও চিন্তার সঙ্গে আরও গভীরভাবে যুক্ত হতে পারে।

ইরানের সংস্কৃতি ও ইসলামী নির্দেশনা মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা আইয়ুব দেহঘানকার বলেন, ফারসি ভাষা দেশটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক সম্পদগুলোর একটি। ভাষা শুধু মানুষের চিন্তা প্রকাশের মাধ্যম নয়; এটি মানুষের চিন্তার ধরন ও বিশ্বকে বোঝার পদ্ধতিকেও প্রভাবিত করে।

তিনি বলেন, ইরানের সংস্কৃতি ও চিন্তার ঐতিহ্য বুঝতে হলে ফারসি ভাষার গভীরে প্রবেশ করতে হবে। এই ভাষার মধ্যেই দেশটির বহু ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা, জ্ঞান ও নৈতিক শিক্ষার প্রকাশ ঘটেছে।

দেহঘানকারের মতে, শাহনামা ইরানের ঐতিহাসিক স্মৃতি ও ইসলামী সভ্যতার মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতুবন্ধন। গ্রন্থটির বিষয়বস্তু দেশের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে আরও ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা সম্ভব।

তিনি বলেন, চলচ্চিত্র, নাটক ও সংগীতের মতো শিল্পমাধ্যমে নতুন বিষয়বস্তুর সন্ধান করতে গিয়ে শাহনামাকে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। এই মহাকাব্যে এমন বহু কাহিনি ও ভাবনা রয়েছে, যেগুলো থেকে সমকালীন শিল্পীরা নতুন সৃষ্টির উপাদান পেতে পারেন। একইভাবে কম্পিউটারনির্ভর খেলা ও অ্যানিমেশনেও এর কাহিনি ব্যবহার করা সম্ভব।

দেহঘানকার আরও বলেন, বিশ্বের ২০টিরও বেশি ভাষায় শাহনামার অনুবাদ হয়েছে। এটি গ্রন্থটির আন্তর্জাতিক পরিচিতি ও সাহিত্যিক প্রভাবের পরিচায়ক। তাঁর মতে, এই মহাকাব্যের বিষয়বস্তুকে বিভিন্ন শিল্পমাধ্যমে কাজে লাগানো গেলে ইরানের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য নতুন প্রজন্মের কাছে আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠবে।

খোরাসান রাজাভি প্রদেশের সংস্কৃতি ও ইসলামী নির্দেশনা বিভাগের মহাপরিচালক হোসেইন মেসগারানি বলেন, শাহনামা ইরানের জাতীয় চেতনার অন্যতম প্রধান প্রকাশ। এটি শুধু শাসক ও ঐতিহাসিক ঘটনার বিবরণ কিংবা কল্পকাহিনির সংকলন নয়। বরং ভালো-মন্দ, ন্যায়-অন্যায় এবং স্বাধীনতার সংগ্রাম নিয়ে ফেরদৌসির মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রকাশ।

তিনি শাহনামাকে ফারসি ভাষা ও সংস্কৃতির ভিত্তি এবং ইরানের ঐতিহ্য, বিশ্বাস ও সামাজিক রীতিনীতির এক বিশাল ভান্ডার হিসেবে বর্ণনা করেন। তাঁর মতে, প্রায় এক হাজার বছর আগের একটি সাহিত্যকর্ম আজও একটি জাতির মানুষের কাছে বোধগম্য ও অর্থবহ থাকা অসাধারণ ঘটনা।

মেসগারানি বলেন, ইরানের ইতিহাসে খোরাসান মহাকাব্য, পুরাণ ও বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বের জন্য পরিচিত। ফেরদৌসির জন্মভূমি এবং তুসে তাঁর সমাধির অবস্থান এই অঞ্চলের সঙ্গে শাহনামার সম্পর্ককে আরও গভীর করেছে। এ কারণে খোরাসানের চিন্তাবিদ, লেখক ও শিল্পীদের এই মহাকাব্য নিয়ে গবেষণা ও সৃজনশীল কাজে যুক্ত হওয়া জরুরি।

তিনি আরও বলেন, ইরানের জাতীয় পরিচয়, ইতিহাস ও ধর্মীয় ঐতিহ্যের পারস্পরিক সম্পর্ক শাহনামায় প্রতিফলিত হয়েছে। স্বদেশপ্রেম ও যুক্তিবাদকে গুরুত্ব দেওয়া ব্যক্তিদের জন্যও এই গ্রন্থ নতুন চিন্তার ক্ষেত্র তৈরি করতে পারে।

অনুষ্ঠানে জানানো হয়, সংস্কৃতি ও ইসলামী নির্দেশনা মন্ত্রণালয় এবং পরিকল্পনা ও বাজেট সংস্থার যৌথ উদ্যোগে শাহনামা পাঠ ও অধ্যয়নের প্রশিক্ষকদের দক্ষতা বাড়ানোর কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন প্রদেশে সাংস্কৃতিক সহযোগী ও গবেষক গড়ে তোলাও এই উদ্যোগের লক্ষ্য।

এর আগে তেহরান, কেরমান, পূর্ব আজারবাইজান ও কেরমানশাহ প্রদেশে প্রশিক্ষণ কর্মসূচি আয়োজন করা হয়। ষষ্ঠ কর্মসূচিটি অনুষ্ঠিত হচ্ছে খোরাসান রাজাভিতে। এতে উত্তর খোরাসান, দক্ষিণ খোরাসান ও গোলেস্তানসহ আশপাশের প্রদেশের গবেষকদের অংশগ্রহণের কথা জানানো হয়েছে।

কর্মসূচিতে অধ্যাপক মীর জালালউদ্দিন কাজাজী, মোহাম্মদ জাফর ইয়াহাগী ও আব্দুল হামিদ জিয়াঈর মতো শিক্ষাবিদদের অংশগ্রহণের কথা উল্লেখ করা হয়।

আয়োজকদের মতে, এ ধরনের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে শাহনামা পাঠের চর্চা বিস্তৃত হবে। পাশাপাশি গবেষক, শিক্ষক ও শিল্পীদের মধ্যে এই মহাকাব্য নিয়ে গভীর অনুধাবন তৈরি হবে। এর ফলে প্রাচীন ফারসি সাহিত্যকে সমকালীন চিন্তা, শিক্ষা ও সৃজনশীলতার সঙ্গে যুক্ত করার সুযোগ বাড়বে।

ফেরদৌসির শাহনামা তাই ইরানে শুধু একটি প্রাচীন মহাকাব্য নয়। বক্তাদের আলোচনায় এটি ভাষা, ইতিহাস, দর্শন ও জাতীয় পরিচয়ের ধারক হিসেবে উঠে এসেছে। তাঁদের মতে, এই গ্রন্থের গুরুত্ব ধরে রাখতে হলে একে অতীতের স্মৃতিতে সীমাবদ্ধ না রেখে বর্তমান সমাজের প্রশ্ন ও প্রয়োজনের সঙ্গেও যুক্ত করতে হবে।

 

 

আরো পড়ুন : শেষ উপন্যাস প্রকাশের এক দিন আগে বেস্টসেলার লেখক জেফ্রি আর্চারের মৃত্যু

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *