ভোর পাঁচটা। ফরিদপুরের এক গ্রামের উঠানে চার্জে থাকা ইজিবাইকের সংযোগ খুলছেন চালক আলম। রাতভর চার্জ দেওয়ার পর এবার তাঁকে নামতে হবে সড়কে। বাসস্ট্যান্ড ও হাসপাতাল মোড়ে যাত্রী ধরতে হবে। গাড়িটি নিজের হলেও কেনা হয়েছে ঋণের টাকায়। প্রতি সপ্তাহে কিস্তি দিতে হয়। সাত মাস আগে কেনা ব্যাটারির ক্ষমতাও কমতে শুরু করেছে। দুপুরের পর দীর্ঘ পথের ভাড়া নিতে পারেন না।
আলমের এই গল্পটি কোনো নির্দিষ্ট চালকের নয়। বিভিন্ন এলাকার চালকদের জীবন ও ব্যাটারির সমস্যার ভিত্তিতে চরিত্রটি তৈরি করা হয়েছে। তবে তাঁর সংকট বাস্তব। ব্যাটারি দ্রুত দুর্বল হওয়া, দীর্ঘ সময় ধরে চার্জ দেওয়া এবং নতুন ব্যাটারি কেনার অর্থ জোগাড় করা—এই তিন সমস্যায় আটকে আছেন বহু ইজিবাইকচালক।
দেশে প্রায় ৬০ লাখ ব্যাটারিচালিত তিন চাকার গাড়ি রয়েছে বলে বিভিন্ন গবেষণা ও সরকারি সূত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব গাড়ির সঙ্গে প্রায় ৪০ লাখ চালক ও তাঁদের পরিবারের জীবিকা জড়িত। গাড়িগুলোর বেশির ভাগে ব্যবহৃত হয় সিসার ব্যাটারি। এতে বিদ্যুতের অপচয় হয়। পাশাপাশি পুরোনো ব্যাটারি অনিয়ন্ত্রিতভাবে ভাঙা ও সিসা গলানোর কারণে পরিবেশদূষণের ঝুঁকি তৈরি হয়।
এর বিকল্প হতে পারে লিথিয়াম আয়রন ফসফেট ব্যাটারি। এই ব্যাটারি তুলনামূলক হালকা। দ্রুত চার্জ হয় এবং একই কাজ করতে কম বিদ্যুৎ লাগে। কিন্তু দাম বেশি হওয়ায় অধিকাংশ চালকের পক্ষে একসঙ্গে এতো টাকা দিয়ে এটি কেনা কঠিন।
গবেষণাভিত্তিক একটি প্রস্তাবে তাই তিনটি পদক্ষেপের কথা বলা হয়েছে। মান যাচাই করা লিথিয়াম ব্যাটারির শুল্ক-কর সাময়িকভাবে শূন্য করা, চালকদের কম সুদে বা বিনা সুদে ঋণ দেওয়া এবং পুরোনো ব্যাটারি বদলের সময় নতুন ব্যাটারি ব্যবহারের নিয়ম চালু করা। প্রস্তাবটি বাস্তবায়িত হলে চালকের ব্যয় কমার পাশাপাশি বিদ্যুতের চাহিদা ও সিসাদূষণ কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে এসব সম্ভাবনার অনেকটাই এখনো মডেলভিত্তিক হিসাবের ওপর নির্ভরশীল।
চালকের আয় ও ব্যাটারির দামের তুলনা করলে সমস্যার গভীরতা বোঝা যায়। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে প্রকাশিত ইনোভিশনের এক জরিপের তথ্য অনুযায়ী, নিজের গাড়ি চালানো ব্যক্তিদের হাতে দৈনিক গড়ে প্রায় ৯৭০ টাকা থাকে। ভাড়ার গাড়ি চালকেরা দৈনিক প্রায় ৪১৪ টাকা ভাড়া দিয়ে হাতে রাখেন প্রায় ৪১৮ টাকা।
অন্যদিকে, সিপিডির এক প্রতিবেদনে সিসার ব্যাটারির একটি সেটের দাম ২৬ হাজার থেকে ৩০ হাজার টাকা বলা হয়েছে। তবে ২০২৬ সালের ১৪ অক্টোবর প্রকাশিত প্রথম আলোর এক প্রতিবেদনে শিল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বরাত দিয়ে চার-পাঁচটি ব্যাটারির একটি সেটের দাম ৫০ হাজার থেকে ৬০ হাজার টাকা উল্লেখ করা হয়েছে।
দুই সূত্রের দামে বড় পার্থক্য রয়েছে। ব্যাটারির ধরন, ক্ষমতা ও বাজারভেদে এ পার্থক্য হতে পারে। ফলে প্রকৃত ব্যয় নির্ধারণে আরও নির্ভরযোগ্য বাজারতথ্য প্রয়োজন।
