৪২ বছর ধরে বিনামূল্যে শিক্ষার্থীদের নদী পার করছেন কমলেশ

সুতারচাপর ঘাটে নৌকা চালাচ্ছেন ৫২ বছর বয়সী কমলেশ মাঝি
ভোরের আলো তখনো পুরোপুরি ফোটেনি। ময়মনসিংহের সুতারচাপর ঘাটে কুয়াশা আর নদীর ঠাণ্ডা বাতাস থমকে আছে। ঠিক সেই সময়ে ইঞ্জিনের শব্দ তুলে নৌকা চালু করেন কমলেশ মাঝি। এক হাতে বৈঠা, অন্য হাতে নৌকার গতিপথ সামলানো—এই তো তাঁর জীবন। এই সুতারচাপর ঘাট থেকে নিগুয়ারি বাজার ঘাটের ছোট্ট নদীপথটুকুর মাঝেই পার হয়ে গেছে তাঁর জীবনের ৪২টি বছর।
কমলেশের বয়স এখন ৫২। প্রতিদিন তাঁর নৌকায় ওঠেন রকমারি মানুষ। সাধারণ যাত্রী, বাজারফেরত লোক—আর তাঁদের ভিড়ে থাকে একদল ছোট ছোট মুখ। কারও হাতে বই-খাতা, কারও কাঁধে ভারী স্কুলব্যাগ। নিগুয়ারি সাইদুর রহমান উচ্চবিদ্যালয়, নিগুয়ারি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কিংবা ক্যাপ্টেন (অব.) গিয়াস উদ্দিন আহমেদ কলেজের দিকে ছুটে চলা এই শিশু-কিশোররাই যেন কমলেশের নৌকার আসল আলো।
অন্য যাত্রীরা নৌকা থেকে নেমে ঘাটে পাঁচ টাকার কয়েন দেন। কিন্তু কমলেশ কোনোদিন এই শিক্ষার্থীদের দিকে হাত বাড়ান না। দীর্ঘ ৪২ বছর ধরে তিনি ওদের বিনা ভাড়ায় নদী পার করছেন। এর পেছনে কোনো সরকারি প্রকল্প নেই, বড় কোনো সংস্থার অনুদান নেই। আছে শুধু একটি বংশপরম্পরায় চলে আসা পরম পারিবারিক শিক্ষা।
কমলেশের বাবা দীনেশ চন্দ্র মাঝিও এই ঘাটে নৌকা চালাতেন। তাঁর দাদা উমেশ চন্দ্র মাঝি এবং পূর্বপুরুষ বিহারি মাঝিও ছিলেন একই পেশায়। কমলেশের বয়স যখন মাত্র ১০, তখন বাবা হাতে বৈঠা তুলে দিয়ে বলেছিলেন, “কমলেশ, ইস্কুল-কলেজে যাওয়া পোলাপাইনদের কাছ থেকে কোনো দিন ভাড়া নিবি না।”
সময়ের সাথে সাথে পৃথিবীর অনেক কিছু বদলেছে। একসময় যে পারাপারের ভাড়া ছিল ১০ পয়সা, তা থেকে চার আনা হয়ে আজ পাঁচ টাকায় ঠেকেছে। কিন্তু কমলেশের নৌকায় পার হওয়া পড়াশোনা করা ছেলেমেয়েদের ভাড়া আজও সেই শূন্য পয়সাই রয়ে গেছে।
স্থানীয় শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের হিসেব অনুযায়ী, সুতারচাপর, অলি, তল্লি, পাটলাশী, ভূষভুষিয়া কিংবা সাধুয়াসহ আশেপাশের গ্রামগুলোর কয়েক শ শিক্ষার্থী প্রতিদিন এই নদী পথেই পড়াশোনা করতে যায়। কোনো কোনো যাত্রায় একসাথে ৫০ জনের বেশি শিক্ষার্থীও ওঠে তাঁর নৌকায়। শুধু তা-ই নয়, নিগুয়ারি সাইদুর রহমান উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক এস এম শওকত আলী জানান, কমলেশের এই মায়াময় উদ্যোগ দেখে ঘাটের অন্য মাঝিরাও এখন শিক্ষার্থীদের বিনা ভাড়ায় পারাপার করছেন। একটি পরিবারের ছোট্ট মানবিক আলো আজ ছড়িয়ে পড়েছে পুরো ঘাটে।
অথচ অন্যদের জন্য এত কিছু করা এই মানুষটির নিজের সংসার যেন এক নিরন্তর অভাবের রূপকথা। ছয় সদস্যের পরিবারটি চলে এই একমাত্র নৌকার ওপর ভর করে। তেল আর নৌকা মেরামতের খরচ বাদ দিলে দিনে আয় থাকে মাত্র ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা। নিজের বলতে কোনো জমি কিংবা বসতভিটা নেই, অন্যের জায়গায় মাথা গুঁজে পরিবার নিয়ে থাকেন। সংসারের অভাব আর দুই মেয়ের বিয়ের খরচ জোগাতে খুইয়েছেন নিজের শেষ সম্বলটুকুও। চার ছেলের মধ্যে দুজন দিনমজুরের কাজ করেন। এত টানাপোড়েনের মধ্যেও শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে একটা টাকা নেওয়ার কথা কখনো তাঁর মাথায় আসেনি।
বিগত চার দশকে কত হাজার শিক্ষার্থীকে তিনি নদী পার করে অন্য তীরে পৌঁছে দিয়েছেন, তার কোনো হিসেব কমলেশের কাছে নেই। তাঁদের অনেকে আজ বড় চাকরি করছেন, কেউ শিক্ষক হয়েছেন, কেউ বা বড় ব্যবসায়ী। অনেকে গ্রাম ছেড়ে চলে গেছেন শহরের আলোয়। কিন্তু কমলেশ মাঝি আজো সেই ঘাটে রয়ে গেছেন—নতুন প্রজন্মের হাত ধরে প্রতিদিন নদীর ওপারে আলোর পাঠশালায় পৌঁছে দিতে।
“মানুষের আসল ধন-সম্পদ তো ব্যাংকে জমে থাকে না, জমে থাকে মানুষের ভালোবাসায়।” কমলেশ মাঝির চাওয়া-পাওয়ার জগতটাও তেমনই সাদাসিধে। তাঁর সরল স্বীকারোক্তি—সবাই তাঁকে চেনে, ভালোবাসে, সম্মান করে—এর চেয়ে বড় আর কী-ই বা হতে পারে?
নিজের সামর্থ্য কতটুকু, তা দিয়ে মানবিকতার বিচার হয় না। মানুষের পাশে দাঁড়াতে যে বিরাট কোনো বিত্তের প্রয়োজন নেই, ময়মনসিংহের নদীঘাটে বসে কমলেশ মাঝি ৪২ বছর ধরে সেই অনন্য সত্যিটাই সবাইকে দেখিয়ে যাচ্ছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *