আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের চিংড়ির অবস্থান শক্তিশালী করতে পরিবেশবান্ধব উৎপাদন, শ্রমিকের অধিকার সুরক্ষা এবং উৎপাদন থেকে রপ্তানি পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে পণ্যের গতিপথ অনুসরণযোগ্য করার ওপর জোর দিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। তিনি বলেছেন, চিংড়ি চাষের জমির পরিমাণে ভারতকে ছাড়িয়ে থাকলেও রপ্তানি আয়ে দেশটির তুলনায় পিছিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ। এই ব্যবধান কমাতে উৎপাদনশীলতা ও গুণগত মান বাড়ানোর পাশাপাশি সরবরাহ ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে।
বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) সন্ধ্যায় রাজধানীর শেরাটন হোটেলে চিংড়ি খাত নিয়ে আয়োজিত এক উচ্চপর্যায়ের সংলাপে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা, মন্টেরে বে অ্যাকোয়ারিয়াম এবং বাংলাদেশ ফ্রোজেন ফুডস এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য প্রতিষ্ঠান টোটালফুড প্রসেসিং যৌথভাবে এ সংলাপের আয়োজন করে।
চিংড়ি খাতকে রপ্তানি বহুমুখীকরণের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে উল্লেখ করেন বাণিজ্যমন্ত্রী। তিনি জানান, গত বছর বাংলাদেশের হিমায়িত মাছ ও চিংড়ি রপ্তানি ১৯ শতাংশ বেড়ে প্রায় ৩০ কোটি ডলারে পৌঁছেছে। তবে এই খাতে প্রবৃদ্ধির আরও বড় সুযোগ রয়েছে।
মন্ত্রী বলেন, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ভারত ৫০০ কোটি ডলারের বেশি মূল্যের চিংড়ি রপ্তানি করেছে। অন্যদিকে, বাংলাদেশে চিংড়ি চাষের জমির পরিমাণ ভারতের তুলনায় প্রায় ৪২ শতাংশ বেশি। তা সত্ত্বেও রপ্তানিতে পিছিয়ে থাকার বিষয়টি উৎপাদনশীলতা ও মানোন্নয়নের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে।
তাঁর মতে, শুধু চাষের জমি বেশি থাকলেই আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকা যায় না। উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি পণ্যের মান, প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং রপ্তানিযোগ্যতা উন্নত করতে হবে।
আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশাধিকার বাড়াতে উৎপাদনপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতার ওপর গুরুত্ব দেন বাণিজ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, বিদেশি ক্রেতারা এখন শুধু পণ্যের গুণগত মান দেখেন না। উৎপাদনে কারা যুক্ত, শ্রমিকদের কর্মপরিবেশ কেমন এবং উৎপাদন পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর কি না, সেসব বিষয়ও বিবেচনা করেন।
এ কারণে কাগজের নথিনির্ভর ব্যবস্থার পরিবর্তে সমন্বিত ডিজিটাল পদ্ধতি চালুর প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন তিনি। এর মাধ্যমে চাষের ক্ষেত থেকে প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং রপ্তানি পর্যন্ত পণ্যের উৎস ও গতিপথ যাচাই করা সম্ভব হবে।
এ ধরনের ব্যবস্থা চালু হলে পণ্যের উৎস সম্পর্কে ক্রেতাদের আস্থা বাড়ানোর পাশাপাশি শ্রম অধিকার ও পরিবেশগত মানদণ্ড অনুসরণ করা হচ্ছে কি না, তা যাচাই করাও সহজ হবে।
বাণিজ্যমন্ত্রী জানান, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে দায়িত্বশীল ব্যবসায়িক আচরণবিষয়ক একটি সেল গঠন করেছে। শ্রমিকের অধিকারসহ ব্যবসা পরিচালনার বিভিন্ন ক্ষেত্রে দায়িত্বশীলতা নিশ্চিত করতে জাতীয় নীতিমালা প্রণয়নের কাজ চলছে। একই সঙ্গে পণ্যের উৎস ও সরবরাহব্যবস্থা অনুসরণযোগ্য করার কৌশলও তৈরি করা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের চিংড়ির সবচেয়ে বড় বাজার ইউরোপীয় ইউনিয়ন। এই বাজারে প্রবেশাধিকার ধরে রাখা এবং নতুন সুযোগ তৈরিতে সরকার বিভিন্ন সংস্কার কার্যক্রমে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। মুক্ত বাণিজ্য চুক্তিসহ দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্পর্ক আরও গভীর করার বিষয়েও সরকার কাজ করছে।
বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের জীবিকা ও অর্থনীতিতে চিংড়ি শিল্পের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে বলে উল্লেখ করেন মন্ত্রী। এ খাতের সঙ্গে চাষি, ডিপো কর্মী, প্রক্রিয়াজাত কারখানার শ্রমিক এবং রপ্তানিকারকেরা যুক্ত।
তিনি বলেন, সরবরাহব্যবস্থার প্রতিটি পর্যায়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ন্যায্য অধিকার ও সুরক্ষা নিশ্চিত করা সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ানোর পাশাপাশি উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত মানুষের কর্মপরিবেশ ও অধিকার রক্ষাও জরুরি।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্য দেন বাংলাদেশে ইউরোপীয় ইউনিয়ন প্রতিনিধিদলের উন্নয়ন সহযোগিতা বিভাগের প্রধান মিশাল ক্রেয়জা। সমাপনী বক্তব্য দেন আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার বাংলাদেশে নিযুক্ত কান্ট্রি ডিরেক্টর ম্যাক্স তুনন।
আলোচকেরা বলেন, সরকার, উন্নয়ন সহযোগী ও বেসরকারি খাতের সমন্বিত উদ্যোগ বাংলাদেশের চিংড়িকে আন্তর্জাতিক বাজারে দায়িত্বশীল, পরিবেশবান্ধব ও টেকসই উচ্চমূল্যের পণ্য হিসেবে প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখতে পারে। এ জন্য উৎপাদনব্যবস্থার উন্নয়ন, শ্রমিকের অধিকার সুরক্ষা এবং সরবরাহব্যবস্থায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।