শিল্পসংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, সিসার ব্যাটারি পুরোপুরি চার্জ হতে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা লাগে। একবার চার্জে চলে ১০০ থেকে ১২০ কিলোমিটার। ছয়-সাত মাস পর থেকেই অনেক ব্যাটারির ক্ষমতা কমতে শুরু করে।
লিথিয়াম ব্যাটারির দাম অবশ্য আরও বেশি। একই প্রতিবেদনে একটি প্যাকের দাম ৯০ হাজার থেকে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা বলা হয়েছে। চার্জ হতে লাগে প্রায় আড়াই থেকে তিন ঘণ্টা। একবার চার্জে চলে ১২০ থেকে ১৫০ কিলোমিটার। শিল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দাবি, ব্যাটারিটি আড়াই থেকে তিন বছর ভালো ক্ষমতা ধরে রাখতে পারে।
এসব তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা পরীক্ষার ফল নয়। তবু ব্যাটারির ওজন, চার্জের সময় ও সম্ভাব্য আয়ুর পার্থক্য চালকের কর্মঘণ্টা এবং ব্যয়ের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
সিসার ব্যাটারির একটি বড় সীমাবদ্ধতা হলো, চার্জের সময় নেওয়া বিদ্যুতের একটি অংশ তাপসহ বিভিন্নভাবে নষ্ট হয়। গবেষণাটির মডেলে সিসার ব্যাটারিতে এ হার ধরা হয়েছে ২০ শতাংশ। লিথিয়াম আয়রন ফসফেট ব্যাটারিতে ধরা হয়েছে ৫ শতাংশ।
ওজনের পার্থক্যও উল্লেখযোগ্য। গবেষণায় ব্যবহৃত একটি তথ্যপত্র অনুযায়ী, পাঁচটি সিসার ব্যাটারির ওজন প্রায় ১৪৫ কেজি। শিল্পসংশ্লিষ্ট সূত্রে তা ১৬০ কেজি পর্যন্ত বলা হয়েছে। অন্যদিকে, একই ধরনের কাজের উপযোগী একটি লিথিয়াম ব্যাটারির ওজন প্রায় ৪৯ কেজি। শিল্পসংশ্লিষ্ট আরেকটি হিসাবে ওজন ৩৫ থেকে ৪০ কেজি। অর্থাৎ, ব্যাটারির ওজন প্রায় ৯৬ থেকে ১২২ কেজি কমতে পারে। এতে গাড়ির ওপর চাপ কমার পাশাপাশি বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের সুযোগ রয়েছে।
মডেলটির মধ্যম হিসাবে, একটি সিসার ব্যাটারিচালিত গাড়ি দিনে বিদ্যুৎ ব্যবস্থা থেকে প্রায় ৯ দশমিক ৪৯ ইউনিট বিদ্যুৎ নেয়। লিথিয়াম ব্যাটারিতে তা কমে প্রায় ৭ দশমিক ৭৯ ইউনিট হতে পারে। এতে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের মধ্যম হার ১৭ দশমিক ৬ শতাংশ। সম্ভাব্য হার ৯ থেকে ২৬ শতাংশ।
এই হিসাব অনুযায়ী, গাড়িপ্রতি বছরে প্রায় ৬০৫ ইউনিট বিদ্যুৎ সাশ্রয় হতে পারে। তবে প্রকৃত সাশ্রয় নির্ভর করবে গাড়ির ধরন, ব্যাটারির মান, চলাচলের দূরত্ব ও চার্জ দেওয়ার পদ্ধতির ওপর।
লিথিয়াম ব্যাটারির দাম বেশি হওয়ায় চালকেরা সহজে তা কিনতে পারছেন না। ইনোভিশনের জরিপ অনুযায়ী, প্রায় ৫৯ দশমিক ৭ শতাংশ গাড়ি কেনা হয়েছে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা বা ক্ষুদ্রঋণের অর্থে। গড় ঋণের পরিমাণ প্রায় ৮০ হাজার টাকা। ক্ষুদ্রঋণের ক্ষেত্রে বার্ষিক সুদের সর্বোচ্চ হার ২৪ শতাংশ। ফলে ব্যাটারি কেনার জন্য নতুন ঋণ নিলে চালকের ব্যয় আরও বাড়তে পারে।
আমদানির কর কাঠামোতেও পার্থক্য রয়েছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের ২০২৬-২৭ অর্থবছরের শুল্ক হিসাব অনুযায়ী, লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি আমদানিতে মোট করের হার ৬৪ দশমিক ২৫ শতাংশ। সিসার ব্যাটারির ক্ষেত্রে তা ৯৬ দশমিক ১০ শতাংশ।
তবে সিসার ব্যাটারির প্রায় সবই দেশে তৈরি হয় বলে সিপিডি উল্লেখ করেছে। তাই শুধু আমদানি শুল্ক কমালে দেশীয় বাজারে সিসার ব্যাটারির দাম কমার নিশ্চয়তা নেই। একইভাবে, লিথিয়ামের কর কমালেই চালকের হাতে ব্যাটারি কেনার অর্থ চলে আসবে না। এ কারণে গবেষণায় করছাড়ের পাশাপাশি স্বল্প সুদের ঋণের প্রস্তাব করা হয়েছে।
মডেলের হিসাবে, বর্তমান কর ও ২৪ শতাংশ সুদের পরিস্থিতিতে লিথিয়াম ব্যাটারি সিসার ব্যাটারির তুলনায় বছরে কম ব্যয়বহুল হয় প্রায় ১২ শতাংশ ক্ষেত্রে। দোকানের বিজ্ঞাপনে পাওয়া দাম ধরে এই হার ১৭ শতাংশ। ঋণের সুদ ৫ শতাংশে নামালে বৈশ্বিক বাজারদরভিত্তিক হিসাবে লিথিয়াম ব্যাটারি সস্তা পড়ার হার বেড়ে ৩৮ শতাংশ হতে পারে। করছাড় ও স্বল্প সুদের ঋণ একসঙ্গে দেওয়া হলে তা প্রায় ৫৩ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। এসব ফল অনুমান ও মূল্যতথ্যের ওপর নির্ভরশীল। এগুলো দেশের সব চালকের ক্ষেত্রে নিশ্চিত সাশ্রয়ের পূর্বাভাস নয়।
গবেষণায় প্রথমত, মান যাচাই করা লিথিয়াম ব্যাটারি ও এর উপাদান আমদানিতে ২০৩০ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত সব শুল্ক-কর শূন্য রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। এ সুবিধা পেতে ব্যাটারিকে নির্ধারিত নিরাপত্তামান পূরণ করতে হবে। ব্যাটারির সঙ্গে থাকতে হবে বিদ্যুৎ নিয়ন্ত্রণ ও সুরক্ষার ব্যবস্থা। প্রতিটি প্যাকে পরিচিতি শনাক্ত করার ব্যবস্থাও রাখার প্রস্তাব রয়েছে।
দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশ ব্যাংক ও পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে চালকদের শূন্য থেকে ৫ শতাংশ সুদে ৩৬ মাসের ঋণ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। নিবন্ধিত গাড়ির বিপরীতে চালক, গ্যারেজমালিক বা ব্যাটারি বদল সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান এ ঋণ পেতে পারে।
প্রস্তাব অনুযায়ী, এ জন্য ৫ হাজার কোটি টাকার একটি ঘূর্ণায়মান তহবিল গঠন করা যেতে পারে। ঋণ বিতরণে ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে যুক্ত করলে বর্তমানে যেসব চালক তাদের মাধ্যমে গাড়ি কিনছেন, তাঁদের কাছেও অর্থ পৌঁছানো সহজ হতে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২৩ সালের একটি নির্দেশনায় পরিবেশবান্ধব যানবাহন ও লিথিয়াম ব্যাটারি তৈরির কারখানার জন্য পুনঃঅর্থায়নের সুযোগ রয়েছে। কিন্তু গবেষণায় উদ্ধৃত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পর্যালোচনা অনুযায়ী, ২০২৫ সালের অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ওই তহবিলের আওতায় পরিবহন খাতে অর্থ বিতরণ হয়নি।
এ তথ্য থেকে বোঝা যায়, অর্থায়নের কাঠামো থাকলেও তা চালকের কাছে পৌঁছানোর কার্যকর ব্যবস্থা জরুরি।
শুধু নতুন গাড়িতে লিথিয়াম ব্যাটারি বাধ্যতামূলক করলে পরিবর্তন ধীর হবে। তাই গবেষণায় ২০২৭ সালের ১লা জুলাই থেকে চলতি গাড়ির ব্যাটারি বদলের সময় নতুন সেট হিসেবে প্রত্যয়িত লিথিয়াম ব্যাটারি ব্যবহারের প্রস্তাব করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে পুরোনো সিসার ব্যাটারি অনুমোদিত পুনর্ব্যবহারকারীর কাছে জমা দেওয়ার ব্যবস্থা রাখতে হবে। ব্যাটারি, উপযুক্ত চার্জার ও সুরক্ষা নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা একই প্যাকেজে দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।
গাড়ির নিবন্ধন, ব্যাটারির পরিচিতি এবং গ্যারেজের বৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ নিশ্চিত করতে হবে। ব্যাটারির মান যাচাইয়ের দায়িত্ব দেওয়া যেতে পারে বাংলাদেশ মান নিয়ন্ত্রণ ও পরীক্ষা প্রতিষ্ঠানের ওপর। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো নিবন্ধিত গ্যারেজের কার্যক্রম তদারক করতে পারে।
এতে পুরো গাড়ি বাতিল না করেও ধাপে ধাপে ব্যাটারি পরিবর্তন করা সম্ভব হবে। তবে পুরোনো ব্যাটারি জমা দেওয়ার মূল্য, গ্যারেজের প্রস্তুতি ও পুনর্ব্যবহারের ব্যয়ও নীতিতে বিবেচনা করতে হবে।
লিথিয়াম ব্যাটারির আরেকটি সম্ভাব্য সুবিধা হলো, কম সময়ে চার্জ শেষ করা। সিসার ব্যাটারিতে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা লাগলেও লিথিয়ামে প্রায় আড়াই থেকে তিন ঘণ্টা লাগে বলে শিল্পসংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। ফলে চার্জ দেওয়ার সময় নিয়ন্ত্রণ করা গেলে সন্ধ্যার ব্যস্ত সময়ে বিদ্যুতের চাহিদা কমানো সম্ভব হতে পারে। রাত গভীর হলে বা দিনের সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সময় গাড়ি চার্জ দেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের ২০২৬ সালের ১১ই অক্টোবরের দৈনিক প্রতিবেদনে সন্ধ্যার সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ চাহিদা ছিল ১৭ হাজার ১০৮ মেগাওয়াট। ওই সময়ে ৬৩২ মেগাওয়াট লোডশেডিংয়ের তথ্যও ছিল। গবেষণায় অনুমান করা হয়েছে, ১৪ লাখ গাড়ির একটি বহরে সিসার বদলে লিথিয়াম ব্যাটারি ব্যবহার এবং চার্জের সময় নিয়ন্ত্রণ করা গেলে সন্ধ্যার চাহিদা গড়ে প্রায় ৪১৯ মেগাওয়াট কমতে পারে। সম্ভাব্য পরিসর ১৮৩ থেকে ৬৬৯ মেগাওয়াট।
তবে এটি মাঠপর্যায়ে মাপা ফল নয়। সন্ধ্যায় কত গাড়ি চার্জে থাকে, সে বিষয়ে ঘণ্টাভিত্তিক তথ্য নেই। দ্রুত চার্জ দেওয়ার সময় বিদ্যুতের তাৎক্ষণিক চাহিদা বাড়তেও পারে। তাই পিক সময় এড়িয়ে চার্জ দেওয়ার ব্যবস্থা ছাড়া শুধু ব্যাটারি বদলেই প্রত্যাশিত ফল নিশ্চিত হবে না।
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিদ্যুতের পাইকারি সরবরাহ ব্যয় প্রতি ইউনিটে ১২ টাকা ৩৪ পয়সা। বিক্রয়মূল্য ছিল ৬ টাকা ৮০ পয়সা। দুইয়ের পার্থক্য ৫ টাকা ৫৪ পয়সা। গবেষণার মডেলে ৬০ লাখ গাড়ির ৩০ শতাংশ, অর্থাৎ ১৮ লাখ গাড়ি বদলানো হলে বছরে প্রায় ১ দশমিক ০৯ টেরাওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের সম্ভাবনা দেখানো হয়েছে। এই সাশ্রয় ধরে বছরে বিদ্যুৎ ভর্তুকি প্রায় ৬০৩ কোটি টাকা কমতে পারে। তবে এই হিসাবও অনুমাননির্ভর। গাড়ির প্রকৃত সংখ্যা ও বিদ্যুৎ ব্যবহারের জাতীয় হিসাবের মধ্যে অসংগতি রয়েছে। ফলে বাস্তবে সাশ্রয় কম বা বেশি হতে পারে।
অন্যদিকে, ১৮ লাখ গাড়ির জন্য বছরে প্রায় ৪ লাখ ৫০ হাজার লিথিয়াম ব্যাটারি প্রয়োজন হবে বলে মডেলে ধরা হয়েছে। এই পরিমাণ ব্যাটারি কেনার ঋণ, করছাড় ও ভর্তুকির ব্যয়ও রাষ্ট্রকে বহন করতে হবে।
সব করছাড় ও বিনা সুদের ঋণ ধরে গবেষণায় রাষ্ট্রের বার্ষিক নিট বিনিয়োগের মধ্যম হিসাব প্রায় ২ হাজার ৬৯৫ কোটি টাকা। সিসার ব্যাটারির বিক্রি কমে যাওয়ায় বৈধ কারখানার কর আদায়ে সম্ভাব্য পরিবর্তন যুক্ত করলে তা বেড়ে প্রায় ৩ হাজার ১০০ কোটি টাকা হয়। হিসাবের পরিসর বেশ বড়। তাই এই অঙ্ককে চূড়ান্ত সরকারি ব্যয় হিসেবে দেখা যাবে না।
গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ হলো, বিদ্যুৎ সাশ্রয় ও ভর্তুকি কমার সম্ভাবনা থাকলেও লিথিয়াম ব্যাটারি আমদানির জন্য বৈদেশিক মুদ্রা লাগবে। মডেলে বছরে জ্বালানি আমদানিতে যে পরিমাণ অর্থ সাশ্রয়ের সম্ভাবনা দেখানো হয়েছে, তার চেয়ে ব্যাটারি আমদানিতে বেশি ডলার লাগতে পারে। অর্থাৎ, শুধু বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের হিসাব দিয়ে নীতির সামগ্রিক অর্থনৈতিক লাভ নির্ধারণ করা যাবে না। দেশীয় উৎপাদন, ব্যাটারির প্রকৃত আয়ু এবং আমদানি ব্যয়ও বিবেচনায় নিতে হবে।
ব্যাটারি পরিবর্তনের পরিবেশগত গুরুত্বও রয়েছে। পুরোনো সিসার ব্যাটারি অনিয়ন্ত্রিতভাবে ভাঙা ও গলানোর ফলে সিসা মাটি, পানি ও বাতাসে ছড়াতে পারে। শিশুদের জন্য এ দূষণ বিশেষভাবে উদ্বেগের। জাতিসংঘের শিশুবিষয়ক সংস্থার হিসাবে, বাংলাদেশের প্রায় ৩ কোটি ৫৫ লাখ শিশুর রক্তে সিসার মাত্রা প্রতি দশমিক লিটার রক্তে ৫ মাইক্রোগ্রামের বেশি। এ মাত্রার সংস্পর্শ শিশুদের বিকাশ ও স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।
সাভারের কাঠগড়ায় একটি দূষিত এলাকার শিশুদের রক্তে সিসার মাত্রা কমার তথ্যও গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। অবৈধ সিসা গলানোর কারখানা বন্ধ ও দূষিত মাটি অপসারণের পর সেখানে শিশুদের রক্তে সিসার গড় মাত্রা ৪২ শতাংশ কমেছিল বলে সংশ্লিষ্ট সংস্থার তথ্য।
গবেষণায় উদ্ধৃত একটি হিসাব অনুযায়ী, বৃহত্তর ঢাকার একটি তিন চাকার বৈদ্যুতিক গাড়ি বছরে প্রায় ৩০ কেজি সিসা পরিবেশে ছড়াতে পারে। এটি সরাসরি মাপা নিঃসরণ নয়, মডেলভিত্তিক অনুমান। ফরিদপুরের গাড়ির ক্ষেত্রে এই সংখ্যা প্রয়োগ করারও সুযোগ নেই।
পুরোনো সিসার ব্যাটারির মাত্র প্রায় ৩০ শতাংশ আনুষ্ঠানিক কারখানায় পুনর্ব্যবহৃত হয় বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। বাকিগুলোর একটি অংশ অনানুষ্ঠানিক ব্যবস্থায় প্রক্রিয়াজাত হয়। ফলে ব্যাটারি বদলের সঙ্গে পুরোনো সেট সংগ্রহ ও নিরাপদ পুনর্ব্যবহার নিশ্চিত করা জরুরি।
লিথিয়াম আয়রন ফসফেট ব্যাটারিতে সিসা ও কোবাল্ট থাকে না। তবে লিথিয়াম ব্যাটারিরও নিরাপদ ব্যবহার ও পুনর্ব্যবহারের ব্যবস্থা প্রয়োজন। পাশাপাশি সিসার ব্যাটারি তৈরি ও পুনর্ব্যবহারের সঙ্গে যুক্ত শ্রমিকদের বিকল্প কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণের বিষয়টি উপেক্ষা করা যাবে না।
বাংলাদেশে লিথিয়াম ব্যাটারি সংযোজন ও উৎপাদনের উদ্যোগও শুরু হয়েছে। ২০২৬ সালের ১৪ই অক্টোবর প্রথম আলোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওয়ালটন গাজীপুরের চন্দ্রায় ব্যাটারির সেল তৈরির কারখানায় বিনিয়োগ করেছে। প্রতিষ্ঠানটির পরিকল্পনায় বছরে এক কোটি সেল উৎপাদনের কথা রয়েছে। তবে এসব সেল ইজিবাইকের জন্য উপযুক্ত কি না, তা স্পষ্ট নয়।
একই প্রতিবেদনে প্রাণ-আরএফএলের হবিগঞ্জ শিল্পপার্কে বছরে ৬০ হাজার ব্যাটারি প্যাক তৈরির পরিকল্পনার কথা বলা হয়েছে। শুরুতে এসব প্যাকে আমদানি করা সেল ব্যবহার করা হবে। পরবর্তী সময়ে দেশীয় মূল্য সংযোজন বাড়ানোর লক্ষ্য রয়েছে বলে প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
এই উদ্যোগগুলো বাজারে নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে। তবে উৎপাদনক্ষমতা, ব্যাটারির ধরন, প্রকৃত মূল্য সংযোজন ও কর্মসংস্থানের তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। দেশীয় উৎপাদন বাড়লেও সেল আমদানির ওপর নির্ভরতা থাকলে বৈদেশিক মুদ্রার ব্যয় পুরোপুরি কমবে না।
সিসার ব্যাটারি তৈরি ও পুনর্ব্যবহারের সঙ্গে যুক্ত শ্রমিকদের জন্যও আলাদা পরিকল্পনা দরকার। নতুন শিল্পে কর্মসংস্থান তৈরি হলেও পুরোনো শিল্পের সব শ্রমিক সেখানে স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাজ পাবেন না।
ইজিবাইক ব্যবস্থাপনার জন্য নীতিমালা প্রণয়নের কথা সরকার একাধিকবার জানিয়েছে। ২০২৬ সালের ৩০ আগস্ট বাসসের প্রতিবেদনে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম নীতিমালা চূড়ান্ত পর্যায়ে থাকার কথা বলেছিলেন। আইন মন্ত্রণালয়ের যাচাই শেষে তা জারির কথা থাকলেও ১৬ই অক্টোবর পর্যন্ত প্রকাশিত তথ্য থেকে নীতিমালা জারির বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিতও সিসার বদলে লিথিয়াম ব্যাটারি ব্যবহারের সম্ভাবনার কথা বলেছেন। ৯ ও ১০ অক্টোবর প্রকাশিত সংবাদে তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, উত্তরখানে ঢাকা ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানির একটি পরীক্ষার ফল পর্যালোচনা করে সারা দেশে ধাপে ধাপে ব্যাটারি পরিবর্তনের পরিকল্পনা বিবেচনা করা হচ্ছে।
