ব্রাজিলের রাজনীতিতে এক অভূতপূর্ব ও ঐতিহাসিক ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প রচনা করেছেন দেশটির বামপন্থী প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা। ২০২৬ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দ্বিতীয় ধাপে ফার-রাইট প্রার্থী ফ্লাভিও বোলসোনারোকে হারিয়ে তিনি চতুর্থ মেয়াদে ক্ষমতায় ফিরে এসেছেন। ১৯৮০-এর দশকে ব্রাজিলে গণতন্ত্র ফিরে আসার পর থেকে দেশটির ইতিহাসে এই প্রথম কোনো প্রার্থী প্রথম ধাপে পিছিয়ে পড়েও দ্বিতীয় ধাপে জয়লাভ করলেন।
১০০% ভোট গণনা শেষে ৮০ বছর বয়সী লুলা পেয়েছেন ৫১.৭৯% ভোট, যা তার ৪৫ বছর বয়সী প্রতিদ্বন্দ্বী ফ্লাভিও বোলসোনারোর ৪৮.২১% ভোটের চেয়ে ৪৪ লাখ ভোট বেশি। প্রথম ধাপে রেকর্ডসংখ্যক ভোটার ভোট দিতে না আসায় (২১.০৮%) লুলার শিবির কিছুটা চাপে থাকলেও, দ্বিতীয় ধাপে ভোটার উপস্থিতি বাড়ানো এবং লুলা-পন্থী ভোটারদের উদ্বুদ্ধ করতে তার প্রচারণা দল সফল হয়।
সাও পাওলোতে এক জমজমাট বিজয় সমাবেশে লুলা এই জয়কে “অস্বীকারবাদ বা ডিনায়ালাজমের পরাজয়” হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেন, “আমরা এই দেশের শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন করতে যাচ্ছি… এটি গণতন্ত্রেরই জয়। ব্রাজিলের নারী-পুরুষ সবাইকে ধন্যবাদ জানাই।”
নির্বাচনী ফলাফল প্রকাশের পরপরই ফ্লাভিও বোলসোনারো তার পরাজয় মেনে নিতে অস্বীকার করেন এবং ফলাফল বাতিল করার দাবি জানান। তিনি সুপ্রিম কোর্টের এক বিচারপতির ভোটগ্রহণের সময় দুই ঘণ্টা বাড়ানোর সিদ্ধান্তকে “অগ্রহণযোগ্য” এবং “খেলা চলাকালীন নিয়ম পরিবর্তন” হিসেবে উল্লেখ করেন। মজার বিষয় হলো, তার নিজের প্রচারণা দলও ভোটের সময় বাড়ানোর জন্য নির্বাচনী আদালতে আবেদন করেছিল, যা তিনি তার ভাষণে ইচ্ছাকৃতভাবে এড়িয়ে যান।
এই পরিস্থিতি ব্রাজিলে তার বাবা, সাবেক প্রেসিডেন্ট জেয়ার বোলসোনারোর ২০২২ সালের নির্বাচনী পরাজয় ও ক্ষমতা হস্তান্তরে অস্বীকৃতির কথা মনে করিয়ে দেয়।
লুলার এই জয় কেবল তার ব্যক্তিগত রাজনৈতিক যাত্রারই নয়, বরং ব্রাজিলের গণতন্ত্রের জন্যও একটি বড় বার্তা। ১৯৭০-এর দশকে ট্রেড ইউনিয়ন নেতা হিসেবে যাত্রা শুরু করা এই প্রাক্তন কারখানা শ্রমিক ২০০২ সালে ব্রাজিলের প্রথম নির্বাচিত শ্রমিকশ্রেণীর প্রেসিডেন্ট হন। ২০২২ সালে তিনি জেয়ার বোলসোনারোকে হারিয়ে ক্ষমতায় ফিরে আসেন, যিনি পরবর্তীতে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে হামলা ও ক্ষমতা দখলের ব্যর্থ ষড়যন্ত্রের দায়ে বর্তমানে ২৭ বছরের কারাদণ্ড ভোগ করছেন। ফ্লাভিওর জয় হলে জেয়ার মুক্তি ও পুনরায় রাজনীতিতে ফেরার পথ খুলে যেত, যা লুলার এই জয়ের মাধ্যমে সম্পূর্ণ রুদ্ধ হয়ে গেল।
এই ফলাফল লাতিন আমেরিকায় ডোনাল্ড ট্রাম্প-পন্থী জোটের জন্যও একটি বড় ধাক্কা। ট্রাম্প প্রশাসন আশা করেছিল যে ফ্লাভিও বোলসোনারো লাতিন আমেরিকায় তাদের প্রভাব বিস্তারের আরেকটি ঘাঁটি হয়ে উঠবেন।
অন্যদিকে, লুলার সমর্থকরা সাও পাওলোর পাউলিস্তা অ্যাভিনিউ এবং রিওর কোপাকাবানা সৈকতে লাখো মানুষের ঢল নামিয়ে এই জয় উদযাপন করেছে। অনেক ভোটারই অভিযোগ করেছেন যে, ফার-রাইট শিবির লুলা-পন্থী এলাকাগুলোতে গণপরিবহন ব্যবস্থা নস্যাৎ করার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু গণতন্ত্রের প্রতি মানুষের অটল বিশ্বাসের কাছে সেই চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে।
একজন ৪০ বছর বয়সী আলোকচিত্রী কাইও মার্কেস বলেন, “প্রথম ধাপে বামপন্থীরা ব্যর্থ হয়েছিল, কিন্তু দ্বিতীয় ধাপে তারা জেগে উঠেছে। এবং আমাদের কাছ থেকে এই জয় ছিনিয়ে নেওয়ার মতো কোনো ষড়যন্ত্রই সফল হবে না।”
লুলার এই জয় ব্রাজিলের পরিবেশ সংরক্ষণ (বিশেষ করে আমাজন বন রক্ষা), জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা এবং শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য একটি ইতিবাচক বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে। মেক্সিকো ও প্যারাগুয়ের মতো দেশের নেতারা ইতিমধ্যেই লুলার এই “গণতান্ত্রিক যাত্রার” জন্য অভিনন্দন জানিয়েছেন। তবে, ফার-রাইট শিবিরের এই অস্বীকৃতি ও উসকানিমূলক মনোভাব ভবিষ্যতে ব্রাজিলের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
আরো পড়ুন : ব্রাজিলের দ্বিতীয় দফার নির্বাচন: গণতন্ত্র, সার্বভৌমত্ব ও বহুপাক্ষিকতার প্রশ্ন