ব্রিটিশ ঔপন্যাসিক ও সাবেক রাজনীতিবিদ জেফ্রি আর্চার মারা গেছেন। তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৬ বছর। ৫ই অক্টোবর নিজ বাড়িতে লেখালেখির বিরতির মধ্যে আকস্মিক ও শান্তিপূর্ণভাবে তাঁর মৃত্যু হয়। তাঁর প্রকাশক হার্পার কলিন্স এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।
মৃত্যুর আগ পর্যন্ত লেখালেখিতে সক্রিয় ছিলেন আর্চার। তাঁর শেষ উপন্যাস ‘অ্যাডাম অ্যান্ড ইভ’ ৬ই অক্টোবর প্রকাশিত হয়েছে। বইটি প্রকাশের পর চেল্টেনহ্যাম সাহিত্য উৎসবে তাঁর কথা বলার কর্মসূচি ছিল। মৃত্যুর মাত্র এক দিন আগেও তিনি পাঠকদের সঙ্গে একটি অনুষ্ঠানে অংশ নেন।
জেফ্রি আর্চার ছিলেন বিশ্বের অন্যতম সফল বাণিজ্যিক ঔপন্যাসিক। তাঁর বইয়ের বিক্রি তিন শত কোটির বেশি বলে প্রকাশক ও তাঁর নিজস্ব ওয়েবসাইট জানিয়েছে। তাঁর বই ১১৯টি দেশে প্রকাশিত হয়েছে এবং ৪৯টি ভাষায় অনূদিত হয়েছে। মার্কিন বেস্টসেলার তালিকায় তাঁর বই ছিল মোট সাড়ে পাঁচ বছর।
১৯৭৬ সালে প্রকাশিত প্রথম উপন্যাস ‘নট আ পেনি মোর্, নট আ পেনি লেস্’ তাঁকে লেখক হিসেবে পরিচিতি এনে দেয়। তবে ১৯৭৯ সালে প্রকাশিত ‘কেন এন্ড এবেল’ তাঁকে আন্তর্জাতিক খ্যাতির শীর্ষে নিয়ে যায়। পরবর্তী সময়ে ‘ক্লিফটন ক্রনিকলস’সহ বহু উপন্যাস, ছোটগল্প ও অন্যান্য বই লিখেছেন তিনি।
সাহিত্যে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আগে আর্চার সক্রিয় ছিলেন ব্রিটিশ রাজনীতিতে। ১৯৬৯ সালে ২৯ বছর বয়সে তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তবে আর্থিক সংকটে পড়ে ১৯৭৪ সালে তাঁর সংসদীয় রাজনৈতিক জীবনের প্রথম পর্বের অবসান ঘটে। এরপর তিনি লেখালেখিতে মন দেন। আশির দশকে রাজনীতিতে আবারও তাঁর উত্থান ঘটে। মার্গারেট থ্যাচারের সরকারের সময়ে তিনি রক্ষণশীল দলের উপপ্রধানের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯২ সালে তাঁকে উচ্চকক্ষের সদস্য হিসেবে আজীবন উপাধি দেওয়া হয়।
আর্চারের রাজনৈতিক জীবন শেষ পর্যন্ত বড় ধরনের আইনি কেলেঙ্কারিতে পর্যবসিত হয়। ১৯৮৭ সালে একটি সংবাদপত্র তাঁর বিরুদ্ধে এক যৌনকর্মীকে অর্থ দেওয়ার অভিযোগ প্রকাশ করে। আর্চার অভিযোগটি অস্বীকার করে পত্রিকাটির বিরুদ্ধে মানহানির মামলা করেন। মামলায় তিনি পাঁচ লাখ পাউন্ড ক্ষতিপূরণ পান। পরে প্রমাণ হয়, ওই মামলায় নিজের পক্ষে মিথ্যা তথ্য ও সাজানো আলিবি উপস্থাপন করা হয়েছিল।
১৯৯৯ সালে লন্ডনের প্রথম নির্বাচিত মেয়র হওয়ার জন্য রক্ষণশীল দলের প্রার্থী হওয়ার প্রচারণা শুরু করেছিলেন আর্চার। কিন্তু পুরোনো মামলায় মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়ার অভিযোগ সামনে আসার পর তিনি প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেন। পরে দল থেকেও বহিষ্কৃত হন।
২০০১ সালে আদালত তাঁকে মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়া এবং বিচারপ্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করার দায়ে দোষী সাব্যস্ত করে। তাঁকে চার বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তিনি প্রায় দুই বছর কারাগারে ছিলেন। কারাগারে থাকার অভিজ্ঞতা নিয়ে পরে তিনি তিন খণ্ডের কারাগার-দিনলিপি লেখেন।
কারাবাসের পরও আর্চারের সাহিত্যিক জীবন থেমে যায়নি। বরং তিনি নিয়মিত উপন্যাস ও গল্প লিখে গেছেন। সমালোচকদের একাংশ তাঁর লেখার সাহিত্যমান নিয়ে প্রশ্ন তুললেও বিপুলসংখ্যক পাঠক তাঁর গল্প বলার ধরন পছন্দ করেছেন।
তাঁর লেখায় অর্থ, ক্ষমতা, রাজনীতি, পারিবারিক দ্বন্দ্ব, উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও ব্যক্তিগত সম্পর্ক বারবার ফিরে এসেছে। নিজের জীবনও যেন তাঁর বহু গল্পের মতোই নাটকীয় ছিল। রাজনৈতিক উত্থান, আর্থিক বিপর্যয়, সাহিত্যিক সাফল্য, আদালত ও কারাবাস—সব মিলিয়ে তাঁর জীবনের ঘটনাপ্রবাহ ছিল দীর্ঘ ও বৈপরীত্যপূর্ণ।
২০২৪ সালে তিনি ব্রিটিশ উচ্চকক্ষের সদস্যপদ থেকে অবসর নেন। এরপরও লেখালেখি চালিয়ে যান।
‘অ্যাডাম অ্যান্ড ইভ’কে তিনি তাঁর শেষ উপন্যাস হিসেবে ঘোষণা করেছিলেন। বইটি প্রকাশের আগের দিন তাঁর মৃত্যু সেই দীর্ঘ সাহিত্যজীবনের শেষ অধ্যায় হয়ে থাকল। তাঁর রেখে যাওয়া বিপুলসংখ্যক বই একই সঙ্গে তাঁকে স্মরণ করাবে একজন সফল গল্পকার হিসেবে এবং ব্রিটিশ জনজীবনের এক বহুল আলোচিত, বিতর্কিত ব্যক্তিত্ব হিসেবে।