তবে পরীক্ষার বিস্তারিত ফল প্রকাশিত হয়নি। ব্যাটারির মান, অর্থায়ন, বাস্তবায়নের সময়সীমা কিংবা পুরোনো ব্যাটারি সংগ্রহের বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ লিখিত পরিকল্পনাও প্রকাশ্যে আসেনি। এ অবস্থায় শুধু লিথিয়াম ব্যাটারি ব্যবহারের ঘোষণা যথেষ্ট নয়। চালক যাতে ঋণ নিয়ে ব্যাটারি কিনতে পারেন, নিরাপদ চার্জিং ব্যবস্থা পান এবং পুরোনো ব্যাটারি জমা দিতে পারেন, সেই ব্যবস্থাও একসঙ্গে নিশ্চিত করতে হবে।
গবেষণায় ২০২৭ সালের জুলাই থেকে তিনটি পদক্ষেপ একসঙ্গে চালুর সুপারিশ করা হয়েছে। প্রথমত, মান যাচাই করা লিথিয়াম ব্যাটারির জন্য সাময়িক করছাড়। দ্বিতীয়ত, চালকদের জন্য স্বল্প সুদের ঋণ। তৃতীয়ত, চলতি গাড়ির ব্যাটারি বদলের সময় নতুন লিথিয়াম ব্যাটারি ব্যবহারের নিয়ম।
এর আগে বাংলাদেশ ব্যাংকের সবুজ পুনঃঅর্থায়ন ব্যবস্থায় ইজিবাইকের ব্যাটারি কেনার ঋণকে স্পষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত করা এবং ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে অর্থ বিতরণের পথ তৈরি করার প্রস্তাব রয়েছে। একই সঙ্গে ব্যাটারির নিরাপত্তামান, উপযুক্ত চার্জার, নিবন্ধিত গ্যারেজ ও পুরোনো ব্যাটারি পুনর্ব্যবহারের ব্যবস্থা প্রস্তুত করতে হবে।
তবে এই প্রস্তাব বাস্তবায়নের আগে কয়েকটি তথ্য যাচাই করা জরুরি। দেশে প্রকৃত ইজিবাইকের সংখ্যা কত, এসব গাড়িতে বছরে কত বিদ্যুৎ লাগে, ব্যাটারির বাস্তব বাজারদর কত এবং কত দিন ব্যবহার করা যায়—এসব বিষয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রয়োজন। সন্ধ্যার বিদ্যুতের চাপ কমানোর হিসাব যাচাই করতে গ্যারেজের ঘণ্টাভিত্তিক বিদ্যুৎ ব্যবহারের তথ্যও প্রকাশ করা দরকার।
চালকের বাড়তি আয়ের সম্ভাবনাও এখনো অনুমাননির্ভর। দ্রুত চার্জ দেওয়ার ফলে অতিরিক্ত কতটি ভাড়া নেওয়া সম্ভব হবে, তা মাঠপর্যায়ে পরীক্ষা করে দেখা দরকার।
ফরিদপুরের কাল্পনিক চালক আলমের সমস্যাটি অবশ্য এসব হিসাবের বাইরেও স্পষ্ট। তাঁর হাতে একসঙ্গে বড় অঙ্কের টাকা নেই। ব্যাটারি দুর্বল হলে আয় কমে, কিন্তু ঋণের কিস্তি বন্ধ হয় না। দীর্ঘ সময় চার্জে থাকলে কাজের সময়ও কমে যায়।
লিথিয়াম ব্যাটারি সেই সমস্যার একটি অংশের সমাধান দিতে পারে। কিন্তু তা কার্যকর হবে তখনই, যখন ব্যাটারির দাম চালকের সামর্থ্যের মধ্যে আসবে, ঋণের বোঝা কমবে এবং পুরোনো সিসার ব্যাটারি নিরাপদে সংগ্রহ করা হবে। এই তিনটি কাজ একসঙ্গে করতে পারলে ব্যাটারি পরিবর্তন শুধু গাড়ির প্রযুক্তিগত উন্নয়ন হবে না; এটি চালকের জীবিকা, বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনা ও পরিবেশ সুরক্ষার একটি সমন্বিত উদ্যোগ হয়ে উঠতে পারে।
আরো পড়ুন : সিসামুক্ত বাংলাদেশ গড়তে ১০ বছরের কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নের তাগিদ পরিবেশমন্ত্রীর